০২:৫৫ পি.এম
টানা কয়েক দিনের তীব্র তাপপ্রবাহে উত্তরাঞ্চলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে। কৃষক এবং কৃষি শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন এই প্রচণ্ড রোদ ও ভ্যাপসা গরমে। মাঠে কাজ করতে গিয়ে তারা টানা এক ঘণ্টা কাজ করতে পারছেন না। কিছুক্ষণ কাজ করেই গাছের ছায়া অথবা খড়ের গাদার পাশে গিয়ে বিশ্রাম নিতে হচ্ছে। এর ফলে কৃষিকাজের গতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের দৈনিক আয়ও কমে গেছে।
বর্তমানে রংপুর অঞ্চলের মাঠগুলোতে বোরো ধান ও ভুট্টা কাটার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি কাটা ফসল শুকিয়ে ঘরে তোলার কাজেও কৃষকরা ব্যস্ত আছেন। কিন্তু তাপপ্রবাহের কারণে কৃষিকাজে ধীরগতি দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুন: ভাণ্ডারিয়ায় বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস পালিত
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা চাঁপারতল গ্রামের কৃষি শ্রমিক এন্তাজ আলী জানিয়েছেন, ‘আমাদের এলাকায় কয়েকদিন আগে টানা বৃষ্টির কারণে মাঠে নামতে পারি না। এখন বৃষ্টি নেই, কিন্তু গত পাঁচ দিন ধরে তীব্র গরম পড়েছে, যার ফলে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। মাঠে টানা এক ঘণ্টা কাজ করলেই শরীর জ্বলে ওঠে। বাধ্য হয়ে গাছের নিচে বিশ্রাম নিতে হচ্ছে।’
একই গ্রামের কৃষি শ্রমিক আলম মিয়া জানান, বর্তমানে ধান ও ভুট্টা কাটার মৌসুম চলছে এবং তারা চুক্তিভিত্তিক জমিতে কাজ করছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ছয় জনের একটি দল দুই ঘণ্টায় এক বিঘা ধান এবং তিন ঘণ্টায় এক বিঘা ভুট্টা কাটতে পারে। কিন্তু তীব্র গরমের কারণে এখন একই কাজে প্রায় তিনগুণ বেশি সময় লাগছে। এ কারণে শ্রমিকদের আয়ও কমে যাচ্ছে। মাঠে কিছুক্ষণ কাজ করার পরই ছায়ায় গিয়ে বসতে হচ্ছে।
লালমনিরহাট হাতীবান্ধা উপজেলার গোতামারী গ্রামের কৃষি শ্রমিক বেলাল মিয়া বাসস’কে বলেন, ‘তাপপ্রবাহে আমরা অস্থির হয়ে পড়েছি। সারাক্ষণ শরীর থেকে ঘাম ঝরছে। চুক্তি অনুযায়ী কাজ করতে না পারলে মজুরিও কম পাচ্ছি। ঘরে যদি পর্যাপ্ত খাবার থাকতো তাহলে হয়তো এই গরমে মাঠে নামতাম না। কিন্তু সংসারের খরচ মেটাতে বাধ্য হয়ে কাজ করতে হচ্ছে। এখন আয়ের পরিমাণ আগের তুলনায় অর্ধেকেরও কম।’
চর গড্ডিগারী গ্রামের নারী কৃষি শ্রমিক আলেয়া বেগম জানিয়েছেন, তীব্র গরমের কারণে নারী শ্রমিকেরা মাঠে বেশিক্ষণ কাজ করতে পারছেন না। তারা বাড়িতে ধান ও ভূট্টা শুকানোর কাজ করছেন। এজন্য অনেক কৃষক এখন দৈনিক মজুরির পরিবর্তে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগ দিচ্ছেন। রোদ থাকায় ধান ও ভুট্টা শুকাতে সুবিধা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: ভাণ্ডারিয়ায় যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন, র্যালি ও সমাবেশ
কিন্তু মাঠে ফসল কাটতে গিয়ে বড় সমস্যায় পড়তে হচ্ছে এবং নারী শ্রমিকরা দীর্ঘ সময় কাজ করতে পারছেন না। সিঙ্গীমারী গ্রামের কৃষক সালাদ মিয়া বলেন, ‘খেতের ধান পেকে গেছে এবং দ্রুত কেটে ঘরে তোলা প্রয়োজন। কিন্তু শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। যারা আসছেন তারা বেশিক্ষণ কাজ করতে পারছেন না এবং আমিও মাঠে গিয়ে বেশি সময় থাকতে পারছি না। তাপপ্রবাহে মানুষ তো বটেই, গবাদিপশু ও পাখিরাও ছায়া খুঁজছে। তারপরও অনেক কৃষক ও কৃষি শ্রমিক বাধ্য হয়ে মাঠে কাজ করছেন এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।’
কালীগঞ্জের তুষভান্ডার বাজারের রিকশাচালক আছমত আলী জানান, ‘প্রচণ্ড গরমে মানুষ অকারণে ঘর থেকে বের হচ্ছে না। ফলে যাত্রীও কমে গেছে। গরমে রিকশা চালানো কষ্টকর হয়ে উঠেছে এবং আয় আগের তুলনায় অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। যদি এইভাবে গরম চলতে থাকে, তবে সংসার চালাতে ঋণ নিতে হবে।’
রংপুর আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বাসস’কে বলেন, বুধবার সকালে রংপুরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত ৬ দিন ধরে এই অঞ্চলের তাপমাত্রা ৩৬ দশমিক ৬ থেকে ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। গত বছরের একই সময়ে তাপমাত্রা ছিল ৩৪ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। বৃষ্টিপাত না হওয়ার এবং বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বেশি থাকার কারণে গরমের তীব্রতা এখনও বেশি অনুভূত হচ্ছে। দ্রুত বৃষ্টিপাত না হলে তাপপ্রবাহের প্রভাব কৃষি উৎপাদন ও জনজীবনের ওপর আরও বাড়তে পারে।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বললেন, ‘বর্তমানে মাঠে এখনও ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ধান ও ভুট্টা রয়েছে। কৃষক ও কৃষি শ্রমিকরা তাপপ্রবাহ উপেক্ষা করে ফসল কাটার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে তারা পাশাপাশি বেশিক্ষণ মাঠে থাকতে পারছেন না। সেজন্য কৃষক ও শ্রমিকদের দুপুরের প্রখর রোদ এড়িয়ে কাজ করা, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং প্রয়োজন ছাড়া দীর্ঘ সময় মাঠে অবস্থান না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
আরও পড়ুন: নাটোরের বড়াইগ্রামে প্রাচীন রামাগাড়ী কাচারীঘরের জমি অবৈধ দখলের অভিযোগ, বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্য
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন