ঢাকা বুধবার, ০৪ই নভেম্বর, ২০২৬খ্রিষ্টাব্দ ১৯ই কার্তিক, ১৪৩২বঙ্গাব্দ ২৩শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিজরী
বুধবার, ০৪ই নভেম্বর, ২০২৬ইং ১৯ই কার্তিক, ১৪৩২বাং

সংকটের ছায়া পেরিয়ে খুলনা নতুন সম্ভাবনার দিগন্তে


সংকটের ছায়া পেরিয়ে খুলনা নতুন সম্ভাবনার দিগন্তে

শিল্পের পতন, বেকারত্ব, জলবায়ু অভিঘাত, আবাসন ও গণপরিবহনের সংকটের মধ্যেও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পনগরী খুলনা নতুন করে জেগে ওঠার স্বপ্ন দেখছে। এটি বন্দর, বিনিয়োগ, তরুণ জনগোষ্ঠী এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে।

একসময় খুলনার সকাল শুরু হতো কলকারখানার সাইরেনে, শ্রমিকের পদচারণায় এবং শিল্পাঞ্চলের কর্মচাঞ্চল্যে। কিন্তু বর্তমানে খুলনার অনেক শিল্পচত্বর নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে। কিছু স্থানে বন্ধ কারখানার মরচে ধরা ফটক, পরিত্যক্ত যন্ত্রপাতি এবং জীবিকার তাগিদে পেশা বদল করা মানুষের দীর্ঘশ্বাস দেখা যায়। তবে, এই শহরের বুকেই নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর অমিত সম্ভাবনা এখনও বিদ্যমান। মোংলা বন্দরের বিস্তৃত অর্থনৈতিক বলয়, পদ্মা সেতুর মাধ্যমে যোগাযোগের নতুন বাস্তবতা, তরুণ জনগোষ্ঠী, কৃষি ও মৎস্যসম্পদ এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের হাতছানি খুলনাকে নতুন অর্থনৈতিক পরিচয় দিতে পারে।

খুলনার বর্তমান চিত্র যেন এক শহরের দুই মুখ। একদিকে শিল্পের পতন, বেকারত্ব, জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, আবাসন ও গণপরিবহনের সংকট। অন্যদিকে বিনিয়োগ, শিল্প পুনরুজ্জীবন, কর্মসংস্থান এবং আধুনিক নগর হয়ে ওঠার সম্ভাবনা। সংকট ও সম্ভাবনার এই সন্ধিক্ষণে খুলনার সামনে একটি বড় প্রশ্ন রয়েছে- খুলনা কি কেবল অতীতের শিল্পঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে থাকবে, নাকি সেই ঐতিহ্যের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নতুন অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে?

আরও পড়ুন: সিসিক প্রশাসকের সঙ্গে এমপি মালেকের বৈঠক: ৬ ওয়ার্ডে ৩৪২ কোটি টাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা

খুলনার ইতিহাস কেবল একটি জনপদের নগর হয়ে ওঠার গল্প নয়। এটি শিল্পায়নকে কেন্দ্র করে একটি শহরের জন্ম, বিকাশ ও পরিবর্তনের ইতিহাস। একসময় খুলনা পাট, নিউজপ্রিন্ট, কাগজ, টেক্সটাইল, দেশলাইসহ নানা শিল্পের জন্য পরিচিত ছিল। ভৌগোলিক অবস্থান, নদীপথের যোগাযোগ, মোংলা বন্দরের নৈকট্য এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদ শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

বিশেষ করে খালিশপুর, দৌলতপুর ও আশপাশের শিল্পাঞ্চল একসময় কর্মচাঞ্চল্যের প্রতীক ছিল। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে গড়ে ওঠা বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল শ্রমিক আবাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাজার, সড়ক ও নাগরিক সুবিধা। একসময় এসবের মাধ্যমে প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। তবে, সময়ের পালাবদলে সেই চিত্র বদলে গেছে। একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। উৎপাদন কমেছে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে এবং বহু পরিবারের আয়ের ভিত্তি দুর্বল হয়েছে। ২০২০ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শিল্পনগরী খুলনার অর্থনৈতিক সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

শিল্পের পতন কেবল কয়েকটি কারখানার দরজায় তালা পড়ার ঘটনা নয়। এর অভিঘাত পুরো নগরজীবনে ছড়িয়ে পড়েছে। শ্রমিকের আয় কমেছে, ক্ষুদ্র ব্যবসার বাজার সংকুচিত হয়েছে এবং শিল্পাঞ্চলকেন্দ্রিক আবাসিক এলাকাগুলোতে অর্থনৈতিক স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। যে শহর একসময় কর্মসংস্থানের আশায় মানুষকে টানত, সেই শহর থেকেই এখন অনেক তরুণ কাজের সন্ধানে অন্যত্র পাড়ি জমাচ্ছেন।

শিল্পের চাকা থেমে গেলেও মানুষের জীবন থেমে থাকে না। খুলনার অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন বাস্তবতা, অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের বিস্তার। কেউ ফুটপাতে পণ্য বিক্রি করছেন, কেউ অটোরিকশা চালাচ্ছেন, কেউ ছোট দোকান খুলেছেন। আবার কেউ ঘরে বসে ক্ষুদ্র উদ্যোগ পরিচালনা করছেন, কেউ দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন। একসময় শিল্পকারখানায় কাজ করা মানুষের একটি অংশও এখন জীবিকার প্রয়োজনে পেশা পরিবর্তন করেছেন।

আরও পড়ুন: গাজীপুরের সিলিন্ডার রি-টেস্টিং সেন্টারে আগুন, তিন শ্রমিক আহত

জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক অভিঘাত খুলনার সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জনপদগুলোতে জীবিকার অনিশ্চয়তা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, কৃষিজমির উৎপাদনক্ষমতা হ্রাস এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের জীবন-জীবিকাকে দুর্বল করেছে। বিশেষ করে কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা, বটিয়াঘাটা, সাতক্ষীরার আশাশুনি, শ্যামনগর, বাগেরহাটের শরণখোলা, মংলা ও আশপাশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের একটি অংশ জীবিকার বিকল্প খুঁজতে খুলনা শহরমুখী হয়েছেন।

এতে শহরের ওপর বাড়ছে আবাসন, পানি, পয়োনিষ্কাশন, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবহনব্যবস্থার চাপ। অপরিকল্পিতভাবে শহরতলি বিস্তৃত হচ্ছে। কৃষিজমি, নিচু জমি ও জলাশয় ভরাট করে তৈরি হচ্ছে নতুন বসতি ও স্থাপনা। এর ফলে শহরের আয়তন বাড়ছে, অথচ অর্থনীতির পুরোনো ভিত্তি সংকুচিত হচ্ছে। ফলে প্রায় ১৮ লাখ মানুষের শহর হিসেবে পরিচিত খুলনায় গণপরিবহন সংকট এখন নগরজীবনের অন্যতম বড় দুর্ভোগ। শিক্ষার্থী, কর্মজীবী নারী, প্রবীণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সহজলভ্য, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

এত সংকটের মধ্যেও খুলনার সামনে সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় দুয়ারগুলোর একটি মোংলা বন্দর। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ হিসেবে এই বন্দরের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে রাজধানী ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ফলে মোংলা বন্দরকে ঘিরে আমদানি-রপ্তানি, পরিবহন, গুদামজাতকরণ, পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও লজিস্টিকস খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে, শুধুমাত্র বন্দরের সক্ষমতা বাড়লেই খুলনার অর্থনীতি বদলে যাবে না। প্রয়োজন বন্দর, শিল্প, কৃষি, মৎস্য, পরিবহন ও বিপণনব্যবস্থার মধ্যে কার্যকর সংযোগ। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিপণ্য, মাছ, চিংড়ি ও অন্যান্য উৎপাদিত পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে দেশি-বিদেশি বাজারে পৌঁছে দেওয়ার বিশাল সুযোগ রয়েছে। কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, হিমাগার, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, রপ্তানিমুখী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং পরিবহনসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে খুলনা আবারও উৎপাদন ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

আরও পড়ুন: টাঙ্গাইলে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মানিকগঞ্জ থেকে সুজন সাহা গ্রেপ্তার

একই সঙ্গে অব্যবহৃত শিল্পাঞ্চলগুলোকে নতুনভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। পুরোনো শিল্পজমিতে আধুনিক কারখানা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের শিল্পকেন্দ্র, কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং সহায়ক বাণিজ্যিক অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।

খুলনার আরেকটি বড় সম্পদ এর তরুণ জনগোষ্ঠী। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোকে ঘিরে এখানে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির সুযোগ রয়েছে। কিন্তু শিক্ষিত তরুণদের সামনে বড় প্রশ্ন হলো-পড়াশোনা শেষে কাজ কোথায়? স্থানীয়ভাবে মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত থাকায় অনেকেই রাজধানী কিংবা দেশের অন্যান্য শিল্পাঞ্চলে চলে যাচ্ছেন।

কৃষিজমি শুধু ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং শহরের সঙ্গে গ্রামের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। একইভাবে খাল, জলাশয় ও প্রাকৃতিক জলাধার শহরের পানি নিষ্কাশন ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় অপরিহার্য।

খুলনার উন্নয়ন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে মাস্টারপ্ল্যান, স্ট্রাকচার প্ল্যান ও ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) প্রণীত হয়েছে। কিন্তু এসব পরিকল্পনার কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে? কোন প্রস্তাব কার্যকর হয়েছে, কোনটি কাগজে রয়ে গেছে এবং কেন বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি?

আরও পড়ুন: নওগাঁ জেলা পুলিশের ঝটিকা অভিযান গত সন্ধ্যায় মহাদেবপুরের ০৯ লক্ষ ১৩ হাজার টাকা ছিনতাই, রাতের মধ্যেই ৩ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার ও ছিনতাইকৃত ০৯ লক্ষ ৩ হাজার টাকা উদ্ধার

শহরের উন্নয়ন পরিকল্পনায় খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ), খুলনা সিটি করপোরেশন, জাতীয় উন্নয়ন সংস্থা এবং আশপাশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় জরুরি। প্রয়োজন একটি সমন্বিত মহানগর ব্যবস্থাপনা কাঠামো, যেখানে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট থাকবে। পাশাপাশি প্রতিটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন সময়সীমা, অর্থায়ন, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পরিকল্পনা প্রণয়নে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। শ্রমিক, নারী, শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, জলবায়ু অভিবাসী, স্থানীয় উদ্যোক্তা ও নাগরিক সমাজের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। শহরের উন্নয়ন যেন কেবল জমির দাম বাড়ানো কিংবা বড় অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং কর্মসংস্থান, জীবনমান ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতিফলন ঘটায়।

খুলনার সামনে এখন দুটি বাস্তবতা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। একদিকে শিল্পের পতন, বেকারত্ব, জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, গণপরিবহন ও আবাসন সংকট। অন্যদিকে মোংলা বন্দর, আঞ্চলিক যোগাযোগ, কৃষি ও মৎস্যসম্পদ, তরুণ জনগোষ্ঠী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নতুন বিনিয়োগের অপার সম্ভাবনা। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারলেই খুলনার অর্থনৈতিক ও নগরজীবনে নতুন অধ্যায় সূচিত হতে পারে।

এ জন্য প্রয়োজন এমন একটি উন্নয়ন দর্শন, যেখানে শিল্পায়ন হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির হাতিয়ার, নগর পরিকল্পনা হবে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের মাধ্যম, পরিবেশ সংরক্ষণ হবে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার ভিত্তি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল পৌঁছাবে সমাজের সব স্তরে।

আরও পড়ুন: দুদক মহাপরিচালকের কাছে বরিশালের বাকেরগঞ্জের সাবেক কৃষি অফিসার রাসেল সিকদারসহ তিন জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ

খুলনার পুরোনো শিল্পঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনার অর্থ অতীতের হুবহু পুনরাবৃত্তি নয়। বরং সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আধুনিক, পরিবেশবান্ধব, প্রযুক্তিনির্ভর ও বহুমুখী অর্থনীতির ভিত্তি নির্মাণ করা।

যে শহরের বুক থেকে শিল্পের সাইরেন হারিয়ে গেছে, সেই শহরেই আবার নতুন কর্মচাঞ্চল্যের শব্দ ফিরে আসতে পারে। খালিশপুরের বন্ধ শিল্পাঞ্চলে জ্বলতে পারে নতুন উৎপাদনের আলো। মোংলা বন্দরের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ছড়িয়ে পড়তে পারে নগরের অলিগলি থেকে গ্রামীণ জনপদে। তরুণদের মেধা ও শ্রম হয়ে উঠতে পারে অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি। খুলনাকে তাই আর শুধু একসময়ের শিল্পনগরী হিসেবে পরিচয় দিলে চলবে না। তাকে হয়ে উঠতে হবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আধুনিক অর্থনীতি, বাণিজ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব নগর উন্নয়নের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে।

কারণ খুলনার ভবিষ্যৎ কেবল তার হারিয়ে যাওয়া শিল্পের স্মৃতিতে নয়, বরং নতুন সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহস, পরিকল্পনা ও সক্ষমতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে। সংকটের ধূসর ক্যানভাসে সম্ভাবনার রঙ ছড়িয়ে খুলনা আবারও জেগে উঠুক-শিল্পের নগরী থেকে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমৃদ্ধ এক ভবিষ্যতের খুলনা হয়ে।

আরও পড়ুন: সাদামাটির স্বর্গভূমি দুর্গাপুর: অতীত, আদিবাসী জীবন ও আগামীর উন্নয়ন ভাবনা

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

আরও পড়ুন

পরবর্তী খবর
অভিযোগ রাশেদ খাঁনের

শ্রমিক আন্দোলনের নেপথ্যে জাহাঙ্গীর-কচির অর্থায়ন: রাশেদ খাঁনের অভিযোগ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

বুধবার, ৪ই নভেম্বর, ২০২৬ ইং

০৫:২০ পি.এম


শ্রমিক আন্দোলনের নেপথ্যে জাহাঙ্গীর-কচির অর্থায়ন: রাশেদ খাঁনের অভিযোগ

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মো. রাশেদ খাঁন অভিযোগ করেছেন যে, গাজীপুরে সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের অর্থায়নে তার অনুসারীরা শ্রমিকের ছদ্মবেশে তাণ্ডব চালাচ্ছে। এদিকে, মিরপুর, আশুলিয়া ও সাভার অঞ্চলে আওয়ামী লীগ নেতা এস এম মান্নান কচির অর্থায়নে শ্রমিক আন্দোলনের নামে অরাজকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে।

তিনি উল্লেখ করেন, আজ সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে। জানুয়ারি মাসের বেতনের সঙ্গে শ্রমিকেরা নতুন মজুরি পাবেন। এই বিষয়ে মালিক ও শ্রমিক নেতারা একমত হয়েছেন। তবে যদি কোনো আন্দোলন অব্যাহত থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার স্বার্থে সেই আন্দোলন বন্ধ করা সরকারের দায়িত্ব।

বুধবার (৪ নভেম্বর) রাশেদ খাঁন তার ফেসবুক পেজে এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই রাজনৈতিক সহকারী বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জনগণের ভোটে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। সরকারের অন্যতম দায়িত্ব হলো শিল্পকারখাঁনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।

তিনি আরও মন্তব্য করেন যে, প্রকৃত শ্রমিকদের দাবি মেনে নেওয়ার পরও শ্রমিক আন্দোলনের নামে ফ্যাসিস্টদের যেকোনো ষড়যন্ত্র ও আস্ফালন মোকাবিলা এবং দমন করতে বিএনপি সরকার বদ্ধপরিকর।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

‘নতুন কুঁড়ি’ স্পোর্টসের দ্বিতীয় আসরে ১৬ লাখ ২৩ হাজার নিবন্ধন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

স্পোর্টস ডেস্ক

বুধবার, ৪ই নভেম্বর, ২০২৬ ইং

০৫:২০ পি.এম


‘নতুন কুঁড়ি’ স্পোর্টসের দ্বিতীয় আসরে ১৬ লাখ ২৩ হাজার নিবন্ধন

‘নতুন কুঁড়ি’ স্পোর্টসের দ্বিতীয় আসরে অংশগ্রহণের জন্য ইতিমধ্যে অন্তত ১৬ লাখ ২৩ হাজার অনলাইন নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে, এমন তথ্য জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়াসচিব মো. মাহফুজুল আলম খান। তিনি উল্লেখ করেন, প্রথম আসরে নিবন্ধনের সংখ্যা ছিল মাত্র এক লাখ ৬৮ হাজার। এবারের প্রতিযোগিতায় ১০টি ইভেন্ট অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বুধবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে খুলনা জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে ‘নতুন কুঁড়ি’ স্পোর্টস (সিজন-২) উদ্বোধনের জন্য আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন।

ক্রীড়াসচিব আরও বলেন, খেলাধুলার সুযোগ বৃদ্ধি করতে সরকার স্কুল-কলেজের মাঠের পাশাপাশি দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে খেলার মাঠ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। চলতি বছর এক হাজার ইউনিয়নে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। এছাড়া, খুলনা বিভাগীয় স্টেডিয়ামের উন্নয়ন কাজ শুরু করার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। খুলনা জেলা স্টেডিয়ামের অবশিষ্ট অংশে গ্যালারি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান মাহফুজুল আলম খান।

এ সময় খুলনার হারানো ‘স্পোর্টস সিটি’র ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের প্রত্যয় ব্যক্ত করে জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন কুঁড়ি’ স্পোর্টসের আয়োজনের মাধ্যমে দেশে ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। তরুণদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারলে তারা একদিন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে।

হুইপ আরও বলেন, এক সময় খুলনা ‘স্পোর্টস সিটি’ হিসেবে পরিচিত ছিল। সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হবে। খেলাধুলার মাধ্যমে তরুণদের মেধা ও প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে বন্ধ কলকারখানা চালুর উদ্যোগ নিয়ে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। খুলনা অঞ্চলে শিল্পায়ন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নেও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মোংলা বন্দরের উন্নয়নের সঙ্গে খুলনার অর্থনৈতিক অগ্রগতি জড়িত। বন্দরটির উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরের মাধ্যমে খুলনায় উন্নয়নের নতুন ধারা সূচিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এর আগে সকালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে খুলনা কালেক্টরেট প্রাঙ্গণ থেকে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। শোভাযাত্রাটি নগরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে একই স্থানে এসে শেষ হয়। এতে হুইপ রকিবুল ইসলাম, যুব ও ক্রীড়াসচিব মো. মাহফুজুল আলম খান, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, কেডিএ চেয়ারম্যান, সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।

প্রেস ব্রিফিংয়ে খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল্লাহ হারুন, জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল আলম, মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন, খুলনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি মোস্তফা সরোয়ার ও সাধারণ সম্পাদক মো. তরিকুল ইসলামসহ প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

৬২ হাজার ১০০ মেট্রিকটন কয়লা নিয়ে পায়রা বন্দরে ভিড়লো মাদার ভ্যাসেল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

বুধবার, ৪ই নভেম্বর, ২০২৬ ইং

০৫:২১ পি.এম


৬২ হাজার ১০০ মেট্রিকটন কয়লা নিয়ে পায়রা বন্দরে ভিড়লো মাদার ভ্যাসেল

৬২ হাজার ১০০ মেট্রিকটন কয়লা নিয়ে পায়রা বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছেছে একটি মাদার ভ্যাসেল, যার গভীরতা ১৩ মিটার। সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী জাহাজটির নাম ‘এমভি এমবিএস তাইসি’, এবং এর আগমন পায়রা বন্দরে বড় আকারের জাহাজ চলাচল ও পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু করেছে।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাত ৮টার দিকে জাহাজটি পায়রা বন্দরের বহির্নোঙরে এসে পৌঁছায়। গভীর সমুদ্রে বন্দরের নির্ধারিত অবস্থানে নোঙর করে জাহাজটি। ১৯৯ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩২ মিটার প্রস্থের এ জাহাজটি ২৪ অক্টোবর ইন্দোনেশিয়ার তারাহান বন্দর থেকে কয়লা নিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিল। জাহাজটিতে থাকা কয়লা পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হবে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, কয়লা খালাসের মাধ্যমে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

পায়রা বন্দরের হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন এস এম শরিফুর রহমান জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাতে মাদার ভ্যাসেলটি নির্বিঘ্নে বন্দরের বহির্নোঙরে নোঙর করেছে। বুধবার থেকেই কয়লা খালাস কার্যক্রম শুরু হবে। প্রথমে জাহাজটির অর্ধেকের বেশি পণ্য খালাস করা হবে। এরপর জাহাজটি টার্মিনালে নিয়ে অবশিষ্ট কয়লা খালাস করা হবে। তিনি আরও জানান, এখন থেকে পায়রা বন্দরে একের পর এক বড় জাহাজ আসতে থাকবে, যা বন্দরের পণ্য পরিবহন কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করবে। পাশাপাশি, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে পায়রা বন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

যেভাবে রাশিয়ার যুদ্ধ ফাঁদে দিশেহারা বাংলাদেশি শ্রমিকরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বুধবার, ৪ই নভেম্বর, ২০২৬ ইং

০৫:২২ পি.এম


যেভাবে রাশিয়ার যুদ্ধ ফাঁদে দিশেহারা বাংলাদেশি শ্রমিকরা

বাংলাদেশি শ্রমিকেরা রাশিয়ায় যুদ্ধে আহত হয়ে দেশে ফেরার আকুতি জানাচ্ছেন। লক্ষ্মীপুর জেলার ৩১ বছর বয়সী মাকসুদুর রহমানের কাছে যখন একজন দালাল কাজের প্রস্তাব নিয়ে আসেন, তখন তাকে বলা হয়েছিল রাশিয়ায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতে হবে। লক্ষ্মীপুরের প্রায় প্রতিটি পরিবার থেকেই কেউ না কেউ বিদেশে কর্মরত, তাই বিষয়টি আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল। একটি আন্তর্জাতিক তদন্তের তথ্যানুসারে, তিনি ১২ লক্ষ টাকা (প্রায় ৯,৮০০ মার্কিন ডলার) ঋণ করে দালালকে দেন। সাধারণ পরিবারের জন্য এটি একটি বিরাট অংকের অর্থ, তবে প্রতিশ্রুত বেতনের তুলনায় ঋণের বোঝা শোধ করা সম্ভব বলেই মনে হয়েছিল। তিনি চুক্তিতে সই করে বিমানে উঠলেন।

কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর ঝাড়ু বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজের কোনো চিহ্নই ছিল না। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি ইউক্রেন যুদ্ধের সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে যান। তাকে এবং আরও তিন বাংলাদেশি শ্রমিককে রুশ ভাষায় লেখা একটি কাগজে সই করতে বলা হয়, যে ভাষা তাদের কারোরই জানা ছিল না। এরপর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় একটি সেনা ক্যাম্পে, যেখানে ড্রোন পরিচালনা, আহতদের উদ্ধার এবং ভারী অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। রহমান প্রতিবাদ জানালে একজন রুশ কমান্ডার অনুবাদ অ্যাপের মাধ্যমে জানান যে, তার নিজের দালালই তাকে এখানে পাঠিয়েছে। রহমানের দলের শ্রমিকদের ১০ বছরের কারাদণ্ডের হুমকি দেওয়া হয় এবং মারধর করা হয়।

তার এই গল্পটি একটি সুসংগঠিত যুদ্ধ ফাঁদের জলজ্যান্ত উদাহরণ: স্থানীয় দালাল, ঋণের বোঝা, কেউ পড়তে পারে না এমন একটি চুক্তিপত্র এবং একটি যুদ্ধ—যা কখনো আলোচনার অংশই ছিল না। তবে লক্ষ্মীপুরের একজন মানুষ কীভাবে সেই ক্যাম্পে গিয়ে পৌঁছালেন তা বুঝতে হলে রাশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি এবং এই নিয়োগ ফাঁদের পেছনের কারণগুলো জানা প্রয়োজন।

লোকবলের সংকটে রাশিয়া

রাশিয়ায় চরম সেনা সংকট দেখা দিয়েছে এবং পরিসংখ্যানে তা স্পষ্ট। ইউক্রেনীয় গণমাধ্যম কর্তৃক প্রকাশিত আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে চুক্তিবদ্ধ সামরিক সেবায় যোগদানের হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। মস্কো সাইনিং বোনাস হিসেবে ৮০,০০০ ডলার পর্যন্ত এবং ১,৪০,০০০ ডলার পর্যন্ত ঋণ মওকুফের ঘোষণা দেওয়ার সত্ত্বেও এই ঘাটতি রয়ে গেছে।

এদিকে, স্থানীয় শোকসংবাদের ওপর ভিত্তি করে বিবিসি এবং মিডিয়াজোনার সাংবাদিকদের অনুমান, ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত তিন লাখ রুশ সেনা নিহত হয়েছে। অন্যান্য পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার মতে এই মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখের কাছাকাছি এবং প্রতি মাসে নিহতের সংখ্যা ৩০,০০০ থেকে ৩৫,০০০।

এক হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়ার শ্রমবাজার স্থিতিশীল করতে আরও ১৫ লাখ শ্রমিকের প্রয়োজন এবং দেশটির কর্মকর্তারা নিজেরাও ২০৩০ সালের মধ্যে ৩১ লাখ শ্রমিকের ঘাটতির পূর্বাভাস দিয়েছেন। কঠোর অভিবাসন নিয়মের কারণে প্রায় ১০ লাখ অস্থায়ী শ্রমিক দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়ায় সামরিক বাহিনী এবং কারখানাগুলো এখন একই সংকুচিত শ্রমবাজার নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।

২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের মতো আরেকটি পূর্ণমাত্রার বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ আদেশ জারি করার সাহস রাশিয়া পাচ্ছে না, কারণ এটি সরকারের জনসমর্থনের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছিল। ফলে কর্মকর্তারা অর্থের বিনিময়ে কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ, বয়স্ক ও সেনাক্যাম্পে নিবন্ধন করতে আসা মানুষদের কৌশলে ও বলপ্রয়োগ করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাচ্ছেন।

এই ঘাটতি পূরণে মস্কো বিদেশের দিকে নজর দিয়েছে। ইতোমধ্যে তারা হাজার হাজার বন্দি এবং তিন ধাপে উত্তর কোরিয়ার সেনা ব্যবহার করেছে, তবে তা পর্যাপ্ত ছিল না।

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মূল্যায়নের ভিত্তিতে একটি ইউক্রেনীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারাগার থেকে বন্দি নিয়োগের উৎস হয়তো শেষ হয়ে এসেছে। তাই দেশে নতুন করে গণ-সংগ্রহ এড়াতে রাশিয়া এখন 'গ্লোবাল সাউথ' বা উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে লোক সংগ্রহের পরিধি বাড়াচ্ছে।

ইউক্রেনীয় তথ্যানুসারে, ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২৯,০০০ বিদেশি চুক্তিভিত্তিক সেনাসেবা সই করেছেন। ২০২৬ সালে আরও অন্তত ১৮,৫০০ জন নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার অন্যতম প্রধান টার্গেট হিসেবে বাংলাদেশের নাম উল্লেখ রয়েছে।

মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো এই পরিসংখ্যানের পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট ছক দেখতে পাচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস (এফআইডিএইচ) তিনটি মহাদেশ জুড়ে অবৈধ অভিবাসী, বন্দি, ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমিক এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গড়ে ওঠা একটি সুসংগঠিত চক্রের বিবরণ দিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও গত মাসে মস্কোর বিরুদ্ধে প্রতারণামূলক, বলপ্রয়োগমূলক ও শোষণমূলক নিয়োগের অভিযোগ এনেছে।

এই প্রস্তাব কারা গ্রহণ করছে?

দক্ষিণ এশিয়ায় এই নিয়োগ চক্র কেবল বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়। অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন (ওআরএফ)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং নেপালের মন্দার পর রাশিয়ায় মাসে অন্তত ৫৫০ ডলারের বেতনকে অনেকে বেঁচে থাকার পথ হিসেবে দেখেন। ২০২৪ সালের শুরুর দিকে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করেন যে, ২০০ জনেরও বেশি নেপালি নাগরিককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ইউক্রেনে বহু নেপালি প্রাণ হারানোর পর কাঠমান্ডু রাশিয়ায় কাজের অনুমতি দেওয়া স্থগিত করে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার আনুমানিক ৬০০ থেকে ৭০০ জন প্রাক্তন সেনাসদস্য এতে যোগ দেন।

তাহলে এই ঝুঁকি মানুষ কেন নিচ্ছেন? প্রথম কারণ অর্থ। বেঁচে ফেরাদের বিবরণভিত্তিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এক ওয়েল্ডারকে ২০,৯৯০ ডলার সাইনিং বোনাস, মাসে ২,৬৬৪ ডলার বেতন এবং নাগরিকত্বের সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। ঋণে ডুবে থাকা পরিবারগুলোর কাছে এই অর্থের অংক জীবনঝুঁকির ভয়কেও আড়াল করে দেয়।

তবে কেবল অর্থই একমাত্র কারণ নয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কিছু বাংলাদেশি জেনেশুনেই যোগ দিলেও তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল। আবার কেউ কেউ ভিসাভিত্তিক চাকরি হারিয়ে দালালের লোভনীয় চুক্তির ফাঁদে পড়েছেন। অনেকে এমনকি রাশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনাও হননি—এক বন্দি জানান, এক উজবেক দালাল তাকে ইতালিতে বসবাসের সুযোগ করে দেওয়ার কথা বলে পাঠায়। ফোরটিফাই রাইট এবং ট্রুথ হাউন্ডস-এর মতে, একবার ভেতরে ঢুকে পড়লে পছন্দের আর কোনো সুযোগ থাকে না; রুশ ভাষায় চুক্তিপত্র সামনে দেওয়া হয় এবং দ্বিধা করলেই আসে হুমকি ও নির্যাতন। অন্য এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে পৌঁছানোর পরপরই পাসপোর্ট ও ফোন কেড়ে নেওয়া হয়।

আইনি চুক্তিহীন শ্রমপ্রবাহ

রাশিয়া কখনোই বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য প্রচলিত কোনো গন্তব্য ছিল না। যুদ্ধের কারণে যখন অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারে টান পড়ে, তখন শিপইয়ার্ডে দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তায় প্রথম এই দেশে কর্মী যাওয়া শুরু হয়। শুরুতে প্রায় ৫৬ জন শ্রমিককে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এই সংখ্যা লাফিয়ে বাড়ে। রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (আরএমএমআরইউ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৯৯৩ জন এবং ২০২৫ সালে ৪,৬৬৩ জন বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসেবে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৮,২৪৭ জন কর্মী দেশটিতে গেছেন। সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেল মাত্র ৪২৬ জন কর্মী পাঠিয়েছিল এবং তারা সেখানে নিরাপদ রয়েছেন; বাকি বিশাল অংশই গেছে বেসরকারি বা দালাল চক্রের মাধ্যমে।

এত বড় অঙ্কের শ্রমপ্রবাহ সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক কোনো আনুষ্ঠানিক শ্রম চুক্তি নেই। ২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের মস্কো সফরকালে উভয় পক্ষ কেবল ঝুলে থাকা চুক্তিগুলো—যেমন মানবসম্পদ চুক্তি ও প্রত্যাবর্তন চুক্তি দ্রুত সম্পাদনের আহ্বান জানান। এক বছরের মধ্যে ১,০০,০০০ বাংলাদেশি শ্রমিক নেওয়ার প্রস্তাব দ্রুত প্রক্রিয়াকরণের বিষয়ে রাশিয়া সম্মত হয়েছে। একজন প্রতিমন্ত্রী এমনকি পাঁচ বছরে ৩ থেকে ৪ লাখ শ্রমিক পাঠানোর কথা বলেছেন। এর মধ্যেই মস্কোস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস বাংলাদেশি নাগরিকদের সামরিক সেবায় অন্তর্ভুক্ত না করার জন্য রাশিয়াকে অনুরোধ জানিয়েছে।

আনুষ্ঠানিক চুক্তির অভাব বাংলাদেশি শ্রমিকদের অরক্ষিত ও প্রতারণার মুখে ফেলে দিয়েছে।

যুদ্ধের বাইরেও প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে চাকরিচ্যুত হয়ে ৩৫ জন শ্রমিক রাশিয়া থেকে ফেরত আসেন, যাদের প্রত্যেকে প্রায় ৭,০০,০০০ টাকা (প্রায় ৫,৬৫১ ডলার) করে দিয়েছিলেন।

দালাল, এজেন্সি এবং টিকিটের মূল্য

গ্রাম থেকে সামরিক ব্যারাকের এই পথটি সাধারণ কিছু অফিসের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) জানায়, ২০২৬ সালের মে মাসে যে ৩০ জন ব্যক্তি রাশিয়ায় গিয়েছিলেন, তারা জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনাল, আরএস ইন্টারন্যাশনাল এবং টিএস গ্রুপ নামক তিনটি জনশক্তি এজেন্সির মাধ্যমে যান। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে পুলিশ দুজন মূল হোতাকে গ্রেফতার করে এবং জানায় যে এক রুশ পুরুষ এবং এক কির্গিজ নারী এই চক্রের সাথে জড়িত, যদিও এই অভিযোগগুলো এখনও আদালতে প্রমাণিত হয়নি। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী সংসদে জানান, ওই ব্যক্তিরা বিএমইটি ছাড়পত্র নিয়ে লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্সির মাধ্যমেই গেছেন—যা প্রমাণ করে যে কেবল কাগজের অনুমোদনই সব সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয় না।

তারা পৌঁছানোর পরই পুরনো চিত্র রিপিট হয়—পাসপোর্ট ও ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় ফ্রন্টলাইনে। তদন্তকারীরা জানান, ড্রোনের সামনে শত্রুপক্ষের অবস্থান চিহ্নিত করার জন্য এদেরকে 'টোপ' হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

লাশের সঠিক হিসাব মেলা ভার

ইউক্রেনীয় তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ফোরটিফাই রাইটস এবং ট্রুথ হাউন্ডস জানায়, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ১০৪ জন বাংলাদেশি যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য হয়েছেন এবং তাদের মধ্যে অন্তত ৩৪ জন নিহত হয়েছেন। তবে তারা সতর্ক করেছে যে আসল সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে। কিন্তু ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর এসআরবি জানায়, ওই ৩০ জনের দলের মধ্যে ২০ জনই মারা গেছেন—যার মধ্যে ১৭ জন ফ্রন্টলাইনে পৌঁছানোর প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় নিহত হন এবং ৬ জন এখনও লড়াই করছেন।

এই তথ্যগুলোর মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে কারণ তথ্যের উৎস ভিন্ন: পুলিশ, মানবাধিকার সংস্থা এবং কিয়েভ। আর ওদিকে স্বজনেরা দেহ ছাড়াই দিন গুনছেন।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো ঢাকাকে এই দালাল চক্র ভেঙে দেওয়ার এবং ইউক্রেনকে বন্দী আন্তর্জাতিক যোদ্ধাদের মানবপাচারের শিকার হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছে। তবুও পরিবারগুলো তাদের স্বজনদের উদ্ধারের আকুতি জানাচ্ছে এবং জাতীয় দৈনিকগুলো আটকে পড়া মানুষদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের ভাগ্যে অধরা বিচার

পুনরায় মাকসুদুর রহমানের কথায় আসা যাক: তিনি কোনোক্রমে সেখান থেকে পালিয়ে আসতে পেরেছেন। আজ তিনি লক্ষ্মীপুরের নিজ বাড়িতে বসে আছেন এবং হাতে ধরে আছেন একটি রুশ সামরিক ডগ ট্যাগ—যা তার সেখানে থাকার এক জ্যান্ত প্রমাণ। কিন্তু একই অঞ্চলের অনেকেই ফিরতে পারেননি। ২০ বছরের তরুণ সাজ্জাদকে যুদ্ধে নিয়ে যাওয়ার পর হত্যা করা হয়। তার বাবা মোহাম্মদ সিরাজ এখন ছেলের একটি ছবি আঁকড়ে ধরে আছেন। সিরাজের কাছে 'বিচার' কোনো কথার কথা নয়—এটি একটি চার্জশিটে থাকা নাম, দাফনের জন্য এক খণ্ড মরদেহ এবং তার ছেলেকে যারা যুদ্ধে পাঠাল তাদের জবাবদিহিতা।

গ্রামে স্বজনেরা দালালদের মুখোমুখি হয়ে জানতে চাইছেন, কেন তাদের প্রিয়জনদের যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো। এই প্রশ্নগুলোর স্থান কোনো গ্রামের উঠানে নয়, বরং আদালতের কাঠগড়ায়। যে দালালরা এই চাকরি বিক্রি করেছে এবং যে সরকারি ব্যবস্থা তাদের কাগজপত্রের অনুমোদন দিয়েছে—তাদের জবাবদিহিতার আওতায় না আনা পর্যন্ত এই পরিবারগুলো এক অশেষ দেনার বোঝা বয়ে বেড়াবে।

রহমানের নেওয়া ঋণ সত্যি ছিল, যুদ্ধটাও বাস্তব ছিল, কেবল ছিল না সেই পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরিটি। যে মানুষটি জীবিকার তাগিদে দেশ ছেড়েছিলেন, তিনি আজ ফিরেছেন একজন সৈনিকের ডগ ট্যাগ নিয়ে—আর তার বিচার আজও বহু দূরে।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

আর্কাইভ

Please select a date!

নামাজের সময়সূচী

তারিখঃ ২৩শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিঃ
ফজর ০৪:৪৯
জোহর ১১:৪৩
আসর ০৩:৪২
মাগরিব ০৫:১৮
ইশা ০৬:৩০
সূর্যোদয় : ০৬:০৬ সূর্যাস্ত : ০৫:১৮
অনলাইন জরিপ
ফলাফল
থার্টি-ফার্স্ট নাইটে তরুণদের জন্য প্রকাশ্যে পানি-টানি খাওয়ার বিরুদ্ধে আহ্বান। আপনার মন্তব্য দিন
হ্যা
100%
না
0%
মন্তব্য নেই
0%