০২:২৫ এম
এটি যেন একটি ছোট গল্প, যা শেষ হলেও শেষ হচ্ছে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রধান উত্তেজনা শেষ হয়ে গেছে। ডেমোক্র্যাটরা হাউস এবং সিনেট দুটিই দখল করে নিয়েছে। সুতরাং মিসিসিপিতে কে সিনেটর হলেন, তা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। যে কেউ জিতুক, ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না। তবে, মিসিসিপির দিকে সবার নজর রয়েছে। এখানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মজা আলাদা।
একজন অজনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট, এক ক্যারিশম্যাটিক ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এবং সাম্প্রতিক নির্বাচনে অন্যান্য রিপাবলিকানদের তুলনায় খারাপ করা একজন বর্তমান সিনেটর—এই তিনটি বিষয় মিলে মিসিসিপির সিনেট নির্বাচনের প্রতিযোগিতাকে এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে পরিণত করেছে।
প্রথমে পরিসংখ্যানটি একটু দেখে নেওয়া যাক, তাহলে উত্তেজনার কারণ বোঝা যাবে। মিসিসিপির সিনেট নির্বাচনের ফলাফল এখনও চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা হয়নি কারণ দুই প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান খুবই সামান্য। বর্তমানে প্রায় ৯৫.৫৬ শতাংশ ভোট গণনা সম্পন্ন হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, ডেমোক্র্যাট প্রার্থী স্কট কলম পেয়েছেন ৪ লাখ ৬৬ হাজার ২২৬ ভোট (৪৯.০৪ শতাংশ)। অন্যদিকে, বর্তমান সিনেটর রিপাবলিকান সিন্ডি হাইড-স্মিথ পেয়েছেন ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫০২ ভোট (৪৮.৮৬ শতাংশ)। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মাত্র ১ হাজার ৭২৪ ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। এখনও কয়েক হাজার ডাকযোগে আসা এবং প্রভিশনাল ব্যালট গণনা করা বাকি রয়েছে। তাই চূড়ান্ত ফলাফল নিশ্চিত হতে আগামী ১০ নভেম্বর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা হলো যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ‘থিওডোর রুজভেল্ট’
স্কট কলমের নির্বাচনী শিবিরের মতে, এই প্রতিযোগিতার ভাগ্য এখন প্রায় ১৫ হাজার প্রোভিশনাল ব্যালটের ওপর নির্ভর করতে পারে, যা এখনও যাচাই-বাছাই করা বাকি রয়েছে। তবে এর মধ্যেই উভয় পক্ষই নিজেদের জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছে। বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে কলম বলেন, “প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি শেষ হলে এবং ব্যালটগুলোর অবস্থান বিবেচনা করলে, আমরাই জিততে যাচ্ছি। আর এটি সম্ভব হয়েছে কারণ মিসিসিপির মানুষ এই মধ্যবর্তী নির্বাচনে এক ঐতিহাসিক সংখ্যায় ভোট দিতে এসেছেন।”
এদিকে, হাইড-স্মিথের নির্বাচনী প্রচার ব্যবস্থাপক জেক মনসেন এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, দল এই নির্বাচনে এখনও বাকি থাকা হাজার হাজার ব্যালট নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি আরো যোগ করেন, “আমরা আত্মবিশ্বাসী যে যখন আইনসম্মতভাবে দেওয়া প্রতিটি ভোট সম্পূর্ণ এবং নিখুঁতভাবে গণনা করা হবে, তখন মিসিসিপিবাসী সিন্ডি হাইড-স্মিথকেই পুনরায় নির্বাচিত করবেন।”
পুনর্গঠন যুগের পর মিসিসিপি থেকে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ সিনেটর হওয়ার জন্য কলম অক্লান্ত প্রচারণা চালানোর পর এই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ৪৩ বছর বয়সী এই স্থানীয় ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি বারবার যুক্তি দেখিয়েছেন যে, রিপাবলিকানদের প্রতি জনগণের অসন্তোষ এবং রাজ্যের উল্লেখযোগ্য কৃষ্ণাঙ্গ ভোটার পর্যাপ্ত মনোযোগ ও অর্থ পেলে এই রিপাবলিকান ঘাঁটিতেও কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারে। স্কট কলম মনোযোগ ও অর্থ দুটিই পেয়েছিলেন; বেশ কয়েকটি ডেমোক্র্যাটিক সুপার প্যাক প্রচারণার শেষ মুহূর্তে বিজ্ঞাপনে ব্যাপক অর্থ ঢেলেছিল এবং প্রচারণার শেষ সপ্তাহগুলোতে তাঁর পক্ষে জনসমর্থন বাড়াতে মাঠে নেমেছিলেন সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসসহ দলের বড় বড় সব নাম।
সিএনএন ভোটার পোল অনুযায়ী, এই নির্বাচনে মোট ভোটারের প্রায় ৩০ ভাগ ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ এবং তাদের প্রায় সবাই কলমকে ভোট দিয়েছেন। এনএএসিপি-র প্রেসিডেন্ট ও সিইও ডেরিক জনসন গত বুধবার এক বিবৃতিতে বলেন, “মিসিসিপিবাসী ভোটকেন্দ্রে এসে পুরো দেশকে চমকে দিয়েছে।”
আরও পড়ুন: ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ, চাক শুমারের চাপে বৃদ্ধি
রিপাবলিকানদের পক্ষে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মাত্র দুই বছর আগে ২৩ পয়েন্টের ব্যবধানে জেতা একটি রাজ্যে ভোটারদের উপস্থিতি বাড়াতে শেষ মুহূর্তে হাইড-স্মিথের সঙ্গে একটি নির্বাচনী সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন।
কলম আর স্মিথের এই লড়াইয়ের শুরুটা অবশ্য স্মিথই করেছিলেন। নিজের মেয়াদে হাইড-স্মিথ নিজেই ২০২৩ সালে কলমের একটি ফেডারেল বিচারক পদে মনোনয়ন আটকে দিয়ে এই চ্যালেঞ্জের ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। যদিও কলমের পক্ষে রাজ্যের সিনিয়র রিপাবলিকান সিনেটর রজার উইকারসহ অন্যান্য রিপাবলিকানদের সমর্থন ছিল। হাইড-স্মিথ কলমের প্রথম ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি নির্বাচনের প্রচারণাকে সমর্থন করা একটি তহবিলে উদারপন্থী বিলিয়নিয়ার জর্জ সোরোসের দেওয়া অনুদানের বিরোধিতা করেছিলেন। সব মিলিয়ে একটি উত্তপ্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আজহ তৈরিই ছিল। যার প্রতিফলন হয়েছে ব্যালটে।
তবে সিএনএন-এর সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে কলম জোর দিয়ে বলেন যে হাইড-স্মিথকে আসনচ্যুত করার এই লড়াই কোনো ব্যক্তিগত ক্ষোভের ম্যাচ নয়। তিনি বলেন, “আমি একজন খ্রিষ্টান। আমি তাঁকে ক্ষমা করে দিয়েছি। আমার ফেডারেল বিচারক পদ না পাওয়াটা আমার জন্য মোটেও কোনো চালিকাশক্তি বা মোটিভেশন নয়।” তার বদলে তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন যে, এই সিনেটর কংগ্রেসে তাঁর নির্বাচনী এলাকার জনগণের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছেন।
কলমের নির্বাচনী শিবির এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের অন্যতম নজরকাড়া কিছু বিজ্ঞাপন প্রচার করেছিল, যেখানে দাবি করা হয় যে বর্তমান ইনকাম্বেন্ট সিনেটর মিসিসিপিবাসীর অর্থনৈতিক কষ্ট অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন। একটি ভিডিওতে হাইড-স্মিথকে উপহাস করা হয়, কারণ গরুর মাংসের দাম বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে ‘বেছে নেওয়ার জন্য অনেক প্রোটিন রয়েছে’। বিজ্ঞাপনে একজন নারী আঞ্চলিক টানে বলে ওঠেন, “অন্য প্রোটিন বেছে নেব? ওনার মাথা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে। আমি বরং অন্য একজন সিনেটর বেছে নেব।”
আরও পড়ুন: মুসলিমবান্ধব পর্যটনের গন্তব্য হতে চায় মালয়েশিয়ার পাহাং রাজ্য
ভোট গণনা চলার সঙ্গে সঙ্গে উভয় পক্ষই এখন ফলাফলের ওপর একটি আইনি লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভোটার অধিকারকর্মী এবং আইনি পর্যবেক্ষকেরা আশা করছেন যে, যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রায় ১৫ হাজার প্রোভিশনাল ব্যালট; যা এই রাজ্যে ‘অ্যাফিডেভিট ব্যালট’ নামে পরিচিত; তার মধ্যে কতগুলো চূড়ান্ত গণনায় যোগ হবে, তার প্রাথমিক ইঙ্গিত পেতে অন্তত আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। মিসিসিপির বেশ কয়েকটি কাউন্টি ইতিমধ্যে এই প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে।
মিসিসিপিতে বিভিন্ন কারণে প্রোভিশনাল ব্যালট ব্যবহার করা হয়, যেমন—ফটো আইডি না থাকা, ভোটার তালিকায় নাম খুঁজে না পাওয়া, অথবা অসম্পূর্ণ ভোটার নিবন্ধন ফরম জমা দেওয়া।
এই সাময়িক ব্যালটগুলো যাচাইয়ের পাশাপাশি, নির্বাচন কর্মকর্তারা ডাকযোগে আসা ভোটগুলোও গণনা করবেন। রাজ্যটির নিয়ম অনুযায়ী, সঠিক পোস্টমার্কযুক্ত ভোটগুলো নির্বাচনের পর ৫ দিনের গ্রেস পিরিয়ডের মধ্যে নির্বাচন অফিসে পৌঁছালে তা গণনা করা হয়। তবে এই ডাকভোটের সংখ্যা অ্যাফিডেভিট ব্যালটের চেয়ে কম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মিসিসিপিতে সাধারণ কংগ্রেস নির্বাচনে কোনো পুনর্নির্বাচন হয় না। তাই যিনিই সবচেয়ে বেশি ভোট পাবেন, তিনিই এই সিনেট আসনটি জয় করবেন। স্কট কলম যদি শেষ পর্যন্ত এই ব্যবধান ধরে রেখে জয়ী হতে পারেন, তবে ১৯৮২ সালের পর তিনিই হবেন মিসিসিপি থেকে নির্বাচিত প্রথম ডেমোক্র্যাট সিনেটর এবং ১৮৭৫ সালের পর প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ সিনেটর।
আরও পড়ুন: ইউরোপে বোমা হামলার ভুয়া হুমকিতে বাড়ছে ‘হাইব্রিড যুদ্ধের’ আতঙ্ক
সূত্র : সিএনএন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন