০৪:১৮ পি.এম
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি, ইরান যুদ্ধ এবং শুল্কনীতির প্রভাব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ে পড়ছে। মার্কিন পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে জ্বালানি, গাড়ির ইঞ্জিন অয়েল, পরিবহন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি খরচ নিয়ে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে, এই অর্থনৈতিক চাপ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। আল মায়াদিনে প্রকাশিত বিশ্লেষণে করিম শারারার মতে, বিদেশে নেওয়া নীতিগত সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক মাশুল কিভাবে সাধারণ নাগরিকদের বহন করতে হচ্ছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মার্কিন ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের বিষয় ছিল অর্থনীতি এবং স্বাস্থ্যসেবা। পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে ছিল। তবে ইরান যুদ্ধ এবং ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে নিষেধাজ্ঞা ও ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ায় অর্থনৈতিক উদ্বেগের গুরুত্ব বেড়ে গেছে।
বিশ্লেষণটি উল্লেখ করেছে, যুদ্ধের প্রভাব শুধুমাত্র সামরিক ব্যয় বা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং এর ফলে ভোক্তাপণ্যের দামে প্রভাব পড়ে। ফলে, পররাষ্ট্রনীতিকে অনেক সময় অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি থেকে আলাদা করে দেখা হলেও বাস্তবে এ দুইয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান।
আরও পড়ুন: হন্ডুরাসে চীনা ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজরদারি শুরু
গাড়ির ইঞ্জিন অয়েলের বাজারের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরান যুদ্ধের সময় কাতারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য উৎপাদকদের সরবরাহব্যবস্থাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এতে সিনথেটিক লুব্রিকেন্ট তৈরিতে ব্যবহৃত বেস অয়েলের বাজারে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংকটের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ে পড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, লুব্রিকেন্টের দাম বৃদ্ধির কারণে গাড়ির তেল পরিবর্তনের খরচও বেড়েছে। গাড়ি সচল রাখা অনেক মার্কিন পরিবারের জন্য বিলাসিতা নয়, বরং কর্মস্থলে যাতায়াত এবং জীবিকা নির্বাহের অপরিহার্য অংশ। তাই গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হলে অনেক পরিবারকে অন্য খাতে খরচ কমাতে হচ্ছে।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধিও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে এএএ-র তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম প্রায় ৪৫ শতাংশ এবং ডিজেলের দাম ৬৮ শতাংশ বেড়েছে। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি শুধু ডিজেলচালিত গাড়ির মালিকদেরই প্রভাবিত করে না, বরং পণ্য পরিবহনে ডিজেল ব্যবহৃত হওয়ায় এর বাড়তি খরচ খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহ ও দামের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
কৃষি খাতেও জ্বালানি এবং কাঁচামালের সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। ইউরিয়া এবং অন্যান্য নাইট্রোজেন সার উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাস প্রয়োজন হয়। আবার ফসফেট সার উৎপাদনেও বিভিন্ন শিল্প উপকরণের ভূমিকা রয়েছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি এবং কাঁচামালের সরবরাহ ব্যাহত হলে কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বাড়তে পারে। সেই চাপ শস্য উৎপাদন, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ এবং পরিবহনের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে ভোক্তাদের ওপর এসে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রে ধস নামানো চীনা প্রতিষ্ঠান ডিপসিককে নিষিদ্ধ করলো
রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাও জ্বালানি বাজারের সমীকরণ বদলে দিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপ রাশিয়ার জ্বালানির বিকল্প উৎস খুঁজেছে, অন্যদিকে রাশিয়াকে নতুন বাজারের দিকে ঝুঁকতে হয়েছে। তবে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের রুশ ডিজেল সংক্রান্ত লেনদেনে সাময়িক অনুমোদনের খবর থেকে বোঝা যায়, বাজারের বাস্তবতা কখনো কখনো নিষেধাজ্ঞার নীতিকে পুনর্বিবেচনার মুখে ফেলে। অর্থনৈতিক চাপের পেছনে কতটা ভূমিকা রেখেছে, তা মূল্যায়নে সংশ্লিষ্ট সরকারি ব্যাখ্যা এবং নীতিগত প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতিও মূল্যবৃদ্ধির বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভের গবেষণা উদ্ধৃত করে বিশ্লেষণটিতে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ সালের শুল্কনীতি আমদানি করা অ-জ্বালানি ভোক্তাপণ্যের মূল্যস্ফীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। শুল্কের কারণে আমদানি ব্যয় বাড়লে তার একটি অংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বহন করতে পারে, আবার কিছু অংশ বেশি দামের মাধ্যমে ভোক্তাদের ওপরও পড়তে পারে। মূল্যবৃদ্ধির গতি কমে গেলেও আগে বেড়ে যাওয়া দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে আগের অবস্থায় ফিরে আসে না।
মার্কিন জনমত জরিপেও যুদ্ধ এবং শুল্কনীতির অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের প্রতিফলন দেখা গেছে। শিকাগো কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের ২০২৬ সালের জরিপে ৮৬ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক উত্তরদাতা বলেছেন, ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। রিপাবলিকানদের মধ্যেও ৭৬ শতাংশ এমন মত দিয়েছেন। একই জরিপে ৮১ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, শুল্কনীতি জীবনযাত্রার ব্যয়ের জন্য ক্ষতিকর; রিপাবলিকানদের মধ্যে এ মত দিয়েছেন ৬২ শতাংশ।
তবে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব স্বীকার করা এবং যুদ্ধের সিদ্ধান্তকে ভুল মনে করা এক বিষয় নয়। শিকাগো কাউন্সিলের জরিপে রিপাবলিকান সমর্থকদের একটি বড় অংশ যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা বললেও যুদ্ধের পক্ষে অবস্থানও দেখা গেছে। এর অর্থ, ভোটারদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ব্যয়ের হিসাব দিয়ে নির্ধারিত হয় না। দলীয় আনুগত্য, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ধারণা এবং সরকারের নীতির প্রতি বিশ্বাসও তাদের অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে।
আরও পড়ুন: ক্রেমলিন: ইউরোপ বিশৃঙ্খলার দ্বারপ্রান্তে
দাম বৃদ্ধির জন্য ট্রাম্পের নীতিকে দায়ী করার ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক বিভাজন রয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-নরক সেন্টারের জরিপে ৬৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক বলেছেন, স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি দামের পেছনে ট্রাম্পের নীতির ভূমিকা রয়েছে। অন্যদিকে ৬৭ শতাংশ রিপাবলিকান মনে করেন, উচ্চমূল্যের জন্য প্রেসিডেন্টের নিয়ন্ত্রণের বাইরের কারণ দায়ী। অর্থাৎ মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে অসন্তোষ থাকলেও তার দায় কার ওপর বর্তাবে, সে বিষয়ে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য স্পষ্ট।
এই পরিস্থিতিতে ডেমোক্র্যাটরা মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারে জীবনযাত্রার ব্যয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কংগ্রেসীয় আসনগুলোতে ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রচারিত ৬৫টি বিজ্ঞাপনের মধ্যে ৬১টিতে গৃহস্থালি ব্যয়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত এসব বিজ্ঞাপন ৪৩ হাজারের বেশি বার প্রচারিত হয়; এতে আনুমানিক ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছে। বিজ্ঞাপনগুলোতে যুদ্ধের সঙ্গে জ্বালানি এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।
তবে অর্থনৈতিক অসন্তোষ থেকে ডেমোক্র্যাটদের প্রতি স্বয়ংক্রিয় সমর্থন তৈরি হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে কোন দলকে বেশি বিশ্বাস করা যায়, সে প্রশ্নে ভোটারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিরোধী দল হিসেবে ডেমোক্র্যাটদের সামনে সরকারের নীতির সমালোচনা করার সুযোগ থাকলেও, বিকল্প অর্থনৈতিক এবং পররাষ্ট্রনীতি কতটা কার্যকর হবে, তা প্রমাণ করাও তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
বিশ্লেষণটির মূল বক্তব্য হলো, পররাষ্ট্রনীতি ভোটারদের প্রধান নির্বাচনী উদ্বেগ না হলেও তার অর্থনৈতিক পরিণতি নির্বাচনের আলোচনায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষককে সার উৎপাদনের জটিল প্রক্রিয়া বুঝতে না হলেও সারের দাম বাড়ার প্রভাব তিনি অনুভব করেন। একইভাবে, একজন গাড়িচালক আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের সব হিসাব না জানলেও গাড়ির তেল এবং রক্ষণাবেক্ষণের বাড়তি খরচ টের পান।
আরও পড়ুন: লিবিয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশিক্ষণকেন্দ্রে বিস্ফোরণে নিহত ৮
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে একটি প্রশ্ন—যুদ্ধ এবং শুল্কনীতির কারণে বেড়ে যাওয়া ব্যয়ের দায় ভোটাররা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিকে দায়ী করে তাঁরা ক্ষমতাসীন দলের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করবেন, নাকি নিরাপত্তা এবং অন্যান্য রাজনৈতিক বিবেচনায় রিপাবলিকানদের সমর্থন অব্যাহত রাখবেন, তা ভোটের ফলেই স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদেরও দেখাতে হবে, সমালোচনার বাইরে গিয়ে তাঁরা জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং পররাষ্ট্রনীতির অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় কী বিকল্প দিতে পারেন। তথ্যসূত্র: আল মায়াদিন, এপি
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন