০৭:৫৯ এম
বরিশাল নগরীর ঐতিহ্যবাহী পোর্টরোড ও স্টিমারঘাট এলাকায় হোটেলকেন্দ্রিক অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং মাদকের কারবার ফের বেপরোয়া হয়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। এসব অপরাধচক্রের নেপথ্যে ‘হোটেল স্বাগতম’-এর মালিক শিপন এবং ‘হোটেল চিল’-এর মালিক আলামিনের নাম উঠে এসেছে। শিপনের বিরুদ্ধে একাধিক মানবপাচার মামলা চলমান রয়েছে—যার একটিতে হাইকোর্ট থেকে জামিন পেলেও সম্প্রতি মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের দায়ের করা অপর মামলায় তিনি ৬ নম্বর এজাহারভুক্ত আসামি। গুরুতর মানবপাচার মামলার আসামি হওয়ার পরও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বহাল তবিয়তে অপরাধ ও ব্যবসা পরিচালনা করছেন তারা। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিংবা ডিবির সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্মকর্তাকে অনৈতিকভাবে 'ম্যানেজ' করার মাধ্যমে শিপনের এমন উন্মুক্ত অপতৎপরতায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
অভিযানের পরও ‘স্বাগতম’-এ বেপরোয়া অনৈতিক কর্মকাণ্ড
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগে ‘হোটেল স্বাগতম’-এ অভিযান চালায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। সে সময় কয়েকজন নারীসহ হোটেল মালিক শিপনকে আটক করা হয় এবং মানবপাচার দমন আইনে মামলা দিয়ে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। প্রায় মাসাধিককাল কারাভোগের পর হাইকোর্ট থেকে জামিনে মুক্ত হয়েই শিপন পুনরায় স্টিমারঘাট এলাকায় একই স্টাইলে নারী দিয়ে অসামাজিক কার্যকলাপ ও মাদকের কারবার শুরু করেন।
সম্প্রতি মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ আবারও ‘হোটেল স্বাগতম’-এ ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে। ওই অভিযানে কয়েকজন নারীকে আটক এবং বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করা হলেও, আগাম খবর পেয়ে চতুর শিপন সটকে পড়তে সক্ষম হন। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে নতুন করে মানবপাচার আইনে মামলা করা হয় এবং তাকে ৬ নম্বর আসামি করা হয়। নতুন মামলায় আসামি হওয়ার পরও তিনি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং আগের মতোই 'হোটেল স্বাগতম' পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। জোড়া মামলার আসামি হয়েও তিনি কীভাবে প্রকাশ্যে বিচরণ করছেন, তা নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
অসাধু পুলিশ সদস্যদের ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগ
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, শিপন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় অসাধু সদস্যকে নিয়মিত আর্থিক সুবিধা দিয়ে অলিখিত ছত্রছায়ায় নিজের অপরাধ সাম্রাজ্য টিকিয়ে রেখেছেন। সাধারণ মানুষ এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে উল্টো পুলিশি হয়রানির ভয় দেখানো হয়। ফলে চরম ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
অভিযোগের বিষয়ে মুঠোফোনে শিপনের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে প্রতিবেদককে বলেন, "মামা, আমার ক্ষতি কইরেন না। আপনার কী লাগবে বলেন, আমি সরাসরি দেখা করতেছি।" তবে সচেতন মহলের মতে, তার এই বক্তব্য মূলত অপরাধ ঢাকার চতুর চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।
‘হোটেল চিল’-এর আলামিনও অপকর্মে সক্রিয়
একইভাবে পোর্টরোড এলাকার ‘হোটেল চিল’-কে কেন্দ্র করেও গড়ে উঠেছে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মাদকের আখড়া। স্থানীয়দের দাবি, একাধিকবার পুলিশি অভিযানের পরও হোটেলটির মালিক আলামিন নির্বিঘ্নে একই অনৈতিক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে আলামিন সব অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং ‘প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করেই’ ব্যবসা পরিচালনা করার দাবি জানান।
ডিবি পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ ও সুশীল সমাজের দাবি
মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও অপরাধীদের গ্রেপ্তার না করায় বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। এ বিষয়ে বিএমপির এক ঊর্ধ্বতন উপ-পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং অভিযোগের সত্যতা মিললে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে পোর্টরোডের সাধারণ ব্যবসায়ীরা দাবি তুলেছেন, মানবপাচার ও মাদকের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িতরা একাধিকবার গ্রেপ্তার ও মামলার আসামি হওয়ার পরও কীভাবে অবাধে দেহ ও মাদকের কারবার চালিয়ে যাচ্ছে, তা দ্রুত তদন্ত করে দেখা উচিত। একই সঙ্গে অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া বা অনৈতিক লেনদেনে যুক্ত থাকা ডিবি পুলিশের কোনো সদস্যের প্রমাণ পাওয়া গেলে, তাদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। স্টিমারঘাট ও পোর্টরোড এলাকা থেকে এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড চিরতরে বন্ধ করে এলাকার পরিবেশ সুন্দর ও নিরাপদ করতে বিএমপি কমিশনারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন