১১:৩৩ পি.এম
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে বাড়িতে প্রসবের সময় নবজাতকের মৃত্যু ঘটেছে। এই ঘটনায় ১৮ বছর বয়সি প্রসূতি চাঁদনী আক্তার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বর্তমানে তিনি ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
তার পরিবারের অভিযোগ, প্রসবের জন্য একজন পশু চিকিৎসক এবং এক স্বাস্থ্য সহকারীসহ কয়েকজনের মাধ্যমে বাড়িতে প্রসব করানোর চেষ্টা করা হয়। প্রসূতির শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযোগের তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন: নকলায় এসবিসি প্রকল্পের এমএনসিএএইচ বিষয়ে জনসংলাপ
এ ঘটনা দৌলতদিয়া ইউনিয়নের ফেরিঘাটসংলগ্ন শাহাদাত মেম্বার পাড়ায় ঘটে। চাঁদনী দরিদ্র রিকশাচালক চানমিয়া শেখ ও চায়না আক্তার দম্পতির মেয়ে। তার স্বামী মুন্নাফ শেখ গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার বাসিন্দা। বিয়ের চার বছর পর এটিই ছিল চাঁদনীর প্রথম অন্তঃসত্ত্বা হওয়া।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ৮ অক্টোবর রাত ২টার দিকে চাঁদনীর প্রসবব্যথা শুরু হয়। ভোর ৪টার দিকে স্থানীয় এক ধাত্রী রোকেয়া বেগম ওরফে রুকিকে ডেকে আনা হয়। দীর্ঘ সময় চেষ্টা করেও প্রসব করাতে না পারায় সকাল ৭টার দিকে আসলাম আলী সরদার নামে এক পশু চিকিৎসককে খবর দেওয়া হয়। পরিবারের অভিযোগ, তিনি প্রথমে চাঁদনীর শরীরে স্যালাইন দেন এবং পরে প্রসবব্যথা বাড়ানোর জন্য একটি ইনজেকশন দেন।
দুই ঘণ্টা পর শিশুটির মাথা বের হলেও প্রসব সম্পন্ন হচ্ছিল না। পরে আসলামের ডাকে ঘটনাস্থলে যান লাভলী আক্তার রথী নামে এক ব্যক্তি, যিনি ডিএমএফ কোর্স সম্পন্ন করেছেন বলে দাবি করেন। পরিবারের অভিযোগ, তিনি প্রসবের পথের পাশে কেটে শিশুটিকে বের করেন। শিশুটি মৃত অবস্থায় জন্ম নেয়। এরপর চাঁদনীর অতিরিক্ত রক্তপাত শুরু হলে ক্ষতস্থানে গজ দিয়ে সেলাই করা হয় এবং কিছু ওষুধ দেওয়া হয়।
পরিবারের দাবি, এ কাজের জন্য ৪ হাজার টাকা চাওয়া হলেও দরিদ্র বাবা ৩ হাজার ৬০০ টাকা দেন। পরে সেলাইয়ের স্থানে সংক্রমণ দেখা দিলে চাঁদনীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়।
আরও পড়ুন: সাংবাদিক আলিফ হত্যার আসামি অপূর্বর ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর
গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) তাকে গোয়ালন্দ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে তার অবস্থা জটিল বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
চাঁদনীর বাবা-মা বলেন, "আমরা আমাদের নাতিকে হারিয়েছি। এখন চাই, আমাদের মেয়েটা অন্তত সঠিক চিকিৎসা পেয়ে বেঁচে থাকুক। মেয়ের এই পরিণতির জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার চাই।"
অভিযুক্ত লাভলী আক্তার রথী বলেন, "আমি চার বছর মেয়াদি ডিএমএফ কোর্স সম্পন্ন করেছেন এবং স্বাভাবিক প্রসব করানোর বিষয়ে প্রশিক্ষণ রয়েছে।" তার দাবি, ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি শিশুটিকে প্রসবপথে আটকে থাকতে দেখেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় শিশুটিকে বের করেন এবং ওষুধ দেন। দীর্ঘ সময় বাড়িতে প্রসবের চেষ্টা করায় মা ও শিশুর অবস্থা আগেই খারাপ হয়ে গিয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এ বিষয়ে পশু চিকিৎসক আসলাম দাবি করেন, "আমি দীর্ঘ ২২-২৩ বছর ধরে পশু চিকিৎসার পাশাপাশি মানুষের চিকিৎসাও দিয়ে আসছি।" তার এমএলএফ বা পল্লিচিকিৎসকের একটি কোর্স সম্পন্ন করা আছে। এ পর্যন্ত গ্রামের বহু নারীর সন্তান তার চিকিৎসায় ভালোভাবে জন্ম নিয়েছে। গ্রামে তার চিকিৎসার সুনাম রয়েছে।
আরও পড়ুন: টাঙ্গাইলে শোষিতের কণ্ঠের ৮ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেক কেটে উদযাপন করা হয়
সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে চাঁদনীর বাবার বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নেন গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মারুফ হাসান।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, "যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া প্রসব করানোর মতো চিকিৎসাসেবা দেওয়া উচিত নয়। আসলাম ও রথীর মতো ব্যক্তিদের এ ধরনের সেবা দেওয়ার এখতিয়ার আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।" এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সিভিল সার্জন ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা না হলেও তদন্তের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন