০৯:৪৯ এম
সুনীল গঙ্গোপধ্যায় এই দেশটিকে ‘ছবির দেশ, কবিতার দেশ’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে সেখানে যাওয়ার পর দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যায়। ফ্রান্স, বিশেষ করে প্যারিস, এখন দাঙ্গার শহর হিসেবে পরিচিত। সেখানে ২ বিশ্বযুদ্ধেও অক্ষত থাকা লিমোজের বিখ্যাত নান্দনিক স্থাপনা ‘টাউন হল’ পুড়ে গেছে দাঙ্গার আগুনে, এবং শতশত দোকানপাট লুট হচ্ছে। ছবির দেশ, কবিতার দেশ এখন ‘আগুনের দেশ, লুটের দেশ’ হিসেবেও পরিচিতি পাচ্ছে।
গত রাতে প্যারিসে আরও একটি বিষয় পুড়ে গেছে এবং লুট হয়ে গেছে। গত আগস্ট থেকে কোচ হানসি ফ্লিক বার্সেলোনার জন্য যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছিলেন, সেটি ‘লুট’ হয়ে গেছে প্যারিসের পার্ক দে প্রাসে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের তৃতীয় ম্যাচে পিএসজি ৪-২ গোলে কাতালানদের পরাজিত করেছে।
ম্যাচের আগে বার্সেলোনার পরিস্থিতি ছিল বেশ আশাব্যঞ্জক। ১১ ম্যাচে তারা ৪৯ গোল করেছে এবং সবকটিতেই জয়ী হয়েছে। তবে এই পরিসংখ্যানের পেছনে একটি বাস্তবতা ছিল, যা অনেকেই হয়তো উপেক্ষা করেছেন। সেটি হলো বার্সেলোনার ক্লিন শিট রাখতে ব্যর্থতা। প্রথম ৪ ম্যাচে ৩টি ক্লিনশিট রাখার পর, পরবর্তী ৭ ম্যাচে তারা মাত্র ১ ম্যাচে গোল হজম ঠেকাতে পেরেছে। এই ৭ ম্যাচে তারা ১১ গোল হজম করেছে।
আরও পড়ুন: বিসিবি ব্যাটিং কোচ আশরাফুলকে সরিয়ে মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনকে নিয়োগ দিল
সেসব বাদ দিয়ে, সর্বশেষ রিয়াল বেতিস ম্যাচের কথা ভাবুন। বার্সেলোনার রক্ষণ বারবার ভেঙে যাচ্ছিলেন ভালেন্তিন গোমেজ ও আবদে এজাজুলিরা, তখনই সংকেতটি বেজে উঠছিল, কিন্তু কাতালানরা হয়তো তা শুনতে পারেনি।
গত রাতে দুই দলে চোট সমস্যা ছিল। বার্সেলোনা এরিক গার্সিয়া ও জুল কুন্দের মতো ডিফেন্ডারদের হারিয়েছে। অন্যদিকে, পিএসজি নুনো মেন্দেজকে হারিয়েছে। ম্যাচ চলাকালীন পিএসজি রক্ষণ ও আক্রমণের ৩ বড় তারকাকেও চোটের কারণে হারিয়েছে। ২০ মিনিটে উসমান দেম্বেলে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন, এবং ৬০ মিনিটে কভিচা কভারাৎশখেলিয়া ও মারকিনিয়োসকে হারাতে হয় পিএসজিকে।
তবে এর পরেও টানা দুই বারের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নরা নিজেদের খেলার ধরন থেকে একটুও বিচ্যুত হয়নি। বার্সেলোনা তাদের স্বাভাবিক খেলা খেলতে পেরেছে, কিন্তু দুই অর্ধের শুরুতে মাত্র ২০ মিনিট করে। বাকি সময়ে পিএসজি গোল করে ম্যাচ নিজেদের করে নিয়েছে।
৩৮ মিনিটে বক্সের জটলা থেকে গোল করে বার্সার রক্ষণ ভাঙার সূচনা করেন দেজিরে দুয়ে। দেম্বেলে ও কভারাৎশখেলিয়াদের ভিড়ে তিনি কিছুটা আড়ালে ছিলেন। এর আগে বার্সেলোনা একাধিক সুযোগ পেয়েছিল, কিন্তু সেগুলো কাজে লাগাতে পারেনি। চোট নিয়ে মাঠ ছাড়ার আগে দানি অলমো একটি সহজ সুযোগ নষ্ট করেন, এবং বদলি হিসেবে নামা ফেরমিন লোপেজও সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন। তবে শাভি এসপার্ত যখন সুযোগ পান, তখন তিনি মিস করেননি। রাইটব্যাক হিসেবে নামলেও, তিনি আক্রমণে উঠে এসে দলের রক্ষায় সাহায্য করেছিলেন। ফেরমিনের পাস থেকে গোল করে বার্সাকে সমতায় ফেরান।
আরও পড়ুন: মেসিকে ‘প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস অ্যাওয়ার্ড ফর স্পোর্টস’ দিল স্প্যানিশ রাজপরিবার
এরপর থেকে পিএসজির দাপট আবার শুরু হয়। ফেররান তরেস প্রথমার্ধে দুটি সুযোগ নষ্ট করেন, এবং দ্বিতীয়ার্ধে তার শট ক্রসবারে লাগে। শেষে পিএসজি গোল পায় কর্নার থেকে। লুকাস এর্নান্দেজের দারুণ হেডার গিয়ে জালে আছড়ে পড়ে।
লামিন ইয়ামাল একটি জবাব দেন মিনিট সাতেক পর। ৭৯ মিনিটে বদলি ডিফেন্ডার ওয়ারেন জাইরে এমেরিকে ফাঁকি দিয়ে পায়ের বাইরের অংশ দিয়ে বলটি জালে জড়ান। তখন মনে হচ্ছিল বার্সা অন্তত একটি পয়েন্ট নিয়ে প্যারিস ছাড়বে, কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যায়।
চলতি মৌসুমে হজম করা ১১ গোলের ৪টি বার্সেলোনা খেয়েছে নিজেদের গোল করার মিনিট পাঁচেকের মধ্যে। অর্থাৎ গোল করার পর দলের মনে যেন একটু আয়েশি ভাব চলে আসে। প্যারিসিয়ানরা সেই সময়টিকেই বার্সাকে ‘লুট’ করতে বেছে নিয়েছিল। বক্সের বাইরে থেকে আসা বল বুক দিয়ে রিসিভ করে দারুণ এক শট নেন ভিতিনিয়া, সেটি হোয়ান গার্সিয়াকে ফাঁকি দিয়ে জালে প্রবেশ করে।
এ পর্যন্ত স্কোরলাইনটি ঠিক ছিল। শেষ ২ বারের চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে সামর্থ্যের পুরোটা দিলেও ঘাটতি থেকে যায়। কিন্তু বিষয়টি আরও বিগড়ে যায় গোলের মিনিট পাঁচেক পর। ডান পাশ থেকে আশরাফ হাকিমি আক্রমণে উঠে আসেন, তার ক্রস জোয়াও কানসেলোকে ফাঁকি দিয়ে ফাবিয়ান রুইজ দখলে নেন এবং বলটি জালে জড়িয়ে দেন।
আরও পড়ুন: রোনালদোর ৯৮২তম গোল নিয়ে বিতর্ক, গোলটি আত্মঘাতী হিসেবে নথিভুক্ত
লড়াইটি যখন দুই সমশক্তির দলের মধ্যে, তখন স্কোরলাইন ৪-২ বেশ বেমানান। বার্সেলোনা গত রাতে সেটাই হজম করতে হয়েছে। ১১ ম্যাচে ৪৯ গোল করে আসা দলটির আত্মবিশ্বাসে এই ফলাফল ভালোভাবেই দাগ কাটবে।
তবে দলের কঠিন পরীক্ষা এখানেই শেষ নয়। পরবর্তী ম্যাচটি এল ক্লাসিকো। প্যারিসে ‘লুট’ হয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস সে ম্যাচের আগে কীভাবে ফেরাবে বার্সেলোনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন