০১:৪০ পি.এম
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বামন্দি গ্রামে এখন আনন্দ, কান্না এবং বিস্ময়ের পরিবেশ বিরাজমান। ৩৮ বছর আগে যে ব্যক্তি সামান্য অভিমান করে ঘর ছেড়ে ছিলেন, তার জন্য একসময় স্বজনদের চিন্তা ছিল বড্ড বেশি। ধরে নেওয়া হয়েছিল, তিনি আর হয়তো পৃথিবীতে নেই। তবে সময়ের সব হিসাব ভুল প্রমাণিত করে সোমবার (১ জুন) বিকেলবেলা সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষটি নিজের জন্মভিটায় ফিরে এসেছেন।
ফিরে আসা এই প্রবীণ ব্যক্তির নাম জবেদ আলী (৬৬)। তিনি বামন্দি গ্রামের মৃত তোফাজ্জল মণ্ডলের ছেলে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মাধ্যমে জানা যায়, সোমবার বিকেলে গ্রামের রাস্তার ধারে এক বৃদ্ধকে ধীরে ধীরে হেঁটে আসতে দেখা যায়। তার বয়সের ভারে ন্যুব্জ শরীর এবং মুখে সময়ের গভীর চিহ্ন ছিল। প্রথমে কেউ তাকে চিনতে পারেনি, কিন্তু বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াতেই ঘটে এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার। দীর্ঘদিনের অপেক্ষায় ক্লান্ত স্ত্রী রুশিয়া খাতুন প্রথমে হতভম্ব হয়ে যান। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর তিনি চিনতে পারেন সেই চেনা মুখটিকে। এরপর তিনি চিৎকার করে ওঠেন, ‘ওই তো আমার মানুষ!’
আরও পড়ুন: ইনানীতে ৪২ ঘণ্টা ধরে জ্বলছে আগুন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি
তার সেই চিৎকার শুনে ছুটে আসেন পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও প্রতিবেশীরা। মুহূর্তের মধ্যেই কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে বাড়ির আঙিনা। কেউ তার হাত ধরে কাঁদছেন, আবার কেউ বুকে জড়িয়ে ধরে হারিয়ে যাওয়া সেই দীর্ঘ সময়কে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৮ সালে পারিবারিক কলহের কারণে অভিমান করে জবেদ আলী চার বছরের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম এবং স্ত্রী রুশিয়া খাতুনকে রেখে হঠাৎ বাড়ি ছাড়েন। এরপর বছরাত্তর ধরে সম্ভাব্য সব জায়গায় তার খোঁজ করতে গিয়ে স্বজনরা কোনো সন্ধান পাননি। কখনো দেশের অন্য জায়গায় থাকার খবর পাওয়া গেছে, আবার কখনো তার মৃত্যুর গুজব এসেছে স্বজনদের কাছে। প্রতিটি খবরের পেছনে ছুটে বেড়িয়েছেন তারা, কিন্তু প্রতিবারই তারা ফিরে পেয়েছেন হতাশাই।
দীর্ঘ এই অপেক্ষায় পথচেয়ে থাকতে থাকতে একসময় জবেদ আলীর মা ও দাদি পৃথিবী ত্যাগ করে চলে যান। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জবেদ আলীর স্ত্রী রুশিয়া খাতুন বলেন, ‘প্রথম কয়েক বছর প্রতিদিন মনে হতো, আজ হয়তো ফিরে আসবে। মানুষ বলতে শুরু করেছিল যে, সে আর বেঁচে নেই, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি নি। আজ যখন সামনে দেখলাম, মনে হলো আল্লাহ আমাকে নতুন জীবন দিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, চার বছরের সেই শিশু ছেলে জাহাঙ্গীর এখন প্রবাসী। বাবার ফিরে আসার খবর পেয়েই সে বিদেশ থেকে কান্নায় ভেঙে পড়েছে এবং দ্রুত দেশে ফিরে বাবাকে জড়িয়ে ধরার অপেক্ষায় রয়েছে।
আরও পড়ুন: ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে ৯ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা প্রত্যাহার, নতুন কর্মকর্তাদের নিয়োগ
গ্রামের প্রবীণরা জানান, জবেদ আলী যুবক বয়সে শুধুমাত্র একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন না, তিনি এলাকায় লাঠিখেলায় অসাধারণ সুনাম অর্জন করেছিলেন। এছাড়া যাত্রাপালার মঞ্চে তার অভিনয় দেখতে দারুণ দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসত।
জবেদ আলীর চাচাতো ভাই বক্কার আলী জানান, ‘জবেদ ভাইয়ের হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা আমাদের গ্রামের ইতিহাসের অংশ হয়ে গিয়েছিল। নতুন প্রজন্ম শুধুমাত্র তার গল্প শুনেছে। আজ সেই গল্পের মানুষটিকে বাস্তবে দেখে সবাই বিস্মিত।’
নিজের জীবনের দীর্ঘ অনুপস্থিতি এবং ভবঘুরে জীবন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে চোখের জল থামাতে পারেননি জবেদ আলীও। তিনি বলেন, ‘অভিমান করেই চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু যতদূরেই গেছি, পরিবারের কথা আমার ভুলে যায়নি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিনমজুর এবং শ্রমিকের কাজ করেছি। মানুষের ভিড়ে থেকেও আমি ভীষণ একা ছিলাম। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি, সংসারের ভালোবাসার কোনো বিকল্প নেই। তাই শেষ বয়সে সমস্ত অভিমান মুছে নিজের মানুষের কাছে ফিরে এলাম।’
আরও পড়ুন: নওগাঁয় ভাড়া বাসায় জাল টাকার কারবার, ডিবির হাতে গ্রেপ্তার জব্বার
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন