০১:১৮ পি.এম
নরশিং এবং লালমনিরহাট সদর উপজেলার হরিণচড়া এলাকার নবনির্মিত তীর সংরক্ষণ বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ছবি: কালের কণ্ঠ
তিস্তার ভাঙনের ফলে গত কয়েক বছর ধরে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী মর্ণেয়া ইউনিয়নের নরশিং এবং লালমনিরহাট সদর উপজেলার হরিণচড়া এলাকার হাজারো মানুষ বারবার ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও জীবিকার শেষ সম্বল হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। বহু আবেদন-নিবেদনের পর অবশেষে চলতি বছরে ত্রাণ উপদেষ্টা আসাদুল হাবিব দুলুর উদ্যোগে ওই এলাকায় তীর সংরক্ষণের কাজটি করে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
আরও পড়ুন: সাতকানিয়ায় সাঙ্গু নদীর বেড়িবাঁধ ধসে মানুষের চরম দুর্ভোগ
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নদীপাড়ের মানুষ একটি টেকসই বাঁধ পেয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্নও স্থায়ী হলো না। কাজ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই তিস্তার ভয়াল স্রোতে নদীগর্ভে বিলীন হতে শুরু করেছে নতুন নির্মিত সেই তীর সংরক্ষণকাজ। ফলে প্রায় ১ হাজার ৫০০ পরিবারের আবারও ঘরবাড়ি হারানোর শঙ্কায় নির্ঘুম রাত কাটছে।
স্থানীয়রা জানান, গত কয়েক দিন ধরে তিস্তার পানি ওঠানামা করছে। আকস্মিক বন্যা, দ্রুত পানি বৃদ্ধি এবং হঠাৎ পানি কমে যাওয়ার কারণে নদীতীরবর্তী এলাকায় দুর্ভোগের পাশাপাশি ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। রংপুরের গঙ্গাচড়ায় তিস্তা সেতু রক্ষাবাঁধ ও ডান তীর রক্ষায় নির্মিত গ্রোয়েনের পাশাপাশি এবার তালপট্টি এলাকায় নতুন করে নির্মিত তীর সংরক্ষণকাজও ভাঙনের মুখে পড়েছে। এতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ পরিবারের বসতভিটা, বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এলাকাবাসী দ্রুত জিও ব্যাগ ও কংক্রিট ব্লক ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের দাবি জানিয়েছেন।
শুক্রবার (৩ জুলাই) সকালে সরেজমিনে তালপট্টি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, লালমনিরহাটের আদর্শপাড়া থেকে গঙ্গাচড়ার তালপট্টি হয়ে নরশিং পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় তীর সংরক্ষণের কাজ করা হয়েছে। এই বাঁধের ওপর দিয়েই প্রতিদিন তিন গ্রামের মানুষ চলাচল করেন। কিন্তু গত রোববার থেকে তিস্তার তীব্র স্রোতে বাঁধটির বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি অংশে প্রায় এক শ মিটার বাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
আরও পড়ুন: ফুলবাড়ী কয়লাখনি থেকে দ্রুত কয়লা উত্তোলনের দাবি জানাল ৫০০ জনের মানববন্ধন
নতুন নতুন স্থানে ধস দেখা দেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়ছে।
পশ্চিম হরিণচড়া এলাকার আব্দুল হাকিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দুলু মন্ত্রীক ধরি এদ্দিন পর বাঁধ হইলো। কয় মাসের মাথায় সেটাও যদি নদীত যায়, তাইলে হামারগুলার মরণ ছাড়া বুদ্দি নাই।’
নরশিং এলাকার মতলেব আলী বলেন, ‘বাঁধে যে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হইছে, তাতে আর বেশি দিন টিকবো না। বাঁধটা ভাইঙ্গা গেলে তিন গ্রামের মানুষ আবারও পথে বসবো। হামরা খুব আতঙ্কে আছি।’
হরিণচড়া গ্রামের গৃহবধূ সেলিনা বেগম বলেন, ‘দিনে কোনো রকমে সময় কাটে, কিন্তু রাইতে ভয় লাগে বেশি। বাচ্চাগুলারে নিয়ে ঘুমাইতে পারি না। মনে হয় কখন আবার নদী আইসা ঘরটা ভাসাইয়া নেয়। আর নতুন কইরা ঘর হারাইতে চাই না।’
আরও পড়ুন: পাঁচবিবির গ্রামবাসীর নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণ, সরকারি সহযোগিতার দাবি
তালপট্টি এলাকার নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘বাঁধটা হওয়ার পর মনে হইছিল এবার বুঝি শান্তিতে থাকমু। কিন্তু এখন চোখের সামনে সেই বাঁধই নদীত যাইতেছে। ভাঙন যদি এভাবেই চলতে থাকে, আবার ঘরবাড়ি সরাইতে হইবো।’
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘ওই এলাকায় তীর সংরক্ষণের কাজ করা হলেও বরাদ্দ সীমিত থাকায় প্রয়োজনের তুলনায় কম অংশে কাজ করা সম্ভব হয়েছে। কয়েক দিন ধরে সেখানে ভাঙন শুরু হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে প্রায় ৬ হাজার জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙনরোধের কাজ চলমান রয়েছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে আরো জিও ব্যাগ ও অন্যান্য প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগও গ্রহণ করা হচ্ছে।’
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন