০৭:২৭ পি.এম
ঢাকা, ৪ নভেম্বর, ২০২৬ : বাংলাদেশ ও রিপাবলিক অব কোরিয়া বিনিয়োগ, উন্নত প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অবকাঠামো, উদ্ভাবনী অর্থায়ন এবং বেসরকারি খাতের সহযোগিতার উপর অধিক গুরুত্ব দিয়ে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
এই অঙ্গীকারটি কোরিয়ায় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সরকারি সফরের দ্বিতীয় কার্যদিবসে (মঙ্গলবার) আরও জোরালো হয়। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
আজ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সফরকালে তিনি কোরিয়ার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কেইএক্সআইএম, কেআইসি এবং বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
আরও পড়ুন: কুমিল্লায় ওয়াকফের জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ
বাংলাদেশ পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বাংলাদেশের পরবর্তী পর্যায়ের রূপান্তরে কোরিয়া একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতে পারে। তারা উন্নয়ন সহায়তার পাশাপাশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিল্প অংশীদারিত্ব এবং প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজি সরবরাহের মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে সক্ষম।
ইডিসিএফ সহযোগিতা ও অগ্রাধিকার প্রকল্পসমূহ:
কেইএক্সআইএম’র চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হোয়াং কিয়ন-এর সঙ্গে বৈঠকে দুই পক্ষ ২০২৩-২০২৭ মেয়াদে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিল (ইডিসিএফ) কাঠামোগত চুক্তি পর্যালোচনা করে। এছাড়া অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে ঢাকা এমআরটি লাইন-৫-এর দক্ষিণ অংশ, মতলব উত্তর-গজারিয়া সেতু এবং ২৬০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ নিয়ে আলোচনা হয়।
কেইএক্সআইএম জানায়, বর্তমানে ইডিসিএফের অগ্রাধিকারগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট কোরিয়ান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শক্রমে প্রকল্প প্রস্তাব বিবেচনা করা হবে। বাংলাদেশ পক্ষ ইডিসিএফ-এর অবশিষ্ট তহবিল ব্যবহারের জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রস্তাব করেছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল রূপান্তর, স্মার্ট অবকাঠামো ও টেকসই সরবরাহ শৃঙ্খলের মতো উদীয়মান খাতগুলোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
আরও পড়ুন: জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস আজ
কৌশলগত অর্থনৈতিক সংলাপ:
রিপাবলিক অব কোরিয়ার অর্থ ও অর্থনীতি মন্ত্রণালয়ের দ্বিতীয় ভাইস মিনিস্টার চ্যাং হুর সঙ্গে পৃথক বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী বাংলাদেশ-কোরিয়া সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত করার আহ্বান জানান।
এ সময় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নত উৎপাদনশিল্প, জ্বালানি, জাহাজ নির্মাণ এবং ডিজিটাল প্রযুক্তিতে সহযোগিতার সুযোগ তুলে ধরে বাংলাদেশ।
এছাড়া, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর সহায়তায় পরিচালিত ‘ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইজিএনডি)’ উদ্যোগের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নে কোরিয়া যে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে, বাংলাদেশ তার প্রশংসা করেছে।
আরও পড়ুন: গভর্নরের নির্দেশে উদ্যোক্তাদের সুবিধা দ্রুত পৌঁছানোর নির্দেশ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী কোরিয়াকে এই উদ্যোগের অর্থায়ন ও বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও ব্যাপক অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিদ্যমান সহযোগিতার পরিধি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
কোরীয় পক্ষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল রূপান্তর, বিকল্প অর্থায়ন, ভবিষ্যতে ইডিসিএফ সহযোগিতা এবং আইজিএনডিতে আরও সম্পৃক্ততার বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখার আগ্রহ প্রকাশ করে।
কোরিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আকর্ষণ:
কোরিয়া ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশনের (কেআইসি) সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক অন্যান্য খাতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়ে আলোচনা হয়।
আরও পড়ুন: মাইশার মৃত্যুর পর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ, বিশেষজ্ঞ দল আসছে
প্রস্তাবিত ‘বাংলাদেশ সভরেন ফান্ড’- যার সম্ভাব্য আকার ১ থেকে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হতে পারে- তা বিনিয়োগের একটি মাধ্যম হিসেবে আলোচনায় উঠে আসে। পাশাপাশি কোরীয় তহবিল ব্যবস্থাপকদের মাধ্যমে কেআইসির ইকুইটি বিনিয়োগ ও কোরিয়া এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়ন সমন্বয়ের সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করা হয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল রূপান্তর:
বাংলাদেশ ও কোরিয়ার সহযোগিতার একটি নতুন ও সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিহ্নিত হয়েছে। বাংলাদেশের এআই-বিষয়ক লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে কোরিয়া সরকারের এআই ও ডিজিটাল রূপান্তরের অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগের গভীর মিল রয়েছে।
এলজি এআই রিসার্চের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতির উপযোগী বৃহৎ ভাষা মডেল (এলএলএম) তৈরি এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, উৎপাদনশিল্প ও সরকারি সেবায় এআই ব্যবহারের বিষয়ে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।
আরও পড়ুন: জিয়া এ দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন: এমপি হাফিজ ইব্রাহিম
বাংলাদেশ নিজেকে একটি আঞ্চলিক এআই ও ডেটা-সেন্টার হাব হিসেবে গড়ে তোলার আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেছে। ‘ফিউরিওসা এআই’-এর সাথে আলোচনায় বাংলাদেশের উচ্চমূল্য সংযোজনকারী এআই ইকোসিস্টেমকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোরিয়া এক্সিম ব্যাংক এআই-যুক্ত অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাইয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
কোরীয় বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ:
জ্বালানি, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জাহাজ নির্মাণ, উন্নত উৎপাদনশিল্প, নগর উন্নয়ন ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে কোরীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল।
স্যামসাং সিঅ্যান্ডটির সঙ্গে বৈঠকে অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নগর উন্নয়ন, পর্যটন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) প্রকল্পে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যে ছাদ ও বৃহৎ পরিসরের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং নির্বাচিত নগর উন্নয়ন প্রকল্পও রয়েছে।
আরও পড়ুন: ‘আমাকেও নিয়ে যাও, আমি কেমনে থাকব’, তিতাসের স্ত্রীর আহাজারি
স্যামসাং সিঅ্যান্ডটি শুধু প্রকৌশল, ক্রয় ও নির্মাণ (ইপিসি) ঠিকাদারি কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে সম্পৃক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলো নিয়ে কারিগরি আলোচনা অব্যাহত রাখতেও উভয় পক্ষ সম্মত হয়।
ইয়ংওয়ানের আয়োজনে কোরীয় বিনিয়োগবিষয়ক এক ব্যবসায়িক বৈঠকে বাংলাদেশ হালকা প্রকৌশল ও যন্ত্রাংশ উৎপাদন খাতের সম্ভাবনা তুলে ধরে। পাশাপাশি যৌথ বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং কোরিয়ার সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করার জন্য দেশটির কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের পথে:
আলোচনায় ঐতিহ্যগত উন্নয়ন সহযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং পারস্পরিক অর্থনৈতিক সুযোগের ভিত্তিতে বাংলাদেশ-কোরিয়া সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষের আগ্রহ প্রতিফলিত হয়েছে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন ও বিনিয়োগ কর্মসূচিতে কোরীয় সরকারি প্রতিষ্ঠান, আর্থিক সংস্থা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান আগ্রহকে স্বাগত জানানো হয়।
উভয় পক্ষই এই আলোচনাগুলোকে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প, বিনিয়োগ অংশীদারিত্ব এবং পারস্পরিক লাভজনক ফলাফলে রূপান্তর করার লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন