০৮:২৫ এম
রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, দুই দুর্বৃত্ত গুলির পরে একটি মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে।
আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের এক মাস পেরিয়ে গেলেও কিলারদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তাদের পরিচয় সম্পর্কে তদন্তকারীরা এখনও অন্ধকারে রয়েছেন। কারণ, সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দুর্বৃত্তদের চেহারা পরিষ্কার বোঝা যায়নি। পাশাপাশি ম্যানুয়াল সোর্সও ভালো অবস্থায় নেই। তাই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের পরেও তদন্তকারী বিভিন্ন সংস্থা এখনো জট খুলতে পারছে না।
আরও পড়ুন: বিএনপির ডাক, সরকার পতনের একদফা আন্দোলন: ২৮ অক্টোবর
সম্প্রতি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় অভিযুক্ত এক যুবকের ছবি (সিসি ক্যামেরা ফুটেজ থেকে নেওয়া) প্রকাশ করে পুলিশ সদর দপ্তর। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেই যুবককে খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি। গত ৫ অক্টোবর রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনের উত্তর পাশে এক নারীর গলা কাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ দাবি করেছে, হত্যার আগে ওই নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। ফুটেজ না পাওয়ার কারণে এ ঘটনার সাড়ে সাত মাস পেরিয়ে গেলেও খুনি গ্রেপ্তার হয়নি, এমনকি ওই নারীর পরিচয়ও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
এছাড়া, গত ১৭ এপ্রিল পল্লবীর একটি সাবলেট বাসা থেকে ৬৫ বছরের ফিরোজা খানম জোসনার রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার হয়। তাকে সবাই স্কুলশিক্ষিকা হিসেবে চিনতেন। তার লাশের পাশে একটি রক্তমাখা হাতুড়ি পাওয়া যায়। কিন্তু ফুটেজ না থাকার কারণে খুনি শনাক্ত করা যায়নি। থানার পুলিশ কোনো কূলকিনারা করতে পারছে না, তাই মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।
এখন সারা দেশজুড়ে খুনাখুনি, ডাকাতি, চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অহরহ ঘটনার মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো কূলকিনারা করতে পারছে না। যদিও ফুটেজ উপস্থিত থাকে, তাতে অনেক আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক ঘটনার আসামিকে শনাক্ত করাও দুরূহ হয়ে পড়ছে। এর প্রধান কারণ হলো- ম্যানুয়াল সোর্সিং ভেঙে পড়েছে।
আরও পড়ুন: জবি শিক্ষার্থী জোবায়েদ হত্যা মামলার অভিযোগ গঠন শুনানি পেছাল ৮ নভেম্বর
যখন বড় কোনো ঘটনা ঘটে, তখন প্রযুক্তির মাধ্যমে কূলকিনারা না হলে তড়িঘড়ি করে সোর্স খোঁজা হয়। তবে সূত্ররা বলছে, সোর্সের মানির পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। ফলে সোর্সকে দীর্ঘ সময় ধরে মেনটেইন করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার সামান্য যে সোর্সমানি তাও অনেক সময় অপারেশনাল টিম লিডারদের কাছে পৌঁছায় না। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে যাওয়ার আগেই সোর্সমানি উধাও হয়ে যায়। এ কারণে মামলার তদারকি ও তদন্ত কর্মকর্তারা সংকটে পড়েন। পুলিশের একাধিক সূত্র বলছে, সোর্সদের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারা সবাই পেশা হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু তাদের চাহিদা অনুযায়ী সোর্সমানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
ম্যানুয়াল সোর্স ভেঙে পড়ার কারণে বিশেষ চ্যালেঞ্জে পড়তে হচ্ছে স্পর্শকাতর মামলা ও হত্যাকারী আসামিদের গ্রেপ্তারে। সন্ত্রাসী বা অপরাধ যুদ্ধের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে সোর্স সিস্টেমের ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে টার্গেট কিলিংসহ অন্যান্য অপরাধকে প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না।
পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, বর্তমানে সংকট তীব্র হয়েছে অদক্ষ কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন হওয়ার কারণে। কারণ, মাঠপর্যায়ে কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা না থাকার ফলে সোর্সদের মেনটেইন করা সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া সোর্সদের বিতর্কিত আয়োজনের কারণে অনেকেই তাদের ওপর নির্ভর করতে পারছেন না। জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর পুলিশের মনোবল ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছালে সামগ্রিক সোর্স সিস্টেমে প্রভাব পড়েছে। এটি দিন দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রযুক্তিনির্ভরতার সঙ্গে ম্যানুয়াল সোর্সও প্রয়োজন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভেঙে পড়া এই সোর্স কাঠামো পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়নি। এলাকা ভিত্তিক সোর্স সিস্টেমকে আবারও সক্রিয় করে তুলতে হবে। প্রযুক্তির সহায়তায় কিছু তথ্য না পাওয়া গেলে অপরাধ ঘটার পূর্বে প্রতিরোধ ও ঘটে যাওয়ার পর আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে।
আরও পড়ুন: জলবায়ু পরিবর্তনকে ‘বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করতে আহ্বান ল্যানসেটের
সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদা মন্তব্য করেছেন, ম্যানুয়াল থেকে প্রযুক্তিতে স্থানান্তরের কারণে সোর্স নিয়ে একটি সংকট তৈরি হয়েছে। এরকম ক্ষেত্রে যেসব দেশের ভালো উদাহরণ রয়েছে, সেখান থেকে পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। যদিও অনেকে ম্যানুয়াল সোর্স সব দেশে আছে। তবে কোথায় গুরুত্ব দিতে হবে সেটি আগে নির্ধারণ করতে হবে। এরপর সে অনুযায়ী সোর্স মেনটেইন করতে হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, অপরাধের প্রধান সোর্স হচ্ছে প্রমাণ। এটি যেকোনোভাবে পাওয়াই পুলিশের লক্ষ্য। যখন প্রযুক্তির ব্যবহার খুব কম ছিল, তখন কোনো অপরাধ ঘটলে অনুমান করে সোর্সদের মাধ্যমে জানা হতো যে, কে কী কাজটি করতে পারে। এরপর সন্দেহভাজনদের ধরে এনে মূল অপরাধীকে শনাক্ত করা হতো। এতে নিরপরাধ মানুষের হয়রানির সম্ভাবনা থাকে।
অন্যদিকে সোর্সরা নিজেও বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। সমস্যা হচ্ছে আরও অনেক। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, যোগ্য কর্মকর্তার সংকট রয়েছে, তা সত্যি। তবে অনেক দক্ষ কর্মকর্তাকে পোস্টিং দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কারণ দিয়কদের মধ্যে সচেতন এবং সক্রিয় থাকা বিষয়টি নির্মম ভাবে ফ্যাসিস্ট হিসেবে সমালোচিত হচ্ছে।
আরও পড়ুন: মাওয়া প্রান্তে পদ্মায় গোসলে নেমে নিখোঁজ রাসেলের মরদেহ উদ্ধার
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন