বুধবার, ২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ইং
০৪:১৬ পি.এম
হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট সংকটের প্রেক্ষাপটে, যখন বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ গুরুতর হুমকির সম্মুখীন, বাগদাদ দ্রুত গতিতে ভূমধ্যসাগরের দিকে তেল পরিবহনের পুরনো পাইপলাইনগুলো পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করছে। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প পথ তৈরির এই পরিকল্পনা ইরাক ও পশ্চিমা বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় হলেও, সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন এই মহাপরিকল্পনাকে বড় বাধায় রূপান্তরিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন হোয়াইট হাউসে ইরাকের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদিকে স্বাগত জানান, তখন তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন যে দুই দেশের মধ্যে বিপুলসংখ্যক চুক্তি সম্পাদিত হতে যাচ্ছে। পরবর্তী কয়েক দিনে শক্তি, প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য খাত মিলিয়ে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের নানা সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইরাকের তেল শিল্প। বৈঠকের মূল আকর্ষণ ছিল ৭৪ বছরের পুরনো ও ৮৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি পাইপলাইন পুনরুজ্জীবিত করার উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা। এই প্রসঙ্গে তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম বারাক মন্তব্য করেন যে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে হরমুজ প্রণালী বিশ্ব রাজনীতির একটি গৌণ বিষয় বা ‘অফটারথট’-এ পরিণত হবে।
আমেরিকান সামরিক বাহিনীর দীর্ঘ ২০ বছরের উপস্থিতির পর ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইরাক থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার সম্পন্ন হবে। সৈন্য প্রত্যাহারের এই চূড়ান্ত মুহূর্তে আমেরিকার বড় বড় তেল কোম্পানিগুলো তাদের জায়গা স্থলাভিষিক্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও প্রধানমন্ত্রী আল-জাইদির বৈঠকের পর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, হরমুজ প্রণালির বিকল্প পথ তৈরি এবং ইরাকের তেল খাত পুনরুদ্ধারে ইরাক ও সিরিয়ার যৌথ উদ্যোগ ‘কিরকুক-বানিয়াস’ তেল পাইপলাইন পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনায় ওয়াশিংটন পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে।
হোয়াইট হাউস বৈঠকের পরপরই ইউএস চেম্বার অফ কমার্সে আয়োজিত আমেরিকান-ইরাকি বিজনেস সামিটে পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বহু চুক্তি সম্পাদিত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কিরকুক-বানিয়াস পাইপলাইন সংস্কারের কাজ মার্কিন তেল কোম্পানি শেভরনের নেতৃত্বে সম্পন্ন করা। এখানে একটি যৌথ বিনিয়োগকারী কনসোর্টিয়াম প্রকল্পের সম্ভাব্যতা ও অর্থায়নের পরিকল্পনা তৈরি করছে, অন্যদিকে ইরাক-সিরিয়া যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ একটি আন্তঃসরকার পরিচালন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে।
১৯৫২ সালে নির্মিত এই পাইপলাইন দিয়ে সিরিয়ার বানিয়াস বন্দরে দৈনিক প্রায় ৩ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হতো। ১৯৮২ সালে ইরাক ও সিরিয়ার ক্ষমতাসীন বাথ পার্টির রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে এটি বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০০০ সালে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য এটি চালু হলেও ২০০৩ সালে মার্কিন আগ্রাসনের সময় বিমান হামলায় পাইপলাইনটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং গত দুই দশক ধরে অকার্যকর হয়ে পড়ে।
যদিও হরমুজ প্রণালি স্থায়ীভাবে এড়িয়ে যাওয়ার ধারণাটি অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত লোভনীয়, তথাপি সিরিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা এতে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় সুওয়েদা প্রদেশে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী ও সশস্ত্র দ্রুজ গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সাম্প্রতিক সহিংসতা নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। জাতিসংঘের উপ-বিশেষ দূত ক্ল Claudio Cordone এর আগে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে নিশ্চিত করেছিলেন যে, দ্রুজ সম্প্রদায়কে মূলধারায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে গৃহীত আন্তর্জাতিক রোডম্যাপ বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি।
ইতিহাসে কিরকুক-বানিয়াস পাইপলাইন চালু করার আরও একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যা আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে ব্যর্থ হয়। ২০০৯ সালে তৎকালীন ইরাকি প্রধানমন্ত্রী নুরি আল-মালেকি রুশ কোম্পানিগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে পাইপলাইনটি মেরামতের চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে ২০১১ সালে সিরিয়ার তেল মন্ত্রণালয় ইরাকের সাথে নতুন তিনটি পাইপলাইন তৈরির ঘোষণা দিলেও তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
প্রকল্পটির বর্তমান সফলতার ওপর বড় প্রভাব ফেলবে বাগদাদ ও কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের (কেআরজি) পারস্পরিক সম্পর্ক। ব্লু ওয়াটার স্ট্র্যাটেজির জ্বালানি বিশ্লেষক সিরিল উইডারশোভেন মনে করেন, ইরাক সরকারের নীতি নির্ধারণে তেল মন্ত্রণালয় এখন কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে এবং বাগদাদ বেশ ভালোভাবেই বোঝে যে রাজনৈতিক বিভাজন সরাসরি রাজস্ব ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক জন ক্যালাব্রেস জানান, বাস্তব চিত্রে এখনও দুই পক্ষের বিরোধ পরিষ্কার। গত মার্চ মাসে বাগদাদ পেট্রোডলার স্থানান্তরে নিষেধাজ্ঞা দিলে ইরবিল কিরকুক-জেহান পাইপলাইনে তেল সরবরাহ স্থগিত করে নিজেদের দাবি আদায় করেছিল। এই অভিজ্ঞতা নির্দেশ করে যে, জাতীয় সংকটের মধ্যেও কুর্দি অঞ্চল নিজেদের রাজনৈতিক দর কষাকষি বজায় রাখে, ফলে বড় ধরনের কোনো সমঝোতা সহজে সম্ভব নয়।
এসব জটিলতা সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি দূর করতে একটি পূর্ণাঙ্গ পাইপলাইন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বাগদাদ। এর অংশ হিসেবে তুরস্কের ভূখণ্ড দিয়ে পাইপলাইনে তেল রপ্তানি চলছে। ১৯৭৬ সালে তৈরি ৯৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ কিরকুক-জেহান পাইপলাইনের বার্ষিক ক্ষমতা ছিল প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল। তবে নানা যুদ্ধ ও বিবাদের কারণে বিভিন্ন সময়ে তা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৩ সালে সালিসি বিরোধের কারণে দুই বছর বন্ধ থাকার পর গত ১ আগস্ট আঙ্কারা ও বাগদাদ ১ বছরের চুক্তি নবায়ন করে এবং নতুন দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির জন্য কাজ শুরু করেছে। বর্তমানে এই পাইপলাইনটি তার ক্ষমতার ৫০ শতাংশ ব্যবহার করে কাজ করছে এবং এটিকে দক্ষিণ ইরাকের তেলক্ষেত্র পর্যন্ত সম্প্রসারণের আলোচনা চলছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে ইরান যুদ্ধ শুরুর আগেই ইরাক তার তেল খাতের আধুনিকায়ন নিশ্চিত করছিল। টোটালএনার্জিসের ২৭ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি, বিপি'র চারটির উত্তরীয় তেলক্ষেত্র সংস্কার এবং চীনের সহায়তায় আল-ফাও শোধনাগার নির্মাণের মতো বহু প্রকল্প চলমান ছিল। তবে বর্তমান যুদ্ধে এই কাজগুলো বিলম্বিত হলেও দীর্ঘমেয়াদে হরমুজ সংকট এড়াতে এই পাইপলাইন কৌশলগত ঢাল হিসেবে কাজ করবে বলে বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সিরিয়ার মধ্য দিয়ে এই পুনর্নির্মাণ সম্পন্ন হতে প্রায় চার বছর সময় এবং আনুমানিক ১৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। এটি বর্তমান সংকট তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান না করলেও আগামী ২৫ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত জরুরি।
কিরকুক-বানিয়াস ছাড়াও অন্য পাইপলাইনগুলোর ওপরও মনোযোগ দিচ্ছে ইরাক। ইরাকের দক্ষিণ তেলক্ষেত্র থেকে জর্ডানের আকাবা বন্দর পর্যন্ত ১৮শ' কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ একটি পাইপলাইন নির্মাণের কাজ প্রথম ধাপে (বাসরা-হাদিসা অংশ) শুরু হয়েছে, যার দৈনিক ক্ষমতা হবে ২৫ লাখ ব্যারেল। এছাড়া সিরিয়া হয়ে লেবাননের ত্রিপোলি বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত ৯২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ কিরকুক-ত্রিপোলি পাইপলাইন এবং ১৯৪৮ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক কিরকুক-হাইফা পাইপলাইনের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই এসব বৃহৎ জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নে হাঁটছে বাগদাদ।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে সরকার সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে : মাহদী আমিন
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের পছন্দের ক্যারিয়ার, সামাজিক মূল্যবোধ ও মেধা বিকাশে সরকার সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে। তিনি উল্লেখ করেন, জীবনযাত্রার একমাত্র সাফল্য হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক সনদ অর্জনকে বিবেচনা করা উচিত নয়; সৎ, যোগ্য ও দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে উঠতে এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ এবং সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা আবশ্যক।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে মাহদী আমিন এসব কথা বলেন একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। বাংলাদেশ স্কাউটসের স্পেশাল ইভেন্টস বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ২০২৫ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ৫৮০ জন মেধাবী স্কাউট ও রোভার স্কাউটকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। দেশের ১৩টি অঞ্চল থেকে আসা এসব মেধাবী স্কাউটদের হাতে অভিনন্দনপত্র, মেডেল ও প্রাইজমানি তুলে দেওয়া হয়।
মাহদী আমিন বলেন, ‘সবাইকে কেবল ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে—বিষয়টি মোটেও তেমন নয়।
যার যে বিষয়ে পড়তে ভালো লাগে, সরকারের পক্ষ থেকে সেই সুযোগ ও সহায়তা প্রদান করা হবে। যদি কেউ খেলাধুলা, ড্রয়িং, বিতর্ক বা মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানে ক্যারিয়ার গড়তে চায়, তবে তার পছন্দের পথে মেধার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটাতে সরকার সুযোগ-সুবিধা দেবে।’
নিজের ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণ করে উপদেষ্টা জানান, ‘প্রায় আড়াই দশক আগে তিনিও পাবলিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের স্বীকৃতি হিসেবে মঞ্চে উপস্থিত শিক্ষামন্ত্রীর হাত থেকে একাধিকবার পুরস্কার গ্রহণ করেছিলেন। সংবর্ধিত তরুণদের দেশের আগামী দিনের নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সততা, পরিশ্রম, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমকে জীবনের ভিত্তি বানিয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করতে হবে।
গতানুগতিক পুঁথিগত শিক্ষার বাইরে বাস্তবমুখী শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে মাহদী আমিন জানান, সরকার এমন এক তরুণ প্রজন্ম গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর, যাদের মধ্যে মানবিক গুণাবলী, দৃঢ় পারিবারিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার চমৎকার মেলবন্ধন থাকবে।
প্রধান জাতীয় কমিশনার এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, বাংলাদেশ স্কাউটসের সভাপতি ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়া প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ স্কাউটসের ১৩টি অঞ্চল থেকে ৫৮০ জন মেধাবী স্কাউট ও রোভার স্কাউট অংশ নেন এবং অভিনন্দন পত্র ও মেডেল গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে তাদের নির্ধারিত প্রাইজমানি প্রদান করা হয়।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পথে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি উল্লেখ করেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করে, তবে সরকারকে ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব আহরণে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে, নাহলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হবে।’
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীতে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারে জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এবং এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হকসহ অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকরা উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনারে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা, রাজস্ব সক্ষমতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
ড. তিতুমীর বলেন, দেশের অর্থনীতি এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা, জ্বালানি সংকট এবং সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি রয়েছে।
তিনি বলেন, এসব সংকট মোকাবেলায় বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, বরং সমন্বিত নীতি কাঠামো প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, ‘অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হলে মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি এবং শিল্পনীতিকে একই লক্ষ্য সামনে রেখে পরিচালিত হতে হবে।’
ড. তিতুমীর উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিনের দুর্বল শাসনব্যবস্থা, অনিয়ম ও নীতিগত ত্রুটির কারণে অর্থনীতিতে কাঠামোগত চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব এখনো মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তার মাধ্যমে দৃশ্যমান।
তবে ধারাবাহিক সংস্কার ও সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে অর্থনীতিকে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
রাজস্ব আহরণের প্রসঙ্গে ড. তিতুমীর বলেন, রাজস্ব বাড়াতে হবে শুধু করহার বাড়িয়ে নয়, বরং উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে। তিনি বলেন, একই সঙ্গে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিনিয়োগের সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। তিনি রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ডিজিটালাইজেশন, করজাল সম্প্রসারণ এবং কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জ্বালানি খাতের বিষয়ে তিনি বলেন, বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য।
এজন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরশক্তর ব্যবহার সম্প্রসারণ, স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুদ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তা ছাড়া শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।’
ড. তিতুমীর বলেন, অর্থনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। তিনি বলেন, শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়লেই হবে না; উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার শিল্প পুনরুজ্জীবন, উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছে।
সেমিনারে অংশগ্রহণকারী অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে নীতিগত ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। তারা বলেন, একই সঙ্গে রাজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত গতি অর্জন কঠিন হবে।
তারা মনে করেন, মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির কার্যকর সমন্বয়, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করতে পারলেই দেশের অর্থনীতি নতুন গতিপথে এগিয়ে যাবে।
’
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
মালয়েশিয়া বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়ে যা জানালো
মালয়েশিয়া আগামী ছয় মাসের মধ্যে প্রায় ২ লাখ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করছে—এমন মন্তব্য বাংলাদেশের এক উপমন্ত্রীর পক্ষ থেকে করা হয়েছে। তবে, মালয়েশিয়া সরকারের সরকারি মুখপাত্র দাতুক সেরি ফাহমি ফাদজিল জানিয়েছেন, এটি সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়। তিনি উল্লেখ করেন, ‘মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী দাতুক সেরি আর রামানান তাকে জানিয়েছেন, এই বক্তব্য একজন জুনিয়র মন্ত্রী দিয়েছেন।
সুতরাং, এটি বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘এটি বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের প্রতিনিধিত্ব করে না। মানবসম্পদমন্ত্রী আমাকে এটাই জানিয়েছেন। তাই এটি কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়।
’এর আগে মঙ্গলবার, বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছিলেন, মালয়েশিয়া আগামী ছয় মাসে প্রায় ২ লাখ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করছে। কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে এসব কর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। চলতি সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ধাপে ধাপে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়ে পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে তা সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর আগে গত জুন মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিমকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দেশটির শ্রমবাজার পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
মালয়েশিয়া ২০২৪ সালে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল শ্রমিকদের শোষণ, ঋণের দায়ে জিম্মি করে রাখা, জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করা এবং প্রতিশ্রুত চাকরি ছাড়াই কর্মীদের মালয়েশিয়ায় পাঠানোর মতো অভিযোগের কারণে।
দেশটির সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ স্ট্রেইটস টাইমস
জানাচ্ছে, মালয়েশিয়া বিদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ গ্রহণের সময় নতুন করে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের এই দাবি সামনে এসেছে। এদিকে, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটির মোট শ্রমশক্তিতে বিদেশি কর্মীর হার প্রায় ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা। বিভিন্ন ধরনের সুবিধা প্রদান করার পরও খেলাপি ঋণের এই বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গত জুন মাসের শেষে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আবারও ৬ লাখ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করেছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে প্রথমবারের মতো ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৬ শেষে ব্যাংক খাতের শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এটি ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
এর আগে মার্চ ২০২৬ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।
তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ ছিল শ্রেণিকৃত ঋণ। মার্চ থেকে জুন—এই তিন মাসের মধ্যে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। একই সময়ে খেলাপি ঋণের হারও বেড়েছে শূন্য দশমিক ৫২ শতাংশীয় পয়েন্ট।
এদিকে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৪৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা হয়েছে।
বছরের শুরুতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। ছয় মাসের ব্যবধানে তা বেড়ে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠনসহ বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করা হলেও এর ফলাফল কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দেখা যাচ্ছে না। বরং ঋণ আদায়ে দুর্বলতা এবং নতুন করে ঋণ খেলাপি হওয়ার কারণে সামগ্রিক খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জুন মাস শেষে মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি হওয়ায় ব্যাংক খাতের ঋণের মান নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যদি খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে, তাহলে ব্যাংকের আয়, মূলধন এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ