১১:১৮ পি.এম
তুরস্কের ইস্তাম্বুলে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং দেশটির ৩৫ জন রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়েছে। এই মামলা ২০২৫ সালে গাজায় ত্রাণ নিয়ে যাওয়া গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় ইসরাইলি বাহিনীর অভিযানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা হয়েছে।
নেতানিয়াহুর পাশাপাশি অভিযুক্তদের মধ্যে ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরাইল কাৎজও রয়েছেন, যারা দেশটির শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।
তুরস্কের প্রসিকিউটররা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নির্যাতন, বেআইনিভাবে আটক রাখা, গুরুতর ডাকাতি, জাহাজ ছিনতাই এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তুলেছেন। মামলায় ফিলিস্তিনে গণহত্যার অভিযোগও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সমাধানে ইরানে মক্কা জোটের চার সিদ্ধান্ত
জুলাই মাসে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয় এবং আগস্টে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির জন্য তুরস্কের অনুরোধের পর মামলাটি আনুষ্ঠানিক বিচারপর্বে প্রবেশ করে।
গাজামুখী ত্রাণবহরে হামলার অভিযোগ
মামলার মূল বিষয় ২০২৫ সালের গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার নৌযানগুলোর ওপর ইসরাইলি বাহিনীর অভিযান। গাজায় ইসরাইলের অবরোধ ভেঙে সেখানে আটকে পড়া মানুষের জন্য মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ওই ত্রাণবহর যাত্রা করেছিল।
২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট স্পেনের বার্সেলোনা থেকে ৪৪টি দেশের প্রায় ৫০০ অংশগ্রহণকারী নিয়ে ৫০টির বেশি জাহাজ যাত্রা শুরু করে। অভিযোগ রয়েছে যে, পথে তিউনিসিয়া ও গ্রিসের উপকূলের কাছে বহরটির কয়েকটি নৌযানে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে।
আরও পড়ুন: পশ্চিমবঙ্গে ২৪ ঘণ্টায় দুই ‘এনকাউন্টার’, বিজেপি সরকারের বার্তা কী?
পরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরাইলি বাহিনী নৌযানগুলো আটক করে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময় বহরে থাকা ব্যক্তিদের আটক করা হয়। তাদের অভিযোগ, আটকের পর তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, অপমানজনক আচরণ এবং চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত করার মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
১০১ ভুক্তভোগীর পক্ষে বিচার
আটক ব্যক্তিদের মুক্তির বিষয়ে তুরস্ক মধ্যস্থতা করে। পরে কয়েক শ অংশগ্রহণকারীকে চার্টার্ড ফ্লাইটে ইস্তাম্বুলে ফিরিয়ে আনা হয়। তাদের মধ্যে গণমাধ্যমকর্মী ও নোভারা মিডিয়ার এক অবদানকারীও ছিলেন।
ইস্তাম্বুলে তাদের সঙ্গে কাজ করেন আইনজীবী ও চিকিৎসকদের দল। নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগের পক্ষে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমান মামলায় ১০১ জন ভুক্তভোগীর প্রতিনিধিত্ব করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: কোরিয়ায় বাংলাদেশিসহ বিদেশি কর্মীদের ওপর জরিমানা বন্ধে নজরদারির তাগিদ
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার আইনি দল বলেছে, এ বিচার শুধু ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা নয়, বরং অপরাধের দায় থেকে রেহাই পাওয়ার সংস্কৃতির বিরুদ্ধেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
আইনি দলের ভাষ্য, অনাহারে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছে জীবনরক্ষাকারী সহায়তা পৌঁছে দিতে যাওয়া নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে কোনো রাষ্ট্র সশস্ত্র শক্তি প্রয়োগ করলে, সেই অভিযানের নির্দেশনা ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরও বিচারিক জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক এখতিয়ারে মামলা
বিদেশের ভূখণ্ডে সংঘটিত গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার করার সুযোগ দেয় সর্বজনীন বিচারিক এখতিয়ার বা ইউনিভার্সাল জুরিসডিকশন। তুরস্ক এই নীতির আওতায় মামলাটি পরিচালনা করছে।
আরও পড়ুন: মাওকে নিয়ে রসিকতায় চীনের বড় দুটি কোম্পানির চুক্তি হারাল এমবাপ্পে
এ নীতির ভিত্তিতে নির্দিষ্ট কিছু আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার কোনো দেশের নিজস্ব ভূখণ্ডে সংঘটিত না হলেও করা যেতে পারে। তবে মামলার বিচারিক এখতিয়ার, অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতা এবং অভিযুক্তদের দায় নির্ধারণ আদালতের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হবে।
ইতালিতেও তদন্তের মুখে ইসরাইলি কর্মকর্তারা
ইস্তাম্বুলে বিচার শুরুর পাশাপাশি ইতালির রোমেও গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে তদন্ত সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ইতালীয় ৫০ জন অংশগ্রহণকারীর অভিযোগের ভিত্তিতে ইসরাইলি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। সন্দেহভাজনদের মধ্যে বেন-গভির, কাৎজ, ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান এয়াল জামির এবং আরো ১১ জন রয়েছেন।
তাদের বিরুদ্ধে নির্যাতন, অপহরণ, শারীরিক ক্ষতি, ডাকাতি, সম্পত্তির ক্ষতিসাধন এবং জাহাজডুবির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—এমন কর্মকাণ্ডের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা
তুরস্ক ও ইতালিতে চলমান এসব আইনি পদক্ষেপ গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর উদ্যোগে বাধা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আচরণের বিষয়ে আন্তর্জাতিক জবাবদিহির প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে বিচার শুরু হওয়া মানেই অভিযুক্তদের অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়; তাদের দায় আদালতের রায়ের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
সূত্র: দ্য নিউ আরব
এআরবি
আরও পড়ুন: সৌদির দুই শহরে নিরাপত্তা হুমকিতে জরুরি সতর্কতা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন