০৭:৩৬ পি.এম
মহিপুরে তিস্তা নদীর সেতুর রক্ষা বাঁধে ভয়াবহ ধস এসেছে। রবিবার দুপুরে সেতুর উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে ভাঙন এলাকার দৃশ্য দেখা যায়। ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও প্রবল বৃষ্টির প্রভাবে নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুরে দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর রক্ষা বাঁধে ধস দেখা দিয়েছে।
সেতুর উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে প্রায় ১৫০ মিটারের বেশিকিছু অংশ ধসে গর্ত সৃষ্টি হয়েছে, যা রংপুর-লালমনিরহাট আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, যদি দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।
রবিবার (২১ জুন) সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুটির উত্তর-পশ্চিম পাশে নির্মিত প্রায় ৯০০ মিটার দীর্ঘ রক্ষা বাঁধের একটি বড় অংশ ভেঙে গেছে। পানির তীব্র স্রোত বাঁধের নিচের মাটি সরিয়ে নিয়ে বিশাল গর্ত সৃষ্টি করেছে। এতে প্রতিদিন এই সড়ক ব্যবহারকারী ৩০ থেকে ৩৫ হাজার মানুষের যাতায়াতে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুন: লগি-বৈঠার তাণ্ডব ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে চরফ্যাশনে জামায়াতে ইসলামীর বিক্ষোভ মিছিল
এদিকে, ভারতের অরুণাচল প্রদেশে ভারী বৃষ্টিপাত ও দেশের অভ্যন্তরে টানা বর্ষণের ফলে উত্তরাঞ্চলের নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। শনিবার রাত থেকে রবিবার দুপুর পর্যন্ত রংপুরে ১৭ দশমিক ০১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ফলে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত বছরও একই স্থানে প্রায় ১০০ ফুট এলাকা নদীতে বিলীন হয়েছিল। সে সময়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় ১৪ লাখ টাকার বাজেটে বাঁশের পাইলিং নির্মাণ করে ভাঙন রোধের চেষ্টা চালিয়েছিল। তবে স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় এবার সেই পাইলিং পানির তোড়ে ভেঙে গেছে।
লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী অভিযোগ করেন, ‘গত বছর ভাঙনের সময় আমরা ব্লক ফেলে স্থায়ীভাবে বাঁধ সংরক্ষণের পরামর্শ দিয়েছিলাম। কিন্তু সেটি না করে বাঁশের পাইলিং করা হয়েছিল। এখন সেই পাইলিংও টেকেনি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সেতুর অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে।’
তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতেও নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গঙ্গাচড়ার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নে সেতু রক্ষা বাঁধে ধসের কারণে অন্তত তিনটি গ্রামের এক হাজারের বেশি পরিবার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: নোয়াখালী সদর উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার সকাল ৯টায় ডালিয়া তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার এবং কাউনিয়া তিস্তা সেতু পয়েন্টে ২৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে দুপুর নাগাদ পানি আরও বেড়ে বিপৎসীমার মাত্র ১৫ সেন্টিমিটার নিচে পৌঁছায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে।
ডালিয়া পয়েন্টের পানি পরিমাপক নুরুল ইসলাম জানান,‘সকাল থেকেই তিস্তার পানি বাড়ছে। দুপুর ১২টায় পানি বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’
তিস্তার চরাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মহিপুরের কৃষক মকবুল হোসেন বলেন,‘পানির প্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে বড় ধরনের বন্যা হতে পারে। আমন মৌসুমের জন্য তৈরি করা বীজতলা ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে।’
চর ইচলি এলাকার কৃষক আমজাদ আলী জানান, তার দেড় বিঘা জমির বাদামখেত পানিতে ডুবে গেছে। পানি দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
আরও পড়ুন: বিএনপির বিরুদ্ধে টাকা বিতরণের অভিযোগ জামায়াত প্রার্থীর
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী নুসরাত জাহান জেরিন বলেন, ‘উত্তরের কয়েকটি জেলার নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।’
স্থানীয়দের দাবি, ভাঙনপ্রবণ এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ও কংক্রিট ব্লক ফেলে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে শুধু সেতু নয়, পুরো আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। একই সাথে তিস্তার পানি আরও বৃদ্ধি পেলে রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, ‘ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের গেট খুলে দেওয়ার পর এবং উজানে ভারি বৃষ্টির কারণে তিস্তার পানি বাড়ছে। ব্যারাজের সব জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। নদী তীরবর্তী জনগণকে সতর্ক করা হয়েছে।’
রংপুর বিভাগীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব জানান, তিস্তাপাড়ের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে তিস্তাপাড়ে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। তবে অন্যান্য নদীর পরিস্থিতিও নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন: আলফাডাঙ্গায় প্রবাসী আকাশ মিয়ার বিরুদ্ধে বানোয়াট কুৎসা রটানোর প্রতিবাদ করায় একই পরিবারের তিনজনকে কুপিয়ে জখম
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন