১২:২৫ পি.এম
বকেয়া পাওনা ও ব্যাংক গ্যারান্টি নিয়ে প্রশ্নের মধ্যেই ফার্স্টকমের কার্যক্রম চালুর সুযোগ, বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ
বকেয়া পাওনা, ব্যাংক গ্যারান্টি এবং অতীতের বিধিনিষেধ—সবকিছু নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই এস আলমের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ফার্স্টকমের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) ধারাবাহিক সিদ্ধান্ত এবং সর্বশেষ ৩০ সেপ্টেম্বরের নির্দেশনাকে ঘিরে সংশ্লিষ্ট মহলে দেখা দিয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। অভিযোগ উঠেছে, প্রচলিত শর্ত ও আর্থিক দায়ের বিষয়গুলো নিষ্পত্তি না করেই প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যবসা পরিচালনায় বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
তবে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদুল বারী এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর বক্তব্য, কমিশন কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানিকে সুবিধা দেওয়ার জন্য কাজ করে না; প্রচলিত আইন অনুসরণ করেই আইজিডব্লিউ অপারেটরদের বিষয়ে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিটিআরসির মহাপরিচালক শফিউল আজম পারভেজের স্বাক্ষরে জারি করা নির্দেশনায় আন্তর্জাতিক গেটওয়ে (আইজিডব্লিউ) অপারেটরদের কমন ইন্টারন্যাশনাল পয়েন্ট (সিআইপি) ব্যবহারের ক্ষেত্রে পৃথকভাবে ইন্টার-অপারেটর এক্সচেঞ্জ (আইওএক্স) সুইচ স্থাপন করে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগের কথা বলা হয়েছে।
এর আগে অপারেটররা সম্মিলিত কমন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, যৌথ ব্যবস্থায় কল লেনদেনের হিসাব, সরকারের রাজস্ব ভাগাভাগি এবং অপারেটরদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ তুলনামূলক সহজ ছিল। পাশাপাশি সম্ভাব্য আর্থিক দায়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাংক গ্যারান্টি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা হিসেবে কাজ করত।
নতুন নির্দেশনার ফলে এই কাঠামোয় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এ পরিবর্তন সব অপারেটরের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ।
ফার্স্টকমের বিরুদ্ধে আইজিডব্লিউ অপারেটরদের প্রায় আড়াই কোটি টাকা বকেয়া রাখার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট অপারেটরদের দাবি, বকেয়া অর্থ পরিশোধের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যাংক গ্যারান্টি নিশ্চিত না করে প্রতিষ্ঠানটিকে যৌথ কমন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা উচিত নয়।
তাঁদের আশঙ্কা, আর্থিক দায় নিষ্পত্তির আগে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হলে ভবিষ্যতে নতুন বকেয়া তৈরি হতে পারে। এতে পাওনা আদায় এবং আর্থিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ফার্স্টকমকে ঘিরে বিটিআরসির সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে বকেয়া নিষ্পত্তি এবং ব্যাংক গ্যারান্টির শর্ত কীভাবে বিবেচনা করা হয়েছে, তা নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুন: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যেমন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পাশে ছিলেন, তেমনি ২০২৪ সালের আন্দোলনেও তাঁরা পাশে ছিলেন : প্রতিমন্ত্রী সোহেল মনজুর
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বকেয়া পরিশোধ না করা এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর ফার্স্টকমের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় বিটিআরসি।
পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ২৫ মে জারি করা নির্দেশনায় ওই বছরের ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে সব বকেয়া পরিশোধ না করলে নতুন টপোলজিতে অংশ নেওয়া সম্ভব হবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। অর্থাৎ নতুন কাঠামোয় যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বকেয়া পরিশোধকে শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কিন্তু কয়েক মাসের ব্যবধানে পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে। ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর ফার্স্টকমের ওপর আরোপিত ১০০ শতাংশ অপারেশনাল ক্যাপ প্রত্যাহার করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বকেয়া পাওনা এবং বিটিআরসির নিজস্ব আর্থিক দাবি পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্নের মধ্যেই বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত আসে। ফলে আগের শর্তের সঙ্গে পরবর্তী সিদ্ধান্তের সামঞ্জস্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ফার্স্টকমের বকেয়া ইস্যুতে ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ বিটিআরসির প্রকাশিত সভার কার্যবিবরণী বা মিটিং মিনিটস ঘিরেও বিরোধ দেখা দেয়।
ওই কার্যবিবরণীতে ফার্স্টকম, আইজিডব্লিউ অপারেটর এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতার উল্লেখ ছিল বলে জানা গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন অপারেটর এমন সমঝোতা হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তাঁদের অভিযোগ, কার্যবিবরণীতে উপস্থাপিত তথ্য বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এ নিয়ে নথির যথার্থতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া প্রশ্নের মুখে পড়ে। যদিও জালিয়াতির অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি ও পক্ষগুলোর বক্তব্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
এ বিতর্কের এক দিন পর, ১৬ মার্চ ২০২৬, ফার্স্টকমকে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। ফলে বকেয়া, সমঝোতা এবং পূর্ববর্তী বিধিনিষেধের বিষয়গুলো নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।
ফার্স্টকমের মালিকানা কাঠামোও আলোচনায় এসেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এস আলমের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ফার্স্টকমে ৭৭ শতাংশের বেশি শেয়ার থাকার দাবি রয়েছে। বাকি শেয়ারের মালিকানা সাবেক মন্ত্রী জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু ও তাঁর পরিবারের বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মহানগর স্পেশাল জজ আদালত এস আলম ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৪২টি কোম্পানির অস্থাবর সম্পত্তি জব্দের নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে তথ্য রয়েছে।
ওই তালিকায় জেনেসিস টেক্সটাইল ও লায়ন সিকিউরিটিজ কোম্পানি লিমিটেডের নাম রয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটি ফার্স্টকমের বড় শেয়ারহোল্ডার বলে দাবি করা হয়েছে। আদালতের আদেশের পর সংশ্লিষ্ট শেয়ার ও সম্পদের আইনি অবস্থান কী ছিল এবং তা ফার্স্টকমের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে কীভাবে প্রভাব ফেলেছে—এসব প্রশ্নের ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
ফার্স্টকমের কার্যক্রম ঘিরে বকেয়া অর্থ, ব্যাংক গ্যারান্টি, অপারেশনাল ক্যাপ প্রত্যাহার, সভার কার্যবিবরণী এবং মালিকানা—একাধিক বিষয় সামনে এসেছে। এসব প্রশ্নের নিরসনে বিটিআরসির সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, প্রযোজ্য বিধিমালা এবং আর্থিক দায় নিষ্পত্তির তথ্য স্পষ্ট করা জরুরি।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্তে কোনো প্রতিষ্ঠান বিশেষ সুবিধা পেয়েছে কি না, তা নির্ধারণে অভিযোগের পাশাপাশি নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। টেলিযোগাযোগ খাতে সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতি আস্থা বজায় রাখতে এসব প্রশ্নের জবাব গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন: মেহেরপুরে শীতকালীন সবজি চাষে কৃষকদের ব্যস্ততা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন