১০:২৬ এম
দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের একটি ক্ষুদ্র মুসলিম দেশের খবর সম্প্রতি ব্যাপকভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দেশটির নাম কসোভো। গত ৭ অক্টোবর, প্রায় ৯৬ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত এই দেশের পার্লামেন্ট একজন ক্যাথলিক খ্রিষ্টান নারীকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করেছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যেও, দেশটির মুসলিম সদস্যরা একজন খ্রিষ্টানকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে দেখিয়েছেন, কীভাবে বিভিন্ন ধর্ম ও জাতির মানুষ একসঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করতে পারে। নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টের নাম জাস্টিনা শিরোকা পুলা। তিনি দেশের তৃতীয় নারী প্রেসিডেন্ট হলেও, খ্রিষ্টান হিসেবে প্রথম। এটি ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহনশীলতার একটি অনন্য উদাহরণ।
এটি উল্লেখযোগ্য যে, কসোভোতে খ্রিষ্টানদের মোট সংখ্যা ৫ থেকে ৬ শতাংশ। ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের সংখ্যা ২ থেকে ৩ শতাংশ। এমন একটি পরিসংখ্যানে, যেখানে তারা সংখ্যালঘু, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঘটনা অত্যন্ত বিরল। যদিও অনেক বছর আগে আরেকটি মুসলিম রাষ্ট্র সেনেগালে এমন একটি দৃষ্টান্ত দেখা গিয়েছিল। দেশটি ১৯৬০ সালে স্বাধীন হওয়ার পর, কসোভোর মতো ৯৬ শতাংশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে একজন ক্যাথলিক খ্রিষ্টানকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছিল। তার নাম ছিল লিউপোলড সেদার সিংঘর। তিনি ২০ বছর ধরে সফলভাবে দেশ পরিচালনা করেছিলেন।
বর্তমানে, যখন সারা বিশ্বে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা সংঘর্ষে লিপ্ত, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের ইসলামসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ওপর নিষ্ঠুর নিপীড়ন চালানোর প্রেক্ষাপটে, কসোভোর এই ঘটনা একটি অনন্য উদাহরণ হিসেবে সবাইকে শিক্ষা দিয়েছে।
আরও পড়ুন: ১২৪ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে
দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের এই ক্ষুদ্র দেশের আয়তন মাত্র ১০ হাজার ৮৭৮ বর্গকিলোমিটার। এটি ইউরোপের দশম ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। জনসংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ, যার মধ্যে ৯৬ শতাংশ মুসলমান এবং ৪ শতাংশ খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। ১৯৯৮-৯৯ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর, ন্যাটো ও জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সার্বিয়ার সৈন্যদের প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয়। এরপর ৯ বছর জাতিসংঘের প্রশাসনের অধীনে থাকার পর, দেশটি চূড়ান্তভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। যদিও জাতিসংঘের সব সদস্য দেশ এই সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রকে এখনো স্বীকৃতি দেয়নি, তবে ১৯৩টি সদস্য দেশের মধ্যে ১১৫টি দেশ কসোভোকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সার্বিয়া ও রাশিয়া বরাবরই কসোভোর স্বাধীনতার বিরোধিতা করে আসছে।
এদিকে, দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের এই ছোট্ট দেশটি সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই হয়তো তেমন কোনো ধারণা নেই। তাই সংক্ষেপে হলেও এর একটি বিবরণ থাকা দরকার। কারণ, ৯৬ শতাংশ মুসলমান অধ্যুষিত দেশে একজন ক্যাথলিক খ্রিষ্টানকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঘটনা ব্যাখ্যা করার জন্য কিছুটা বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, দেশটির মানুষ ধর্মের চেয়ে জাতীয়তাবাদকে বেশি গুরুত্ব দেয়। দেশটির জনগণ জাতিগতভাবে প্রধানত আলবেনীয়। তারা মনে করে, আলবেনীয় পরিচয়ের সঙ্গে আলবেনীয় জাতীয়তাবাদ জড়িত। সেই কারণেই কসোভো যুদ্ধের সময় মুসলমান ও খ্রিষ্টানরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছেন।
মূলত কসোভো একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। তবে এটি কামাল আতাতুর্কের ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্কের মতো নয়। এখানে সব ধর্মের মানুষকে সমভাবে ধর্মীয় স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। বলা যায়, কসোভোর ধর্মনিরপেক্ষতা হলো ধর্ম ও রাষ্ট্রের পারস্পরিক সহাবস্থান এবং নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ ধর্ম ও রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখা এবং নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। পক্ষান্তরে, কামাল আতাতুর্কের ধর্মনিরপেক্ষতার মডেলে ধর্মের ওপর রাষ্ট্রের কঠোর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, সেখানকার আলেমসমাজ কীভাবে ভূমিকা পালন করে, সেটিও জানার বিষয়। জানা গেছে, কসোভোর আলেমসমাজ ঐতিহাসিকভাবে বলকান অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী উদারপন্থি হানাফি সুন্নি মতাদর্শ অনুসরণ করে থাকে। তারা ইসলামকে চরমপন্থা ও উগ্রবাদ থেকে মুক্ত রেখে সহনশীল এবং আধুনিক জীবনমুখী ধর্ম হিসেবে প্রচার করে থাকে।
আরও পড়ুন: পুতিন ও জেলেনস্কির শিগগিরই বৈঠক হবে: ট্রাম্প
এছাড়া কসোভোতে সুফিবাদেরও প্রাচীন ইতিহাস রয়েছে। বলকান অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার ঘটেছে মূলত সুফি-সাধকদের মাধ্যমে, যেমনটি ঘটেছে ভারতীয় উপমহাদেশেও। তাই এ উপমহাদেশে যেমন অসংখ্য মানুষ সুফিবাদ অনুসরণ করেন, তেমনি কসোভোয়ও বিপুলসংখ্যক মানুষ সক্রিয়ভাবে বিভিন্ন সুফি তরিকার সঙ্গে যুক্ত আছেন। আমাদের অঞ্চলের মতো সেখানেও মূলধারার সুন্নি আলেমসমাজ ও সুফি দরবেশদের মধ্যে ধর্ম পালনের বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে তা কখনো সংঘাতে রূপ নেয় না।
আমাদের অঞ্চলের মতো কসোভোয়ও সুফিবাদের অনুসারীরা বিভিন্ন তরিকার অনুসারী। সেখানে প্রধানত রিফাই, খালওয়াতি, কাদেরি ও বেকতাশি তরিকার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। সেখানেও খানকা রয়েছে, যাকে দেশটির ভাষায় বলা হয় তেকে। এই তেকে সামাজিক মিলনকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এখানে অভাবী মানুষদের খাবার দেওয়া হয়। আমাদের উপমহাদেশের খানকাগুলোয়ও যেমন অভাবীসহ সব ধরনের মানুষ আহার করেন, সেখানেও তেমন ব্যবস্থা রয়েছে।
এছাড়া কসোভোর সুফিরা, বিশেষ করে রিফাই তরিকার দরবেশরা, প্রতিবছর বসন্তের শুরুতে (২২ মার্চ) হজরত আলী (রা.)-এর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ‘সুলতান নওরোজ’ উৎসব পালন করে থাকেন। এই উৎসবে জিকিরের সময় দরবেশরা একধরনের আধ্যাত্মিক ঘোরের মধ্যে চলে যান এবং নিজেদের গালে ও শরীরে লোহার শিক বা সুচ বিদ্ধ করেন, যা বলকান অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্য।
এ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মূলত সুফি সাধকরাই ইসলাম ধর্ম প্রচার করেছেন। তারা এই শিক্ষা পেয়েছেন সাহাবায়ে কেরাম ও তাবে-তাবেঈনদের কাছ থেকে। এখানে উল্লেখ করতে হয়, সাহাবায়ে কেরাম রাসুল (সা.)-এর বিদায় হজের ভাষণে দেওয়া নির্দেশ অনুসরণ করে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। তাদের অনুসরণ করেছিলেন তাবে-তাবেঈনরা এবং পরবর্তীকালে সুফি সাধকরা। বিদায় হজের ভাষণে রাসুল (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘সাবধান! যারা এখানে উপস্থিত আছো, তারা এই বাণীটি অনুপস্থিতদের কাছে পৌঁছে দেবে। সম্ভবত অনুপস্থিত ব্যক্তি উপস্থিত শ্রোতাদের চেয়ে বেশি ভালোভাবে কথাটি অনুধাবন করতে পারবে।’
আরও পড়ুন: প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ৫ জন নিহত
মহানবী (সা.)-এর ওই নির্দেশের পর সাহাবায়ে কেরাম পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েন। এখানে উল্লেখ করতে হয়, বিদায় হজের এই সমাবেশে ১ লাখ ১৪ হাজার, মতান্তরে ১ লাখ ২৪ হাজার সাহাবি উপস্থিত ছিলেন। কথিত আছে, এই সাহাবিদের মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১২ হাজার সাহাবির কবর মক্কা ও মদিনায় রয়েছে। বাকি সাহাবিদের কবর পৃথিবীর নানা দেশে রয়েছে। এভাবে সাহাবিদের অনুসরণ করে তাবে-তাবেঈনরাও সারা দুনিয়ায় ইসলাম প্রচারে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। একইভাবে সুফি সাধকরা পৃথিবীর নানা দেশে ইসলাম প্রচার করে গেছেন। আমাদের উপমহাদেশেও এমনটি ঘটেছে। এখানে কোনো শাসক তরবারি উঁচিয়ে ইসলাম প্রচার করেননি; বরং সুফি ও দরবেশরা শান্তির বাণী নিয়ে ইসলাম প্রচার করেছেন।
এই পটভূমিতে বলা যায়, ইসলাম শান্তির ধর্ম হিসেবে পরিচিত। চরমপন্থা, উগ্রতা বা ফ্যাসাদ সৃষ্টি করা ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং ইসলাম ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীদের কঠোরভাবে দমন করার কথা বলেছে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক
আরও পড়ুন: মঙ্গলে নাসার ওডিসির দুই দশকের সাফল্য ও নতুন তথ্যের উন্মোচন
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন