ঢাকা রবিবার, ২৫শে অক্টোবর, ২০২৬খ্রিষ্টাব্দ ০৯ই কার্তিক, ১৪৩৩বঙ্গাব্দ ১৪ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিজরী
রবিবার, ২৫শে অক্টোবর, ২০২৬ইং ০৯ই কার্তিক, ১৪৩৩বাং

বাংলাদেশ-চীন স্থলপথে সংযোগ: নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার উন্মোচন


বাংলাদেশ-চীন স্থলপথে সংযোগ: নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার উন্মোচন

মানবসভ্যতার ইতিহাসে বাণিজ্যপথ কখনোই শুধুমাত্র পণ্য পরিবহনের মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি সভ্যতার বিকাশ, সংস্কৃতির বিনিময় এবং ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। প্রাচীন সিল্ক রোড যেমন চীন, মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপকে যুক্ত করে কেবল পণ্য নয়, বরং জ্ঞান, প্রযুক্তি, ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির বিস্তার ঘটিয়েছে, তেমনি আধুনিক বিশ্বে করিডোর, বন্দর, মহাসড়ক ও রেলপথকে কেন্দ্র করে নতুন ভূ-অর্থনৈতিক বাস্তবতা গড়ে উঠছে। বর্তমান বিশ্বের একটি বাণিজ্যপথের গুরুত্ব শুধুমাত্র কত দ্রুত পণ্য একস্থান থেকে অন্যস্থানে পৌঁছায়, তার ওপর নির্ভর করে না; বরং সেই পথ কোন কোন উৎপাদনকেন্দ্র, বাজার, বন্দর ও ভোক্তা অঞ্চলের মধ্যে সংযোগ তৈরি করছে এবং তার মাধ্যমে কী ধরনের আঞ্চলিক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে, তার ওপরও নির্ভর করে। এই কারণেই আধুনিক করিডরগুলোকে অনেক সময় ‘অর্থনৈতিক ধমনি’ হিসেবে দেখা হয়, যার মাধ্যমে পণ্য, পুঁজি, প্রযুক্তি, মানুষ ও তথ্যের প্রবাহ একটি অঞ্চলের উৎপাদন কাঠামোকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করতে পারে।

একবিংশ শতাব্দীতে যে রাষ্ট্রগুলো সংযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করবে, তারা অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হওয়ার সুযোগ পাবে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অধ্যয়নে অবকাঠামোগত সংযোগকে পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন হিসেবে নয়, বরং বাজার সম্প্রসারণ, বাণিজ্য ব্যয় হ্রাস, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক মূল্যশৃঙ্খলে অন্তর্ভুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে স্থলবেষ্টিত বা তুলনামূলকভাবে দূরবর্তী উৎপাদন ও বাজারকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সমুদ্রবন্দরকে যুক্ত করতে পারলে একটি করিডর তার নিজস্ব ভূগোলের সীমাবদ্ধতাকে অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তর করতে পারে। ফলে আধুনিক বিশ্বে ‘কোথায় একটি দেশ অবস্থিত’—এই প্রশ্নের পাশাপাশি ‘কোন কোন অঞ্চলের সঙ্গে দেশটি কতটা কার্যকরভাবে সংযুক্ত’—এই প্রশ্নটিও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের জন্য মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে স্থলপথে সংযোগের বিষয়টি এই বৃহত্তর বাস্তবতার একটি অংশ। এটি কেবল একটি সড়ক বা রেলপথ নির্মাণের প্রশ্ন নয়; বরং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, আঞ্চলিক বাণিজ্য, শিল্পায়ন, সরবরাহব্যবস্থা এবং ভূ-রাজনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশেষ করে চীনের ইউনান প্রদেশ, মিয়ানমারের মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চল এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রামকেন্দ্রিক বন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মধ্যে কার্যকর স্থল ও বহুমাত্রিক সংযোগ গড়ে উঠতে পারলে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনকে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করার একটি নতুন অর্থনৈতিক অক্ষ তৈরি হতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশের জন্য কেবল চীনা বাজারে প্রবেশের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে না; বরং বাংলাদেশ নিজেও বৃহত্তর আঞ্চলিক উৎপাদন, বাণিজ্য ও লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

আরও পড়ুন: সরকার সৃজনশীল শিল্পকে মূলধারায় দেখতে চায়: অর্থমন্ত্রী

তবে এই সম্ভাবনাকে সরল অবকাঠামোগত প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা সম্ভব হবে না। একটি কার্যকর করিডর তখনই অর্থনৈতিকভাবে অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তার সঙ্গে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, কাস্টমস, পণ্য পরিবহন, গুদাম ও লজিস্টিকস অবকাঠামো, ডিজিটাল বাণিজ্যব্যবস্থা, বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন এবং আঞ্চলিক বাজারের সমন্বয় ঘটে। অর্থাৎ সড়ক নির্মাণ করিডরের সূচনা হতে পারে, কিন্তু করিডর অর্থনীতি গড়ে ওঠে তার চারপাশে উৎপাদন, বাণিজ্য ও সেবার একটি সমন্বিত বাস্তুতন্ত্র তৈরি হলে। সুতরাং, মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থলসংযোগের প্রশ্নটি একই সঙ্গে একটি পরিবহন প্রকল্প, একটি বাণিজ্যিক সম্ভাবনা এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি ভূ-অর্থনৈতিক কৌশলের প্রশ্ন। এখানেই নিহিত রয়েছে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে হলে সুযোগের পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক, অবকাঠামোগত, নিরাপত্তাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।

দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ইউনান প্রদেশ বহুদিন ধরেই সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকারের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। চীনের পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলীয় অঞ্চলগুলো অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত উন্নত হলেও ইউনান ও আশপাশের অভ্যন্তরীণ প্রদেশগুলো তুলনামূলকভাবে সমুদ্রবন্দর থেকে দূরে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পরিবহন ও আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে তাদের অনেকাংশেই চীনের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় বন্দরগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয়। এই ভৌগোলিক বাস্তবতা চীনের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের উন্নয়ন, পরিবহন ব্যয় কমানো এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য বিকল্প সরবরাহপথ তৈরির প্রশ্নকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বিশেষ করে চীনের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নকে পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলের তুলনায় অধিক ভারসাম্যপূর্ণ করার যে দীর্ঘমেয়াদি নীতি, তার সঙ্গে দক্ষিণমুখী আঞ্চলিক সংযোগের বিষয়টিও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

ফলে চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো দক্ষিণমুখী সংযোগের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে আরো কার্যকর যোগাযোগ এবং বিদ্যমান বাণিজ্যপথের পাশাপাশি বিকল্প পথ তৈরি করা। এটি শুধু দূরত্ব কমানোর প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে সরবরাহশৃঙ্খলের বৈচিত্র্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশ এবং পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি। এই লক্ষ্য থেকেই চীন মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ বন্দর, তেল ও গ্যাস পাইপলাইন, অর্থনৈতিক করিডর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াভিত্তিক বিভিন্ন সংযোগ প্রকল্পে বিনিয়োগ করে আসছে। কিয়াউকফিউ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত এই বন্দর ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো চীনের ইউনানকে মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে একটি সরাসরি ভূ-অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বারের সম্ভাবনা তৈরি করে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের মাধ্যমে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ভারত মহাসাগরীয় বাজার ও পরিবহনব্যবস্থার সংযোগ বৃদ্ধির বৃহত্তর পরিকল্পনার সঙ্গেও এটি যুক্ত।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একটি স্বাভাবিক সম্ভাব্য অংশীদার। কারণ ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ দক্ষিণ-পশ্চিম চীন, মিয়ানমার, দক্ষিণ এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগরের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগবিন্দু। তবে বাংলাদেশের গুরুত্ব শুধু মানচিত্রে মধ্যবর্তী অবস্থানের কারণে নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চট্টগ্রাম ও অন্যান্য সমুদ্রবন্দর, ক্রমবর্ধমান শিল্পভিত্তি, বৃহৎ ভোক্তা বাজার এবং দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সম্ভাব্য বাণিজ্যিক সংযোগ। ফলে একটি কার্যকর স্থলপথ যদি চীনের ইউনানকে মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তাহলে এই সংযোগ কেবল দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহনের পথ হিসেবে কাজ করবে না; বরং তা বৃহত্তর আঞ্চলিক উৎপাদন ও বাণিজ্য নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে উঠতে পারে।

আরও পড়ুন: আগস্টে ইইউতে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানি ১২.৭১% বেড়ে ১৩৪.০৮ মিলিয়ন ইউরো

যদি কুনমিং থেকে মান্দালয়, সেখান থেকে মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চল ও রাখাইন হয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের সঙ্গে কার্যকর সড়ক ও রেল সংযোগ গড়ে ওঠে, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি সম্পূর্ণ নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করতে পারে। এমন একটি করিডর কার্যকর হলে চট্টগ্রামকে শুধু বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির বন্দর হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক ট্রানজিট ও লজিস্টিকস কেন্দ্রে রূপান্তরের সম্ভাবনা তৈরি হবে। এর মাধ্যমে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পণ্য বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে পারে; একইভাবে বাংলাদেশের শিল্পপণ্য, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য রপ্তানি পণ্যও স্থলপথে দ্রুততর আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই ধরনের সংযোগ বাংলাদেশের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নতুন শিল্প, গুদামজাতকরণ, পরিবহন, সীমান্তবাণিজ্য ও লজিস্টিকস সেবা বিকাশের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ করিডরটি যদি কেবল ‘পথ’ হিসেবে না থেকে উৎপাদন ও বাণিজ্যের একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অক্ষ হিসেবে গড়ে ওঠে, তবে এর প্রভাব বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-অর্থনৈতিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এই সংযোগের গুরুত্ব তাই বহুমাত্রিক।

প্রথমত, এটি বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে সহায়তা করতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রধানত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাকেন্দ্রিক। এই বাজারগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও অতিরিক্ত বাজার-নির্ভরতা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, বাণিজ্যনীতি পরিবর্তন, ভোক্তা চাহিদার ওঠানামা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা ভূ-রাজনৈতিক সংকটের সময় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বাজার বৈচিত্র্যকরণ তাই বাংলাদেশের রপ্তানি কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া প্রয়োজন। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ওষুধ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল পণ্য এবং ডিজিটাল ও পেশাগত সেবার মতো খাতও এই বাজার সম্প্রসারণের সুবিধা পেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, সংযোগ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে রাজধানীকেন্দ্রিকতা থেকে বের করে আনতে পারে। বাংলাদেশের উন্নয়ন দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা ও চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। এর ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত থেকেছে। একটি কার্যকর আঞ্চলিক করিডর এই ভৌগোলিক কেন্দ্রীভবন কিছুটা পরিবর্তন করার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। যদি আঞ্চলিক করিডর বাস্তবায়িত হয় এবং এর সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সড়ক, রেল, নৌপথ ও বন্দর অবকাঠামোর কার্যকর সংযোগ তৈরি করা যায়, তাহলে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি এবং বৃহত্তর পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চল নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

আরও পড়ুন: ঢাকাই মসলিন বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আসছে, নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা

তৃতীয়ত, বাংলাদেশ একটি ট্রানজিট ও লজিস্টিকস হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ পেতে পারে। বিশ্বের বহু সফল অর্থনীতি প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নয়, বরং তাদের ভৌগোলিক অবস্থানকে দক্ষ অবকাঠামো, বন্দর, বাণিজ্যিক সেবা এবং লজিস্টিকস সক্ষমতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করে গড়ে উঠেছে। সিঙ্গাপুর, দুবাই কিংবা নেদারল্যান্ডসের উদাহরণ দেখলে বোঝা যায়, কৌশলগত অবস্থান নিজে কোনো অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; সেটিকে সম্পদে পরিণত করতে প্রয়োজন কার্যকর প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ, বাণিজ্যবান্ধব নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা।

বাংলাদেশকে নিশ্চিত করতে হবে, সংযোগের সুবিধা যাতে একমুখী না হয়ে পারস্পরিক হয়। অতীতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা গেছে, কিছু দেশ বৃহৎ করিডর প্রকল্পে অংশ নিয়েও প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করতে পারেনি। এর একটি কারণ হলো, তারা নিজেদের শিল্পভিত্তি, বন্দর সক্ষমতা, দক্ষ মানবসম্পদ, স্থানীয় সরবরাহশৃঙ্খল এবং নীতিগত প্রস্তুতিকে একই গতিতে এগিয়ে নিতে পারেনি। ফলে করিডর দিয়ে পণ্য চলে গেলেও তার বড় অংশের মূল্য সংযোজন অন্যত্র থেকে গেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই ঝুঁকি বিবেচনা করা জরুরি।

এখানে একটি মৌলিক বিষয় স্মরণ রাখা প্রয়োজন—করিডর কোনো লক্ষ্য নয়; করিডর হলো একটি মাধ্যম। লক্ষ্য হলো জাতীয় সমৃদ্ধি। দেখতে হবে, সেই সংযোগ বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশ এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা কতটা বাড়াতে পারছে। এই কারণেই বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ উপস্থিত হয়েছে। তারা চাইলে দেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে কেবল মানচিত্রের একটি বাস্তবতা হিসেবে রেখে দিতে পারেন; আবার চাইলে অবকাঠামো, বাণিজ্য, শিল্প, মানবসম্পদ ও কূটনীতির সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে সেটিকে অর্থনৈতিক শক্তি ও কৌশলগত সম্পদে রূপান্তর করতে পারেন। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত অতি-আশাবাদী বা অতি-সন্দেহপ্রবণ কোনোটিই নয়; বরং সম্ভাবনা, ব্যয়, ঝুঁকি ও জাতীয় স্বার্থের একটি সুসংহত মূল্যায়নের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে এগোনো।

মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে স্থলপথে সংযোগের সম্ভাবনা তাই একই সঙ্গে আকর্ষণীয় এবং জটিল।

আরও পড়ুন: ফ্রান্সে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৪.৯১ শতাংশ কমেছে

একদিকে চীনের ইউনান প্রদেশকে মিয়ানমার হয়ে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনা, অন্যদিকে মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, রাখাইন অঞ্চলের সংঘাত, রোহিঙ্গা সংকট এবং সীমান্ত নিরাপত্তার বাস্তবতা—সবকিছু মিলিয়ে এটি এমন একটি উদ্যোগ, যার অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন এমন একটি নীতি, যেখানে সম্ভাব্য করিডরকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে; কিন্তু তার বাস্তবায়ন নির্ভর করবে নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতার ওপর।

আমাদের মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গা সংকটও এই সমীকরণের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আশ্রয়দাতা হওয়ায় মিয়ানমারের সঙ্গে বৃহৎ আঞ্চলিক সংযোগ নিয়ে আলোচনায় মানবিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্ব পাবে। তাই বাংলাদেশ চাইলে সংযোগের প্রশ্নটিকে বৃহত্তর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। একটি স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় রাখাইন অঞ্চল শুধু মিয়ানমার বা বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং বৃহত্তর বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের জন্যও অর্থনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।

এখানে একটি মৌলিক বিষয় স্মরণ রাখা প্রয়োজন—করিডর কোনো লক্ষ্য নয়; করিডর হলো একটি মাধ্যম, যার লক্ষ্য হলো জাতীয় সমৃদ্ধি। যদি কোনো সংযোগ প্রকল্প বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করে, তবে তা জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। আবার যদি কোনো প্রকল্পের ব্যয়, ঝুঁকি, নিরাপত্তাগত দায় বা অর্থনৈতিক নির্ভরতা সম্ভাব্য সুবিধাকে ছাড়িয়ে যায়, তাহলে শুধু ভূ-রাজনৈতিক আকর্ষণের কারণে সেটিকে গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত প্রকল্পকেন্দ্রিক নয়, ফলাফলকেন্দ্রিক। জাতীয় স্বার্থে কোন পথ নির্মিত হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই পথ বাংলাদেশের মানুষের জন্য কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করছে, সেটা বিবেচনায় নেওয়া।

বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে তাই একটি ঐতিহাসিক সুযোগ উপস্থিত হয়েছে। দেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে কেবল মানচিত্রের বাস্তবতা হিসেবে রেখে দেওয়া যায়; আবার অবকাঠামো, বাণিজ্য, শিল্প, মানবসম্পদ, কূটনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে সেটিকে অর্থনৈতিক শক্তি ও কৌশলগত সম্পদে রূপান্তরও করা যায়। শেষ পর্যন্ত মিয়ানমার করিডর বাংলাদেশের জন্য শুধু চীনের সঙ্গে একটি নতুন স্থলপথের সম্ভাবনা নয়; এটি নিজের ভূগোলকে কীভাবে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা যায়, তার একটি বড় সুযোগ ও পরীক্ষা। বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি তাই কেবল ‘চীনের সঙ্গে সংযোগ হবে কি না’ এতটুকু নয়; বরং ‘সংযোগ তৈরি হলে বাংলাদেশ তার কতটা মূল্য নিজের অর্থনীতি, শিল্প ও মানুষের উন্নয়নে রূপান্তর করতে পারবে’ সেটিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। যদি জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সমন্বিত করে এগোনো যায়, তবে এই সংযোগ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। ভূগোল তখন আর শুধু অবস্থান থাকবে না; সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার মাধ্যমে সেটিই হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি।

আরও পড়ুন: টানা তৃতীয় দিনের মতো বন্ধ বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট

লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য

[email protected]

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

ইসলামি ব্যাংকিং ও ইসলামি অর্থায়ন ভিন্ন: বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

শুক্রবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০৯:১৫ এম


ইসলামি ব্যাংকিং ও ইসলামি অর্থায়ন ভিন্ন: বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা

বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের মে ২০২৬-এর নীতিপত্র অনুসারে, ২০২৫ সালের জুনে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মোট বিনিয়োগের মধ্যে মুশারাকা ও মুদারাবার সম্মিলিত অংশ ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে, বাই-মুরাবাহা ও বাই-মুয়াজ্জালের অংশ ছিল ৭০ দশমিক ৪ শতাংশ।

গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ। পূর্বনির্ধারিত মুনাফা ও ঋণসদৃশ আর্থিক পণ্যের ওপর নির্ভরতা ইসলামি অর্থায়নের ঝুঁকি ভাগাভাগির লক্ষ্যকে কতটা আড়াল করছে, সে প্রশ্ন তোলার প্রয়োজন রয়েছে। তবে এর আগে আরো মৌলিক একটি প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন। অংশীদারিত্বভিত্তিক বিনিয়োগের এই স্বল্প উপস্থিতি কি শুধুমাত্র ইসলামি অর্থায়নের ব্যর্থতা, নাকি ব্যাংক কী করতে পারে এবং কী করা উচিত, সে বিষয়ে আমাদের ধারণার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করে?

ইসলামি ব্যাংকিং ও ইসলামি অর্থায়ন পরস্পর সম্পর্কিত, কিন্তু অভিন্ন নয়। ইসলামি ব্যাংকিং ইসলামি অর্থায়নের একটি অংশ; আর ইসলামি অর্থায়ন বৃহত্তর ইসলামি অর্থনীতির অন্তর্ভুক্ত। ইসলামি অর্থনীতির পরিসরে ব্যাংকের পাশাপাশি বাজার, অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান, নৈতিকতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও উন্নয়নের লক্ষ্যও রয়েছে। ব্যাংককে দিয়েই এ পুরো ব্যবস্থার সাফল্য বা ব্যর্থতা বিচার করলে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থাকে।

বাণিজ্যিক ব্যাংকের তহবিলের প্রধান উৎস হচ্ছে আমানত। গ্রাহক প্রত্যাশা করেন, তার অর্থ নিরাপদ থাকবে এবং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তা ফেরত পাওয়া যাবে। ব্যাংককে তাই তারল্য, মূলধন পর্যাপ্ততা, আমানত প্রত্যাহারের ঝুঁকি এবং সম্পদ ও দায়ের মেয়াদের অসামঞ্জস্য সামলাতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংক এমন অর্থায়ন পছন্দ করে, যা থেকে তুলনামূলকভাবে পূর্বানুমানযোগ্য নগদ প্রবাহ আসে।

মুরাবাহা এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ। ব্যাংক একটি পণ্য কিনে ক্রয়মূল্যের সঙ্গে ঘোষিত মুনাফা যোগ করে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে। এতে গ্রাহকের পরিশোধযোগ্য দায় নির্ধারিত হয়। ইজারা এবং সম্পদভিত্তিক আরো কিছু অর্থায়নব্যবস্থাও ব্যাংকের জন্য অনুরূপ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পূর্বনির্ধারিত বিক্রয়মূল্য মানেই আদায়ের নিশ্চয়তা নয়; গ্রাহকের খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

মুশারাকা ও মুদারাবার অর্থনৈতিক চরিত্র ভিন্ন। এখানে অর্থদাতাকে প্রকল্পের ব্যবসায়িক ঝুঁকি গ্রহণ করতে হয়। মুশারাকায় মুনাফা চুক্তি অনুযায়ী ভাগ হয় এবং লোকসান বহন করা হয় মূলধনের অনুপাতে। মুদারাবায় স্বাভাবিক ব্যবসায়িক লোকসান মূলধনদাতা বহন করেন; উদ্যোক্তা হারান তার শ্রম ও সময়। তবে উদ্যোক্তার অবহেলা, অসদাচরণ বা চুক্তিভঙ্গের দায় পৃথকভাবে বিবেচ্য।

এ ধরনের অর্থায়নে মুনাফা অনিশ্চিত হতে পারে। কোনো উদ্যোগ থেকে ফল পেতে দীর্ঘ সময়ও লাগতে পারে। অর্থদাতাকে ব্যবসার প্রকৃতি বুঝতে হয়, পরিচালনার তথ্য পেতে হয় এবং আয় বণ্টন ছাড়াই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার সক্ষমতা রাখতে হয়। এ বৈশিষ্ট্যগুলো প্রচলিত বাণিজ্যিক ব্যাংকিংয়ের চেয়ে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল, প্রাইভেট ইকুইটি ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অর্থায়নের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষকরাও এ অসামঞ্জস্যের কয়েকটি দিক চিহ্নিত করেছেন। অংশীদারত্বভিত্তিক অর্থায়নে প্রতিকূল নির্বাচন, নৈতিক ঝুঁকি, তথ্যের অসমতা ও ব্যয়বহুল তদারকি বড় বাধা। অর্থাৎ ব্যাংক ও উদ্যোক্তার কাছে সমান তথ্য থাকে না; ভালো ও দুর্বল প্রকল্প আলাদা করা কঠিন হয়; অর্থ পাওয়ার পর উদ্যোক্তার আচরণ বদলে যেতে পারে; প্রকৃত আয় ও ব্যয় যাচাই করাও ব্যয়সাপেক্ষ।

এ অবস্থায় ইসলামি ব্যাংককে আরো মুশারাকা ও মুদারাবা করতে বললেই সমস্যার সমাধান হবে না। ইসলামি ব্যাংকিংয়ের সমস্যা শুধু নামে নয়, মডেলেও। নির্ধারিত পাওনা আদায় এবং স্বল্পমেয়াদি দায়ের বিপরীতে অপেক্ষাকৃত দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ ধারণের কাঠামোয় প্রকৃত অংশীদারত্বভিত্তিক অর্থায়ন সহজে বসানো যায় না।

বাংলাদেশের সামগ্রিক আর্থিক কাঠামোয়ও একই দুর্বলতা রয়েছে। শিল্প ও অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে আমরা ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। অথচ এসব খাতে ইকুইটি, বন্ড, সুকুক ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি উপকরণের বড় ভূমিকা থাকা উচিত। পুঁজিবাজারকে প্রবৃদ্ধির অব্যবহৃত চালিকাশক্তি হিসেবে কাজে লাগানো প্রয়োজন। ইসলামি অর্থায়নের ক্ষেত্রেও কার্যকর পুঁজিবাজারের ঘাটতি পূরণের ভার মূলত ব্যাংকের ওপর চাপানো হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামো, শিল্প বা নতুন উদ্যোগে বিনিয়োগের মেয়াদ সাধারণত ব্যাংকের আমানতের মেয়াদের চেয়ে দীর্ঘ। গবেষণাটিতেও স্বল্পমেয়াদি আমানত দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা ও এইচপিএসএম অর্থায়নে তারল্য এবং সম্পদ-দায়ের মেয়াদের অসামঞ্জস্যের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আমানতনির্ভর প্রতিষ্ঠানকে অনেক বেশি দীর্ঘমেয়াদি মুশারাকায় ঠেলে দিলে এ ঝুঁকি দূর হওয়ার বদলে বাড়তে পারে।

এ বিতর্ক শুধু ইসলামি অর্থনীতির নয়। মূলধারার অর্থনীতিতেও বহু দশক ধরে ব্যাংকের কাঠামোগত অস্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা চলছে। হেনরি সাইমনস, আরভিং ফিশারসহ অর্থনীতিবিদদের সমর্থিত শিকাগো পরিকল্পনায় লেনদেনযোগ্য আমানতের বিপরীতে শতভাগ রিজার্ভ রাখার প্রস্তাব ছিল। উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংকের মুদ্রা ও লেনদেনসেবা থেকে ঋণ সৃষ্টির কার্যক্রমকে পৃথক করা। পরবর্তী সময়ে মিল্টন ফ্রিডম্যানও শতভাগ রিজার্ভ ব্যবস্থার কিছু রূপ সমর্থন করেন। ভগ্নাংশ রিজার্ভ ব্যাংকিংয়ে সহজে প্রত্যাহারযোগ্য আমানতের সঙ্গে ঋণ সৃষ্টির সম্পর্ক যে অস্থিতিশীলতার উৎস হতে পারে, এ চিন্তাধারা সেটিই সামনে আনে।

হাইম্যান মিনস্কি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আর্থিক অস্থিতিশীলতা ব্যাখ্যা করেছেন। দীর্ঘ সমৃদ্ধির সময়ে ঋণ ও পুনঃঅর্থায়নের ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকলে আর্থিক ব্যবস্থা এমন অবস্থায় চলে যেতে পারে, যেখানে আয় দিয়েই আসল ও সুদ পরিশোধ সম্ভব। এরপর এমন অবস্থা আসে, যখন শুধু সুদ পরিশোধ করা সম্ভব হয়, কিন্তু আসল ফেরত দিতে নতুন ঋণের প্রয়োজন হয়। শেষ পর্যন্ত সুদ পরিশোধেও নতুন ঋণ নিতে হয়। মিনস্কি এগুলোকে যথাক্রমে হেজ, স্পেকুলেটিভ ও পনজি অর্থায়ন বলেছেন। দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতাও এভাবে অতিরিক্ত ঝুঁকি গ্রহণের মাধ্যমে ভঙ্গুরতা তৈরি করতে পারে।

ইসলামি অর্থায়নের জন্য শিক্ষা হলো, প্রত্যাহারযোগ্য আমানতনির্ভর প্রতিষ্ঠানকে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল অংশীদারত্বে রূপান্তর করলে তারল্য, সুশাসন ও মেয়াদগত ঝুঁকির প্রশ্ন নতুন করে আসে। শুধু চুক্তির নাম বদলে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না।

তার অর্থ এই নয় যে মুরাবাহাই ইসলামি অর্থায়নের সর্বোত্তম সমাধান, কিংবা ব্যাংক থেকে মুশারাকা ও মুদারাবা পুরোপুরি বাদ দিতে হবে। উপযুক্ত মেয়াদের তহবিল, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা থাকলে ব্যাংকের অংশীদারত্বভিত্তিক অর্থায়ন মূল্যবান ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু মুরাবাহার আধিপত্যকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইসলামি নীতি থেকে বিচ্যুতির চূড়ান্ত প্রমাণ বলা যথার্থ নয়। এর জনপ্রিয়তা বিদ্যমান ব্যাংকিং কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যের ফলও হতে পারে।

তাহলে নীতিগত চ্যালেঞ্জ শুধু ব্যাংকের পণ্যতালিকায় মুশারাকা বা মুদারাবার অনুপাত বাড়ানো নয়; প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক বৈচিত্র্য। বাংলাদেশের ইসলামি আর্থিক ব্যবস্থাকে দুটি পরস্পর পরিপূরক স্তম্ভের ওপর দাঁড় করাতে হবে।

প্রথম স্তম্ভ হবে বাণিজ্যিক ইসলামি ব্যাংকিং। এর কাজ হবে লেনদেন ও পরিশোধসেবা, আমানত, বাণিজ্য অর্থায়ন, মুরাবাহা, ইজারা, সালাম এবং পরিবার ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোগের উপযোগী অর্থায়ন। এসব প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর শরিয়াহ তদারকি, বিচক্ষণ ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা ও আমানতকারীর সুরক্ষার আওতায় পরিচালিত হতে হবে।

দ্বিতীয় স্তম্ভ হবে বিস্তৃত ইসলামি ঝুঁকি মূলধন ও পুঁজিবাজার। এতে থাকবে মুশারাকাভিত্তিক বিনিয়োগ কোম্পানি, মুদারাবা তহবিল, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও প্রাইভেট ইকুইটি তহবিল, পেনশন এবং তাকাফুলের বিনিয়োগ তহবিল, করপোরেট ও অবকাঠামো সুকুক এবং বিশেষায়িত উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে পারে এবং ব্যবসার ফল অনুযায়ী ঝুঁকি বহন করতে পারে—এমন মূলধন জোগানোর উপযোগী প্রতিষ্ঠান এখানেই গড়ে তুলতে হবে।

বাংলাদেশের সুকুক বাজার গড়ে তোলার নকশায়ও এ প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। শুধু সরকারি সুকুক দিয়ে কার্যকর ইসলামি পুঁজিবাজার তৈরি হয় না। প্রয়োজন করপোরেট ইস্যুকারী, শরিয়াহসম্মত লেনদেনযোগ্য উপকরণ এবং সচল ও পর্যাপ্ত তারল্যসম্পন্ন দ্বিতীয় বাজার। সামাজিক অর্থায়নেও বিশেষায়ন দরকার। বিশেষায়িত করজে হাসানা ব্যাংক গড়ে তোলার পেছনেও একই যুক্তি রয়েছে : প্রতিটি সামাজিক আর্থিক লক্ষ্য একটি সর্বজনীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের ওপর চাপানোর প্রয়োজন নেই।

অংশীদারত্বভিত্তিক অর্থায়ন বাড়াতে গবেষকদের প্রস্তাবিত লক্ষ্য ও প্রণোদনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। তবে শুধু অনুপাত পূরণের চাপ দিলে এমন চুক্তিও তৈরি হতে পারে, যার নাম মুশারাকা হলেও প্রকৃত ফল প্রায় পূর্বনির্ধারিত ঋণসদৃশ মুনাফা। নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শতাংশ বদলানো সহজ; অন্তর্নিহিত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বদলানো অনেক কঠিন।

বাংলাদেশের প্রশ্ন তাই শুধু ইসলামি ব্যাংক এত কম মুশারাকা করছে কেন, তা নয়। প্রশ্ন হলো, মুশারাকা ও মুদারাবা স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হতে পারে—এমন প্রতিষ্ঠান আমরা গড়ে তুলিনি কেন?

ইসলামি ব্যাংককে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল তহবিলে পরিণত করার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন ব্যাংককে আরো দক্ষ, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল ব্যাংক হিসেবে গড়ে তোলা। পাশাপাশি ব্যাংকের বাইরে এমন ইসলামি আর্থিক ব্যবস্থা দরকার, যা দীর্ঘমেয়াদি, ঝুঁকি ভাগাভাগিভিত্তিক মূলধন জোগাতে পারে। ইসলামি ব্যাংকিং ও ইসলামি অর্থায়নের মৌলিক পার্থক্য এখানেই। বাংলাদেশের পরবর্তী সংস্কারের সূচনা হওয়া উচিত এ উপলব্ধি থেকে।

লেখক: যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিন্সের ফাইন্যান্সের অধ্যাপক ও মফেট চেয়ার। ইসলামি ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্সে ২০১৬ সালের ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পুরস্কারপ্রাপ্ত। এএওআইএফআইয়ের এথিকস অ্যান্ড গভর্ন্যান্স বোর্ডের সদস্য এবং এডুকেশন বোর্ডের চেয়ারম্যান

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

সম্প্রীতির সীমানা ও ঈমানের স্বকীয়তা বজায় রাখতে হবে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

শুক্রবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০৯:১৬ এম


সম্প্রীতির সীমানা ও ঈমানের স্বকীয়তা বজায় রাখতে হবে

ধর্ম ও বিশ্বাসের বৈচিত্র্য মানবসমাজের একটি পরিচিত রূপ হলেও, প্রতিটি ধর্মের নিজস্ব আদর্শ, নীতি এবং স্বাতন্ত্র্যের একটি সুস্পষ্ট সীমা বিদ্যমান। আমাদের সমাজে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একত্রে বসবাস করে এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে সচেষ্ট। তবে, সম্প্রীতির অজুহাতে নিজের ধর্মীয় চেতনা ও আকিদার মৌলিক সীমানা অতিক্রম করা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিনোদন, কৌতূহল বা আনন্দ উপভোগের অংশ হিসেবে অমুসলিমদের পূজামণ্ডপে মুসলমানদের গমন এবং মূর্তিপূজা প্রত্যক্ষ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, এমনকি সেখানে তাদের সঙ্গে নাচানাচি ও রঙ মাখামাখির ঘটনা ঘটছে। বাহ্যিকভাবে এটিকে সাধারণ সামাজিক মেলবন্ধন মনে হলেও, ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। ইসলাম এমন একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যা তার অনুসারীদের ঈমান ও তাওহিদের ওপর দৃঢ় থাকতে শেখায় এবং যেকোনো ধরনের শিরক বা অনৈসলামিক বিশ্বাসের অনুকরণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়।

ইসলাম ধর্মের ভিত্তিটি মহান আল্লাহর একত্ব এবং তার ইবাদতে অন্য কাউকে শরিক না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই তাওহিদের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে রয়েছে ‘শিরক’, যা ইসলামের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় ও ক্ষমাহীন অপরাধ। পবিত্র কোরআনের সুরা আল-বাকারার ২২ নম্বর আয়াতে এবং সুরা আন-নিসার ৪৮ নম্বর আয়াতে শিরকের ভয়াবহতা সম্পর্কে স্পষ্ট সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। পূজামণ্ডপ বা উপাসনালয়গুলো মূলত এমন স্থান, যেখানে মূর্তিকে মহান আল্লাহর সমকক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে উপাসনা করা হয়। একজন মুসলিম যখন কৌতূহলবশত সেখানে গিয়ে হাজির হয়, তখন তার এই শারীরিক উপস্থিতি পরোক্ষভাবে সেই শিরকের কাজের প্রতি এক ধরনের মৌন সমর্থন বা স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা সুরা আল-মায়েদার ২ নম্বর আয়াতে বিশ্ববাসীকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সাহায্য করো না।’ যেখানে প্রকাশ্যভাবে আল্লাহর বিধানের চরম অবাধ্যতা চলছে, সেখানে আনন্দ বা কৌতূহলের অংশীদার হওয়া প্রকারান্তরে সেই গুনাহের আয়োজনে নিজের উপস্থিতি দিয়ে সমর্থন জানানোরই শামিল, যা ঈমানি চেতনার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

ইসলামি সংস্কৃতি ও জীবনবোধের অন্যতম সৌন্দর্য হলো তার নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য। ইসলাম তার অনুসারীদের অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি মানবিক আচরণ ও সামাজিক সদাচরণের নির্দেশ দিলেও, নিজের ধর্মীয় পরিচয়কে গুলিয়ে ফেলতে কঠোরভাবে নিষেধ করে। সুরা আল-আনআমের ৬৮ নম্বর আয়াতে এবং সুরা আন-নিসার ১৪০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় নির্দেশ দিয়েছেন, যেখানে আল্লাহর আয়াত ও নিদর্শনকে অস্বীকার বা উপহাস করা হয়, সেখানে যেন মুমিনরা উপবেশন না করে। এর সপক্ষে রাসুলুল্লাহ (সা.) আবু দাউদ শরিফের এক বিখ্যাত হাদিসে সতর্ক করে বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো জাতির সঙ্গে সাদৃশ্য রাখবে, সে তাদেরই একজন হিসেবে গণ্য হবে। ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ইকতিদাউ সিরাতিল মুস্তাকিম’-এ উল্লেখ করেছেন, অমুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ মুসলমানের ঈমানি স্বকীয়তা ধ্বংসের দরজা খুলে দেয়। ফলে সামাজিক উদারতা দেখানোর অজুহাতে ধর্মীয় উৎসবের চত্বরে শামিল হওয়া ইসলামের মূল চেতনার পরিপন্থী এবং নিজের আকিদাকে এক মহাঝুঁকিতে ফেলার শামিল।

অবশ্য ইসলামি শরিয়ত অত্যন্ত বাস্তবমুখী এবং সমাজ-রাষ্ট্রের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় পূর্ণাঙ্গ পথপ্রদর্শক। তাই সাধারণ বিনোদন বা উৎসব উদ্‌যাপনের বাইরে কিছু ব্যতিক্রমী ও বিশেষ পরিস্থিতিকে ফকিহরা এই নিষেধাজ্ঞা থেকে আলাদা করেছেন। যদি কোনো মুসলিম সরকারি কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হন এবং তার ওপর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা কিংবা সংখ্যালঘুদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাধ্যতামূলক অফিসিয়াল দায়িত্ব অর্পিত হয়, তবে তিনি পূজামণ্ডপে যেতে পারবেন। ফাতাওয়া লাজনা দায়েমাহর দ্বিতীয় খণ্ডের ১১৫ নম্বর পৃষ্ঠায় এই প্রশাসনিক বা সুরক্ষামূলক দায়িত্ব পালনের বৈধতা দেওয়া হয়েছে। তবে এই যাওয়ার উদ্দেশ্য কেবলই অর্পিত পেশাগত দায়িত্ব পালন, কোনোভাবেই উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া বা ধর্মীয় আচারকে উপভোগ করা নয়। এমনকি ঐতিহাসিক নজির থেকে জানা যায়, খলিফা ওমর (রা.) অমুসলিমদের গির্জা বা উপাসনালয় (কানিসা) সুরক্ষার সুযোগ দিলেও মুসলিমদের সেখানে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে সম্পৃক্ত হওয়াকে নিরুৎসাহিত করেছেন।

অন্য ধর্মের উপাসনাকে সমর্থন না করার অর্থ এই নয় যে, তাদের অনুসারীদের অসম্মান করতে হবে; বরং ইসলাম ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও মানবিক মর্যাদার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। সুরা আল-মুমতাহিনার ৮ নম্বর আয়াতে যারা ধর্মের কারণে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে না, কিংবা তাদের ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত করে না, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ নিষেধ করেননি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনেও চুক্তি রক্ষা, প্রতিবেশীর অধিকার এবং মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণের শিক্ষা রয়েছে। অতএব হিন্দু প্রতিবেশীর সঙ্গে সৌজন্য বিনিময়, বিপদে সহযোগিতা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কিংবা নাগরিক দায়িত্ব পালনকে ধর্মীয় উপাসনায় অংশগ্রহণের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। ধর্মীয় বিশ্বাসে পার্থক্য থাকলেও মানবিক দায়িত্বে অবহেলার সুযোগ নেই।

সব ধর্মের মানুষের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সহনশীলতা বজায় রাখা ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। তবে এই সম্প্রীতি প্রদর্শনের অর্থ কোনোভাবেই ধর্মীয় বিধান ও তাওহিদের মূলনীতিকে জলাঞ্জলি দেওয়া নয়। নিজেদের ঈমান, আকিদা ও স্বতন্ত্র ইসলামি সংস্কৃতি বজায় রেখেই আমরা অন্যান্য সম্প্রদায়ের প্রতি উদারতা প্রকাশ করতে পারি। মণ্ডপে গিয়ে উৎসব প্রত্যক্ষ না করেও দূর থেকে পারস্পরিক সম্মান ও ভালোবাসা বজায় রাখা সম্ভব। অতএব সাময়িক বিনোদন বা আনন্দের মোহ ত্যাগ করে আমাদের উচিত শরিয়তের বিধান মেনে চলা এবং তাওহিদের আলোয় নিজেদের জীবনকে পরিচালিত করা।

লেখক: স্নাতক, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, শান্তিনগর, ঢাকা

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

নিত্যজীবনের ১০টি অবহেলিত সুন্নত তুলে ধরা হলো

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

শুক্রবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০৯:১৬ এম


নিত্যজীবনের ১০টি অবহেলিত সুন্নত তুলে ধরা হলো

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শের মধ্যে মানবজাতির জন্য অফুরন্ত কল্যাণ নিহিত রয়েছে। আধুনিক সভ্যতার উজ্জ্বলতা ও পশ্চিমা জীবনধারার প্রভাবে বর্তমানে নবীজি (সা.)-এর অনেক সুন্দর ও কল্যাণময় সুন্নত উপেক্ষিত ও অবহেলিত হয়ে পড়েছে। অনেক সময় আমরা ভুলে যাই যে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এই কাজগুলো আসলে সুন্নত। নিচে এমন ১০টি অবহেলিত সুন্নতের আলোচনা করা হলো—

১. নামাজের আগে মেসওয়াক করা

মেসওয়াকের সুন্নত বর্তমানে টুথব্রাশ ও পেস্টের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে প্রায় বিলুপ্তির পথে। রাসুল (সা.) মেসওয়াকের গুরুত্ব সম্পর্কে কতটা জোর দিয়েছেন, তা একটি হাদিস থেকে বোঝা যায়। তিনি বলেছেন, ‘যদি না আমার উম্মতের কষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকত, তবে আমি তাদের প্রত্যেক নামাজের সময় মেসওয়াক করতে বলতাম।’ (বুখারি: ৮৮৭)। পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

২. শিশুদের আগে সালাম দেওয়া

বড়দের সালাম দেওয়ার সময় আমরা শিশুদের সালাম দিতে ভুলে যাই। আমরা মনে করি, ছোটরাই কেবল বড়দের সালাম দেবে। কিন্তু ছোটদের সালাম দেওয়া নবীজির (সা.) একটি মিষ্টি সুন্নত, যা শিশুদের নম্রতা শেখায়। আনাস (রা.) একবার একটি শিশুর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের সালাম দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) এমনটিই করতেন।’ (বুখারি: ৬২৪৭)

৩. খাওয়ার পর আঙুল চেটে খাওয়া

পাশ্চাত্য ফ্যাশনের প্রভাবে বর্তমানে হাত দিয়ে খাওয়া এবং শেষে আঙুল চেটে খাওয়াকে অনেকেই অস্বস্তিকর মনে করেন। অথচ এর মধ্যে রয়েছে খাবারের বরকত। রাসুলুল্লাহ (সা.) তিন আঙুলে খেতেন এবং খাওয়ার পর আঙুল চেটে খেতেন। (মুসলিম: ২০৩২)

৪. পড়ে যাওয়া খাবার তুলে খাওয়া

প্লেট থেকে খাবার পড়ে গেলে অস্বাস্থ্যকর মনে করে আমরা তা ফেলে দিই। কিন্তু রাসুল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘যদি কারো লোকমা পড়ে যায়, সে যেন তা তুলে নেয় এবং ময়লা দূর করে তা খেয়ে নেয়, আর শয়তানের জন্য কিছু ফেলে না রাখে।’ (মুসলিম: ২০৩৩)। এজন্য পরিচ্ছন্ন স্থানে খেতে বসা উচিত।

৫. হাই তোলার সময় মুখ ঢাকা

হাই তোলা অলসতার লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়। নবীজি (সা.) এই সময় হাতের পিঠ দিয়ে মুখ ঢেকে নিতে বলেছেন। তিনি বলেন, ‘যখন তোমাদের কারো হাই আসে, সে যেন যথাসম্ভব তা প্রতিরোধ করে অথবা মুখে হাত দেয়।’ (মুসলিম : ২৯৯৪)। এছাড়া হাই তোলার সময় বিকট শব্দ এবং আঙুল ফোটানোও অনুচিত।

৬. ডানদিক থেকে জুতা পরা

জুতো পরা বা খোলার সময় আমরা কোনো নিয়ম অনুসরণ করি না। কিন্তু নবীজি (সা.) আমাদের জীবনের ক্ষুদ্রতম কাজের জন্যও সুন্দর শৃঙ্খলা শিখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘জুতা পরার সময় ডান পা দিয়ে শুরু করো এবং খোলার সময় বাম পা আগে খোলো।’ (বুখারি: ৫৮৫৫)

৭. তিন শ্বাসে পানি পান করা

দাঁড়িয়ে এক নিঃশ্বাসে পানি পান করা ব্যস্ত জীবনের সাধারণ চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু রাসুল (সা.) বসে পানি পান করতে বলেছেন এবং তিন শ্বাসে পান করতেন। (বুখারি: ৫৬৩১)। চিকিৎসাবিজ্ঞানও প্রমাণ করেছে যে, এভাবে পানি পান করা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।

৮. ওজুসহ ডান কাত হয়ে ঘুমানো

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ওজু করা এবং ডান কাত হয়ে ঘুমানোর সুন্নতটি সমাজ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন তুমি বিছানায় যাবে, তখন নামাজের মতো ওজু করো, তারপর ডান কাত হয়ে শোও।’ (বুখারি: ২৪৭)। এটি মুমিনকে সারা রাত সওয়াব এনে দেয়।

৯. মুচকি হাসি দিয়ে কথা বলা

কর্মব্যস্ততা ও বিষণ্ণতার কারণে মানুষের মুখ থেকে হাসি যেন উবে গেছে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) সর্বদা হাসিমুখে থাকতেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসাও একটি সদকা।’ (তিরমিজি: ১৯৫৬)। একটি সুন্দর হাসি সমাজের বহু বৈরিতা দূর করে দিতে পারে।

১০. রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা

এটি কেবল দায়িত্ব নয়, বরং ঈমানের অংশ। রাস্তায় পড়ে থাকা কলার খোসা বা কাঁটা সরিয়ে ফেলার প্রবণতা আমাদের মধ্যে নেই। অথচ নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘ঈমানের ৭০টিরও বেশি শাখা রয়েছে... এর মধ্যে সর্বনিম্নটি হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা।’ (মুসলিম: ৫৮)

উপরোক্ত সুন্নতগুলো পালন করতে আমাদের কোনো অতিরিক্ত অর্থ বা শ্রমের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু একটু সদিচ্ছা ও সচেতনতা। যাপিত জীবনে এই সুন্নতগুলো চর্চা করার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর সোনালি ঐতিহ্যগুলো সমাজে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

বাথরুমে অজু-গোসলের দোয়া পড়া যাবে কি?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

শুক্রবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০৯:১৮ এম


বাথরুমে অজু-গোসলের দোয়া পড়া যাবে কি?

প্রশ্ন : বর্তমানে অধিকাংশ বাসাবাড়িতে গোসলখানার ভেতরে টয়লেট থাকে। মাঝে কোনো আড়াল নেই। তবে টয়লেটের ফ্লোরটি গোসলখানার ফ্লোরের তুলনায় কিছুটা উঁচু থাকে। আমাদের বাড়িতেও এই ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে।

জানার বিষয় হলো, এমন গোসলখানায় কি অজু-গোসল করা সম্ভব? যদি সম্ভব হয়, তাহলে সেখানে অজু-গোসলের দোয়া পড়া যাবে কি না?

মাওলানা সালিম বিন আবদুল মালিক, দরলইগাঁও, সিলেট

উত্তর : এ ধরনের গোসলখানায় অজু-গোসল করার ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা নেই। যদি গোসলখানা পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন থাকে এবং টয়লেট থেকে দুর্গন্ধ না আসে, তাহলে সেখানে অজু-গোসলের দোয়া পড়া যাবে। তবে যদি সেখানে ময়লা থাকে অথবা টয়লেট থেকে দুর্গন্ধ আসে, তাহলে শব্দ করে দোয়া পড়া উচিত নয়; বরং নিঃশব্দে দোয়া পড়া উচিত।

এছাড়া, যদি গোসলখানা না হয়ে শুধুমাত্র টয়লেট হয়, তাহলে সেখানে অজু করার সময় মুখে উচ্চারণ না করে মনে মনে দোয়া পড়া উচিত।

[কিতাবুল আছার, ইমাম মুহাম্মাদ, বর্ণনা ২৭৮; মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, বর্ণনা ১২৩২; মিরকাতুল মাফাতীহ, ২/৫০; রদ্দুল মুহতার, ২/১৯৪]

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

আর্কাইভ

Please select a date!

নামাজের সময়সূচী

তারিখঃ ১৪ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিঃ
ফজর ০৪:৪৪
জোহর ১১:৪৪
আসর ০৩:৪৮
মাগরিব ০৫:২৪
ইশা ০৬:৩৬
সূর্যোদয় : ০৬:০০ সূর্যাস্ত : ০৫:২৪
অনলাইন জরিপ
ফলাফল
থার্টি-ফার্স্ট নাইটে তরুণদের জন্য প্রকাশ্যে পানি-টানি খাওয়ার বিরুদ্ধে আহ্বান। আপনার মন্তব্য দিন
হ্যা
100%
না
0%
মন্তব্য নেই
0%