০৮:২৪ পি.এম
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে যুদ্ধের প্রতিটি নতুন অধ্যায় শুধু একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নয়, বরং দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যকেও প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ইরানের বিরুদ্ধে এই সামরিক অভিযান ও পরবর্তী সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রত্যাশিত ফল বয়ে আনতে পারেনি এবং বর্তমান ইরানের সামরিক শক্তি ও প্রযুক্তি দেখে এমনটা আশঙ্কা হচ্ছে ভবিষ্যতেও সেটা পারবে না এবং যুক্তরাষ্ট্র যে বিশ্ব পরাশক্তি হিসেবে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বিশ্বে দাদাগিরি করে আসছে তাকে হয়তো শেষ পর্যন্ত লেজ গুটিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিদায় নিতে হবে। ইরানের ধারাবাহিক পাল্টা প্রতিরোধ, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনার বিস্তার প্রমাণ করেছে—শুধু সামরিক শক্তির প্রদর্শন দিয়ে এই সংঘাতের সমাধান সম্ভব নয়।
যুদ্ধবিরতি ভেঙে পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি, ঘাঁটি, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কোটি কোটি ডলার মূল্যের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান নজরদারি ড্রোন, রিফুয়েলিং ট্যাংকার এবং সামরিক সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি ও ধ্বংসের চিহ্ন থেকে এটা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে যে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আরও যত আগ্রাসি হবে তাদের ধ্বংস ততই সন্নিকটবর্তী হবে। এই বাস্তবতায় অনেক বিশ্লেষককেই প্রশ্ন করতে বাধ্য করছে—এই যুদ্ধের রাজনৈতিক ও সামরিক মূল্য শেষ পর্যন্ত কতটা বহন করতে পারবে ওয়াশিংটন নাকি বিশ্ব আধিপত্য থেকে ইরান যুদ্ধের কারণেই ছিটকে পড়বে?
বিশ্বের একক পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বহু দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। কিন্তু ইরানকে ঘিরে বর্তমান সংঘাত দেখিয়ে দিচ্ছে, আগের মতো একতরফাভাবে শক্তি প্রয়োগ করে কাঙ্ক্ষিত ফল আদায় করা এখন আর সহজ নয়। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, ততই সেই বৈশ্বিক নেতৃত্বের ভাবমূর্তি ক্ষয় হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে।
ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতা, জাতীয় ঐক্য এবং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে তোলা সামরিক প্রস্তুতি এই যুদ্ধকে দ্রুত নিষ্পত্তির সম্ভাবনা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে হামলা-পাল্টা হামলার এই চক্র অব্যাহত থাকলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিও আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।
এই কারণেই এখন প্রশ্নটি কেবল ইরানকে ঘিরে নয়; প্রশ্নটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়েও। যদি ওয়াশিংটন সত্যিই তার আন্তর্জাতিক মর্যাদা, কৌশলগত অবস্থান এবং দীর্ঘদিনের নেতৃত্বের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে চায়, তবে সামরিক অভিযানের পরিবর্তে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের পথেই ফিরে আসা হবে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।
যুদ্ধের আগুন যত জ্বলবে, ততই ক্ষয় হবে উভয় পক্ষের। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—কখন অস্ত্র থামাতে হয়, সেই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত একটি পরাশক্তির প্রকৃত প্রজ্ঞার পরিচয় দেয়। আজ মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যে ধোঁয়া উড়ছে, তা হয়তো কেবল একটি যুদ্ধের নয়; এটি বহু দশকের প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক শক্তির কাঠামো পুনর্বিন্যাসেরও পূর্বাভাস। যদি সেই বাস্তবতা সত্যিই সামনে এসে থাকে, তবে শক্তি প্রদর্শনের চেয়ে সংঘাতের অবসানই হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বিচক্ষণ পথ।
ইতিহাসও এমন সতর্কবার্তা দেয়। ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান কিংবা ইরাক যুদ্ধে বিশ্ব পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের—প্রযুক্তিগত ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ও কৌশলগত মূল্য দিয়ে, নিজেদের সামরিক বাহিনীর সৈন্যদের অগণিত সংখ্যক মৃত্যু সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ধ্বংস সহ চরম পরিণতি বরণ করে অপমান নিয়ে ঐ রাষ্ট্রগুলো ছাড়তে হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে প্রশ্ন উঠতেই পারে—ইরান কি আরেকটি ব্যয়বহুল ও দীর্ঘস্থায়ী ভাবে ভিয়েতনামের মত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যদের জন্য ভয়ংকর পরিণতি ও মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হতে যাচ্ছে?
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন