১২:৩১ পি.এম
গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরে এক সময় বাঁশের তৈরি ডালা, কুলা, চালুনি, ঝুড়ি, খাঁচা, পলো, ডুলা ও চাটাই ছিল অপরিহার্য। বিয়ে, গায়ে হলুদ, ধান মাড়াই, চাল ঝাড়া কিংবা মাছ ধরা—বাঁশের তৈরি গৃহস্থালি সামগ্রী ছাড়া বাঙালির দিন কাটতো না। কিন্তু আজ এই ঐতিহ্যবাহী ও পরিবেশবান্ধব বাঁশশিল্প প্লাস্টিক পণ্যের ভয়াবহ আগ্রাসনের কারণে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। গাজীপুর জেলার শিল্পনগরী কালিয়াকৈর উপজেলায় এই সংকট বর্তমানে সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্লাস্টিকের দাপটে বাঁশশিল্পের চাহিদা কমে যাওয়ায় হাজার হাজার কারিগর পরিবার ভিটেমাটি হারানোর উপক্রম হয়েছে।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) কালিয়াকৈর গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত সাপ্তাহিক বাঁশের হাটে একটি হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে। মাটিতে সারি সারি পড়ে আছে বাঁশের তৈরি ডালা, কুলা, ঝুড়ি, পলো ও হাঁস-মুরগির খাঁচা। ক্রেতাহীন হাটে বৃদ্ধ কারিগররা বিষাদময় মুখে বসে আছেন। কালিয়াকৈরের চাপাইর, বোয়ালী, ফুলবাড়ীয়া, সফিপুর, মৌচাক, কালামপুর ও কালিয়াকৈর বাজার এলাকার কয়েকশো পরিবারের জীবন-জীবিকা এখন তীব্র অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হয়েছে।
ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব গ্রামে ডালা, কুলা ও চালুনিসহ গৃহস্থালি পণ্য তৈরির কাজ চলে। কিন্তু প্লাস্টিকের সস্তা বিকল্প সামগ্রীর কারণে বিক্রির পরিমাণ তলানিতে ঠেকেছে। ফলে সংসার চালানো, সন্তানদের লেখাপড়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে কারিগররা হিমশিম খাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: জাতীয় প্রেস ক্লাবের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ উদযাপন হবে
এক বৃদ্ধ কারিগর হাটে এসে আক্ষেপ করে বলেন, “বাপ-দাদার আমল থেকে এই কাজ করি ভাই। আগে একদিনে ২০-২৫টি ডালা-কুলা বিক্রি হতো, এখন সারাদিন বসে থেকেও ২-৩টি বিক্রি হয় না।” তিনি আরও বলেন, “বাজারে প্লাস্টিকের ডালা ৫০ টাকায় পাওয়া যায়, অথচ আমার বাঁশের ডালার উৎপাদন খরচই ৮০ টাকা। বাঁশের দাম বাড়লেও আমাদের পণ্যের দাম কমে গেছে। দুই দিন ধরে ঘরে চাল নেই, নাতির স্কুলের বেতন দিতে পারছি না। এই শিল্প বন্ধ হলে আমাদের ভিক্ষা করা ছাড়া উপায় থাকবে না।”
একই হাটে নারী কারিগররা জানান, তাঁরা পুরুষদের সাথে রাত জেগে চালুনি ও বাঁশ চাঁছার কাজ করেন। কিন্তু হাটে আসলে ক্রেতারা প্লাস্টিক পণ্যকে বেশি টেকসই ও ধোয়ার সুবিধা উল্লেখ করে বাঁশের সামগ্রী কিনতে চান না। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ঋণের অভাবের কথা তুলে ধরে অনেক কারিগর জানান, বাধ্য হয়ে তাঁদের পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিরা এ পেশা ছেড়ে তৈরি পোশাক কারখানা (গার্মেন্টস) কিংবা অটো-ভ্যান চালানোর পেশায় চলে যাচ্ছেন।
হাটে আসা আরেক কারিগর আব্দুর রহমান (৫৮) বলেন, “আগে এই হাটে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না, এখন ক্রেতার চেয়ে কারিগরের সংখ্যা বেশি। প্লাস্টিক এসে আমাদের পেটে লাথি মেরেছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল লতিফ (৬০) জানান, “এই বাঁশশিল্প আমাদের সংস্কৃতির অংশ। প্লাস্টিক পরিবেশ ধ্বংস করে, আর বাঁশ পরিবেশ বাঁচায়। তবুও বাঁশের কদর না থাকাটা দুঃখজনক।” তিনি আরও বলেন, “সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই ঐতিহ্য ফিরে পেতে পারে।”
আরও পড়ুন: শাহজালাল বিমানবন্দরে প্রবাসীদের জন্য ২০০ ট্রলি প্রদান
পরিবেশ উন্নয়ন ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে, প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে এখন পরিবেশবান্ধব বাঁশজাত পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কালিয়াকৈরের কারিগরদের মানোন্নয়ন, নকশা আধুনিকীকরণ, প্রশিক্ষণ ও সরাসরি রপ্তানির সুযোগ তৈরিতে সংস্থাটি কাজ করতে আগ্রহী।
কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ এইচ এম ফখরুল হোসাইন জানান, দেশীয় কুটিরশিল্প সংরক্ষণে উপজেলা প্রশাসন সবসময় ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে। স্থানীয় কারিগরদের আর্থিক সহায়তা, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, ব্যাংক ঋণ এবং সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কারিগরদের প্রত্যাশা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও স্থায়ী বাজার নিশ্চিত করা গেলে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী এই কুটিরশিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।
আরও পড়ুন: দুর্গোৎসব উপলক্ষে রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন