০২:৫৭ পি.এম
২৪-এর জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান এবং বীর শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগের পুণ্যভূমি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) রাজনীতি ও প্রশাসনের অবস্থান এক নতুন ও রহস্যময় মোড় নিয়েছে। পতিত স্বৈরাচারের দোসর এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে প্রকাশ্য ও গোপনে বিরোধিতা করা চরম আওয়ামীপন্থী শিক্ষকরা শুধু আত্মগোপনে রয়েছেন তা নয়; বরং তাদের একটি বড় অংশ খোলস পাল্টে বর্তমান প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ গ্রহণ করে ক্যাম্পাসে পুনর্বাসিত হচ্ছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। কিছু শিক্ষক দায়িত্বে রয়েছেন, আবার কেউ খুলসে আড়ালে বাস করছেন।
ক্যাম্পাসের পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের তীব্র ক্ষোভ, জাতীয় গণমাধ্যম এবং নির্ভরযোগ্য গোপন তথ্যানুযায়ী বেরোবির বিতর্কিত ও তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বর্তমান অবস্থানের সর্বশেষ চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো।
শিক্ষার্থীদের তীব্র ক্ষোভ ও রক্তক্ষয়ী জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বেরোবির চরম আওয়ামীপন্থী শিক্ষক সংগঠন ‘নীল দল’-এর দুই বারের সাবেক সভাপতি ড. নিতাই কুমার ঘোষকে কলা অনুষদের ডিন হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বর্তমান প্রশাসনের পক্ষ থেকে। এছাড়াও ঐ সময়ের পরিবহন পরিচালক এখন ক্যাম্পাসের হল প্রভোস্টের দায়িত্বেও রয়েছেন।
আরও পড়ুন: শিক্ষাকে কর্মজীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে: ইউজিসি চেয়ারম্যান
২৪ এর চরম উত্তালের সময় প্রশাসনের সাথে সরাসরি যুক্ত থেকে শিক্ষার্থীদের বিরোধিতা করেছিলেন ঐ সময়ের পুরো প্রক্টরিয়াল বডি। যেখানে প্রক্টর শরিফুল ইসলাম কে ব্যর্থতার জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে, তবে তিনি এখন কারাগারে রয়েছেন। বাকি সহকারী প্রক্টরগণ ৫ আগস্টের পরপরই আবার প্রশাসনের বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত হয়েছেন। এর মধ্যে জুলাই আন্দোলনের সময় তৎকালীন প্রশাসনের সহযোগী হিসেবে কাজ করা সহকারী প্রক্টর মো. ইসমাইল হোসেন, যিনি গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, পরিবর্তনের পরও সম্পূর্ণ নিরাপদ ও বহাল তবিয়তে রয়েছেন। শোনা যাচ্ছে, বর্তমান উপাচার্যের (ভিসি) সাবেক ছাত্র হওয়ার সুবাদে তিনি এই সুবিধা পেয়েছেন বলে অনেকেই মন্তব্য করেছেন।
এছাড়াও, জুলাই বিপ্লবের সময় ছাত্রদের বিপদে পাশে না দাঁড়িয়ে স্বৈরাচারের পক্ষে দালালি করার জন্য তৎকালীন ছাত্র উপদেষ্টা, নীল দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ারুল আজিম ৫ আগস্টের পর পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেও বর্তমানে তিনি সম্পূর্ণ 'ধরাছোঁয়ার বাইরে' চলে গেছেন।
এদিকে একাধিক গোপন সূত্রে জানা গেছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের পক্ষে টেলিগ্রাম সিক্রেট গ্রুপের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর গোপন লিয়াজোঁ রক্ষাকারী বেরোবির ৭ জন শিক্ষকের তালিকায় তৎকালীন বহিরাঙ্গন পরিচালক এবং শিক্ষামন্ত্রী নওফেলের ঘনিষ্ঠ সাব্বীর আহমেদ চৌধুরীর নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যিনি জুলাই বিপ্লবের পর শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের মুখে পড়ে নিজেদের বাঁচাতে এক অভিনব কৌশল নিয়ে দ্রুত ক্যাম্পাস থেকে চলে যান। এমফিল করার অজুহাতে ঢাকায় অবস্থান করেন ১ বছর। এর পর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলে শাখা ছাত্রদল তাকে মাঠে দৌড়ানি দেয় বলেও শোনা গেছে।
হাসিনাকে ফেরানোর ওই গোপন তৎপরতার তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পর শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলায় চরম আওয়ামীপন্থী শিক্ষক আসাদ মন্ডল ও ড. মশিউর রহমান শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তারা দুজনেই পলাতক রয়েছেন। এছাড়াও ঐ সময়ের বিভিন্ন দায়িত্ব প্রাপ্ত নীল ও হলুদ দলের বিভিন্ন শিক্ষকগণ এখনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন।
আরও পড়ুন: ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের নাগরিক সেবা ‘মাইগভ’ প্ল্যাটফর্ম উদ্বোধন
এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রদলের সভাপতি রাফায়েল ইমতিয়াজ ইয়ামিন বলেন, "আমরা এই বিষয়ে অবগত রয়েছি। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বলেছি, ফ্যাসিস্ট শিক্ষামন্ত্রী এর শিক্ষক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আমরা ছাত্রদল সবসময় ফ্যাসিস্টের দোসরদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি করেছি।"
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের নেতা শিবলী সাদিক বলেন, "জুলাই বিপ্লবের আজ দীর্ঘ দুই বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয়, শহীদ আবু সাইদের ক্যাম্পাসে এখনো ফ্যাসিস্টের দোসর শিক্ষকরা খোলস পাল্টে নানা পদে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। আবু সাইদ বাংলাদেশকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করতে জীবন দিলেও তার বিশ্ববিদ্যালয় এখনো ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়নি।"
উল্লেখ্য, আমরা বিশ্বস্ত গণমাধ্যমের সূত্রে জানতে পেরেছি, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতজন শিক্ষক স্বৈরাচার হাসিনাকে পুনর্বাসনের জন্য কাজ করছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নামমাত্র তদন্ত কমিটি গঠন করলেও এখনও এর কোনো দৃশ্যমান ফলাফল পাওয়া যায়নি।
এমতাবস্থায়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি—দ্রুত ফ্যাসিস্টের দোসর শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি, তারা যদি কোনো প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালন করেন, সেসব পদ থেকে তাঁদের অব্যাহতি দেওয়া উচিত এবং প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
আরও পড়ুন: ইশরাক কেন পদত্যাগ করলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে: নাহিদ
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রফেসর ড. ফেরদৌস রহমান বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে ৫৫ টা পদ আছে। আমাদের তো ৫৫ জন শিক্ষক দরকার, যেটা প্রাসঙ্গিক। অনেকেই জাতীয়তাবাদী ফোরামের শর্ত পূরণ করেছেন। এটা তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার। সারাজীবন কেউ আওয়ামী লীগ এর রাজনীতি করবে এমন তো নয়। অনেক বড় নেতারা তাঁদের রাজনৈতিক দল পরিবর্তন করে বর্তমানে বিএনপিতে রয়েছেন। আমাদের সবাইকে নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে হবে।"
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন