০৬:১০ পি.এম
চীন এমন হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল (এইচজিভি) তৈরি করেছে, যেগুলো থেকে আকাশ-থেকে-আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া সম্ভব। নতুন এই সক্ষমতার মাধ্যমে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা উচ্চমূল্যের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো সম্ভব হতে পারে। এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ বিমান, আকাশপথে সতর্কতা ও নজরদারি চালানো বিমান এবং যুদ্ধবিমানকে সহায়তা দেওয়া ট্যাংকারও রয়েছে।
বিষয়টি সম্পর্কে সরাসরি অবগত এক ব্যক্তি এমন তথ্য জানিয়েছেন।
সংবেদনশীলতার কারণে পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্ষেপণাস্ত্রভাণ্ডারগুলোর একটি থাকা চীন এখন এসব অস্ত্রকে আরও বহুমুখী সামরিক কাজে ব্যবহারের সক্ষমতা তৈরি করছে।
আরও পড়ুন: মালদ্বীপের স্পিকারের সঙ্গে বাংলাদেশের হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ, আলোচনা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে
চীনের কাছে ৩ হাজার ১৫০টিরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে বলে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের হিসাব। নতুন এই সক্ষমতা চীনের বৃহত্তর ক্ষেপণাস্ত্র আধুনিকায়ন কর্মসূচির অংশ, যার লক্ষ্য প্রতিপক্ষের সামরিক ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে একই সঙ্গে আঘাত হানা।
এদিকে ইরানের সঙ্গে ছয় মাসের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ও দীর্ঘপাল্লার হামলা চালানোর অস্ত্রের সরবরাহ সংকটে পড়েছে। ফলে চীনের এই নতুন সক্ষমতার খবর মার্কিন সামরিক পরিকল্পনায় বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
হাইপারসনিক অস্ত্রে নতুন সক্ষমতা
ওই ব্যক্তির দাবি, চীন কিছু হাইপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রেও আকাশ-থেকে-আকাশে হামলার সক্ষমতা যুক্ত করেছে। একই সঙ্গে কয়েক ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রে জাহাজবিধ্বংসী সক্ষমতাও সংযোজন করা হয়েছে।
এ ধরনের অস্ত্র চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান পরিচালনার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারে। কারণ, যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি না গিয়ে দূরবর্তী অঞ্চল থেকে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে হয় যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক বিমানগুলোকে। এর মধ্যে রয়েছে আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার বিমান, এয়ারবোর্ন আর্লি ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল বা আকাশপথে আগাম সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণ বিমান এবং এমনকি উড়ন্ত কমান্ড পোস্ট হিসেবে ব্যবহৃত ই-৪বি নাইটওয়াচ।
চীনের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র যদি এসব বিমানকে লক্ষ্য করার সক্ষমতা অর্জন করে থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত বিমান অভিযান পরিচালনার কাঠামো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের দশম স্থলবাহিনী সংলাপ ঢাকা সেনানিবাসে সফলভাবে সম্পন্ন
গুয়াম ও হাওয়াইও সম্ভাব্য পাল্লার মধ্যে
চীনের ডিএফ-১৭ ক্ষেপণাস্ত্র থেকে নিক্ষেপ করা একটি হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল প্রায় ২ হাজার ৪০০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে বলে ধারণা করা হয়। এই পাল্লা চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি গুয়ামের দূরত্বের প্রায় কাছাকাছি।
আরও শক্তিশালী ডিএফ-২৭ ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ পাল্লা প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার বলে ধারণা করা হয়। এই পাল্লার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জও এর আওতায় আসতে পারে।
হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল হলো এমন এক ধরনের অস্ত্র, যার ওয়ারহেড বায়ুমণ্ডলের ভেতর দিয়ে অত্যন্ত উচ্চ গতিতে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। এই চালচলনের সক্ষমতা প্রচলিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় এর গতিপথ অনুমান ও প্রতিহত করা আরও কঠিন করে তোলে।
বিশ্বের আর কোনও দেশ হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকলের সঙ্গে আকাশ-থেকে-আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বয় ঘটিয়েছে- এমন তথ্য প্রকাশ্যে জানা নেই।
আরও পড়ুন: গণতন্ত্রের শর্ত ও রাজনৈতিক সংকটের গুরুত্ব: তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিতর্ক
‘সিস্টেম-লেভেল’ আঘাতের দিকে চীনের নজর
মার্কিন বিমানবাহিনীর চায়না অ্যারোস্পেস স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের চলতি বছরের এক প্রতিবেদনে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র আধুনিকায়ন নিয়ে বলা হয়েছে, বেইজিংয়ের অগ্রাধিকার ক্রমেই এমন সক্ষমতা অর্জনের দিকে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে প্রতিপক্ষের সামরিক কার্যক্রমের পুরো কাঠামোয় সমন্বিতভাবে ক্ষতি করা যায়।
অর্থাৎ, শুধু কোনও একটি ঘাঁটি বা যুদ্ধবিমান ধ্বংসের পরিবর্তে শত্রুর যোগাযোগ, নজরদারি, কমান্ড, জ্বালানি সরবরাহ এবং যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতার ওপর একই সঙ্গে আঘাত হানাই চীনের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে উঠছে।
তবে সামরিক বিশ্লেষকদের জন্য প্রশ্নও রয়েছে। মূলত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে উড়ন্ত কোনও বিমানকে আঘাত করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
দূরপাল্লার লক্ষ্যবস্তুতে হামলায় বড় চ্যালেঞ্জ
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সর্বোচ্চ পাল্লায় পৌঁছাতে ২০ মিনিট বা তারও বেশি সময় নিতে পারে। ফলে লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান সম্পর্কে অত্যন্ত নির্ভুল ও হালনাগাদ তথ্য প্রয়োজন হবে।
আরও পড়ুন: ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ৪৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল
দূরবর্তী কোনও সেন্সর বা গোয়েন্দা ব্যবস্থা থেকে পাওয়া তথ্য ক্ষেপণাস্ত্রের কাছে পৌঁছে সেটিকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিচালিত করার পুরো প্রক্রিয়াকে সামরিক ভাষায় ‘কিল চেইন’ বলা হয়। এই দীর্ঘ কিল চেইনের প্রতিটি ধাপই প্রতিপক্ষের আক্রমণ বা বৈদ্যুতিন যুদ্ধের মাধ্যমে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো—ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উৎক্ষেপণকে পারমাণবিক হামলা হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করা হতে পারে। বিশেষ করে কোনও বড় সামরিক সংঘাতের সময় প্রচলিত ও পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় কঠিন হলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
এ ধরনের ভুল বোঝাবুঝি বা ‘ডিসক্রিমিনেশন প্রবলেম’ অনিচ্ছাকৃতভাবে পারমাণবিক পাল্টা হামলার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
দ্রুত বাড়ছে চীনের ক্ষেপণাস্ত্রভাণ্ডার
চীনের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সাল নাগাদ চীনের কাছে অন্তত ৩ হাজার ১৫০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় ৩০০টি স্থল থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। ২০১৫ সালের তুলনায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা প্রায় ১৪৭ শতাংশ এবং স্থলভিত্তিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।
আরও পড়ুন: ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান শাকিলের জানাজায় এমপির বিরুদ্ধে
চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৩ সালে ক্ষমতায় আসার পর গত বছর দেশটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন আরও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
চীনের দীর্ঘপাল্লার পিএল-১৫ আকাশ-থেকে-আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা নিয়ে এরই মধ্যে বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে। গত বছর ভারত-পাকিস্তানের স্বল্পস্থায়ী সংঘাতে পাকিস্তান এসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে কয়েকটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছিল।
পাল্টা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রও
চীনের এই ধরনের দীর্ঘপাল্লার আকাশ-থেকে-আকাশে হামলার সক্ষমতার মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রও নতুন অস্ত্র উন্নয়ন করছে। দূরপাল্লার আকাশ-থেকে-আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রকে ভবিষ্যৎ যেকোনও বড় সামরিক সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র আরটিএক্স-এর এসএম-৬ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তি ব্যবহার করে এআইএম-১৭৪বি তৈরি করেছে। এর সঠিক পাল্লা গোপন রাখা হলেও স্থলভিত্তিক এসএম-৬-এর পাল্লা ৪০০ কিলোমিটার বা তার বেশি বলে জানা যায়।
এছাড়া শনিবার মার্কিন নৌবাহিনী জানিয়েছে, তারা আরটিএক্স-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান রেথিয়নের তৈরি এআইএম-৪২৪ ম্যালিস আকাশ-থেকে-আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালাচ্ছে। মার্কিন নৌবাহিনীর দাবি, নতুন এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৪৮০ কিলোমিটারের বেশি।
আরও পড়ুন: কসোভোতে মুসলিম দেশ হিসেবে অন্য এক দৃষ্টান্ত: ক্যাথলিক নারী নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট
আরও একটি দীর্ঘপাল্লার অস্ত্র লকহিড মার্টিনের-এর এআইএম-২৬০ বর্তমানে উৎপাদনে রয়েছে, যদিও এটি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক বাহিনীতে কার্যকরভাবে মোতায়েন হয়নি। এর পাল্লাও অত্যন্ত দীর্ঘ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ইউরোপে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত এমবিডিএ মেটিওর ক্ষেপণাস্ত্র র্যামজেট প্রযুক্তিতে পরিচালিত হয় এবং ১৬০ কিলোমিটারের বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই যখন দীর্ঘপাল্লার আকাশযুদ্ধের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, তখন ভবিষ্যৎ সংঘাতে শুধু যুদ্ধবিমান নয়, যুদ্ধ পরিচালনায় সহায়তাকারী ট্যাংকার, নজরদারি বিমান ও কমান্ড পোস্টও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। ফলে আকাশযুদ্ধের প্রচলিত ধারণার পাশাপাশি দূরবর্তী ‘হাই-ভ্যালু’ সামরিক সম্পদ রক্ষার কৌশলও দ্রুত বদলে যেতে পারে। সূত্র: ব্লুমবার্গ, জাপান টাইমস, দ্য স্ট্রেইটস টাইমস
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন