০৯:৫৫ এম
ইসলাম একটি জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শনের পাশাপাশি আল্লাহর সৃষ্ট প্রতিটি জীবের প্রতি সদাচরণের শিক্ষা প্রদান করে। প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা, অকারণে কষ্ট দেওয়া কিংবা খাদ্য ও পানির ব্যবস্থা না করে তাদের বন্দি রাখা ইসলামের নৈতিক শিক্ষার পরিপন্থী। বিপরীতে, ক্ষুধার্ত প্রাণীকে খাবার দেওয়া, তৃষ্ণার্ত প্রাণীকে পানি পান করানো এবং অসহায় জীবকে রক্ষা করা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রহমত লাভের মাধ্যম হতে পারে।
১. সব প্রাণীই আল্লাহর সৃষ্টি
প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শনের মূল ভিত্তি হলো এই উপলব্ধি যে, পৃথিবীর প্রতিটি জীব মহান আল্লাহর সৃষ্টি। মানুষ যেমন আল্লাহর সৃষ্টি, তেমনি পশুপাখি ও অন্যান্য প্রাণীও তাঁরই সৃষ্টি। তাদের জীবন, অস্তিত্ব ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের মধ্যে আল্লাহর অসীম কুদরতের নিদর্শন রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর পৃথিবীতে বিচরণশীল এমন কোনো প্রাণী নেই এবং ডানা দিয়ে উড়ে এমন কোনো পাখিও নেই, যারা তোমাদের মতো একেকটি সম্প্রদায় নয়।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৩৮)
আরও পড়ুন: ইসলামে বিবাহের জন্য হারাম নারীদের তালিকা প্রকাশ
তাহলে কোনো প্রাণীকে অকারণে কষ্ট দেওয়া, পাথর ছুড়ে মারা, বিনোদনের জন্য নির্যাতন করা কিংবা তার স্বাভাবিক জীবনযাপনে অন্যায়ভাবে বাধা সৃষ্টি করা উচিত নয়। বরং আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি মমত্ববোধ, দায়িত্বশীলতা ও সহানুভূতি প্রদর্শন করা একজন মুমিনের নৈতিক দায়িত্ব।
২. প্রাণীর প্রতি দয়া আল্লাহর রহমত লাভের মাধ্যম
প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শনের প্রতিদান কত মহান হতে পারে, তা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বর্ণিত একটি ঘটনা থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এক ব্যক্তি পথ চলতে চলতে প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়লেন। তিনি একটি কূপে নেমে পানি পান করে উঠে এলেন। তখন তিনি দেখতে পেলেন, একটি কুকুর তৃষ্ণায় হাঁপাচ্ছে এবং পিপাসার কারণে ভেজা মাটি চাটছে। লোকটি ভাবলেন, তৃষ্ণার কারণে কুকুরটিরও আমার মতো কষ্ট হচ্ছে।
অতঃপর তিনি কূপে নেমে নিজের চামড়ার মোজায় পানি ভরে তা মুখে ধরে ওপরে উঠে এলেন এবং কুকুরটিকে পানি পান করালেন। এরপর আল্লাহ তাঁর এ কাজের প্রতিদান দিলেন এবং তাঁকে ক্ষমা করে দিলেন। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! পশুপাখির প্রতি দয়া প্রদর্শন করলেও কি আমাদের সওয়াব হবে?’ তিনি বললেন, ‘প্রত্যেক জীবন্ত প্রাণীর প্রতি সদয় আচরণে সওয়াব রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৩৬৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২২৪৪)
আরও পড়ুন: আল্লাহর কাছে প্রিয় দুটি বাক্য ও তার ফজিলত
একটু চিন্তা করুন, একজন মানুষ একটি তৃষ্ণার্ত প্রাণীর কষ্ট অনুভব করে তাকে পানি পান করিয়েছিলেন। তাঁর সেই কাজের বিনিময়ে আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করেছিলেন।
৩. প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা কঠিন শাস্তির কারণ হতে পারে
ইসলাম যেমন প্রাণীর প্রতি দয়ার জন্য পুরস্কারের সুসংবাদ দিয়েছে, তেমনি তাদের ওপর নিষ্ঠুরতা ও অবহেলার ব্যাপারেও কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এক নারী একটি বিড়ালকে বন্দি করে রাখার কারণে শাস্তি পেয়েছিল; সে বিড়ালটিকে বন্দি করে রেখেছিল, ফলে সেটি ক্ষুধায় মারা যায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৩৬৫)
তাহলে কোনো প্রাণীকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখলে তার খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় পরিচর্যার দায়িত্বও যথাযথভাবে পালন করতে হবে। পোষা প্রাণীকে ক্ষুধার্ত রাখা, তৃষ্ণার্ত অবস্থায় ফেলে রাখা কিংবা অসুস্থতার সময় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়া গুরুতর অন্যায়।
আরও পড়ুন: পূজায় নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তবে এতে অংশ নিলে ঈমান থাকবে না: মুফতী আব্দুল মালেক
৪. আল্লাহর রহমত সৃষ্টির প্রতি দয়া প্রদর্শনের সঙ্গে সম্পর্কিত
ইসলামে দয়া এমন একটি মহৎ গুণ, যা মানুষের হৃদয়কে কোমল করে এবং তাকে অন্যের কষ্ট উপলব্ধি করতে শেখায়। এই দয়া শুধু আত্মীয়স্বজন, বন্ধু কিংবা পরিচিত মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি সামগ্রিক সহানুভূতিও এর অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দয়াশীলদের প্রতি পরম দয়াময় আল্লাহ দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া করো, আকাশের অধিপতি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ১৯২৪)
পৃথিবীর মানুষের পাশাপাশি অসহায় প্রাণীর প্রতিও দয়া প্রদর্শন করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। ক্ষুধার্ত প্রাণীকে খাবার দেওয়া, আহত প্রাণীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা কিংবা বিপদে পড়া কোনো জীবকে রক্ষা করার মাধ্যমে আমরা দয়ার চর্চা করতে পারি।
৫. প্রাণীর প্রতিও সদাচরণ করতে হবে, এমনকি জবাইয়ের সময়ও
আরও পড়ুন: হজের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার উপায় ও গুরুত্ব
ইসলাম প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শনের শিক্ষা শুধু খাবার-পানি দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং প্রয়োজনের ক্ষেত্রে প্রাণী জবাই করার সময়ও নিষ্ঠুরতা পরিহার করার নির্দেশ দিয়েছে। হজরত শাদ্দাদ ইবন আওস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর ক্ষেত্রে সদাচরণকে বিধিবদ্ধ করেছেন। সুতরাং তোমরা যখন হত্যা করবে, তখন উত্তম পদ্ধতিতে করবে; আর যখন জবাই করবে, তখন উত্তম পদ্ধতিতে জবাই করবে। তোমাদের প্রত্যেকে যেন তার ছুরি ধারালো করে নেয় এবং জবাই করা প্রাণীকে কষ্ট থেকে স্বস্তি দেয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯৫৫)
ইসলাম বৈধ প্রয়োজনে প্রাণী জবাই করার অনুমতি দিলেও অকারণে কষ্ট দেওয়ার অনুমতি দেয়নি। জবাইয়ের সরঞ্জাম যথাযথভাবে প্রস্তুত করা, প্রাণীর কষ্ট কমানো এবং নিষ্ঠুরতা পরিহার করা ইসলামের নির্দেশনার অংশ।
মহান আল্লাহ আমাদের হৃদয়কে দয়ায় পরিপূর্ণ করুন, তাঁর সৃষ্টির প্রতি সদয় আচরণ করার তাওফিক দিন এবং তাঁর রহমত ও সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যমে জান্নাত নসিব করুন। আমিন।
আরও পড়ুন: ‘খ্রিস্টধর্ম প্রচার করতে গিয়েছিলাম, কিন্তু মুসলিম হয়ে ফিরলাম’
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন