ঢাকা রবিবার, ০১ই নভেম্বর, ২০২৬খ্রিষ্টাব্দ ১৬ই কার্তিক, ১৪৩২বঙ্গাব্দ ২০ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিজরী
রবিবার, ০১ই নভেম্বর, ২০২৬ইং ১৬ই কার্তিক, ১৪৩২বাং

ধর্ম ও বিশ্বাস: বিতর্কিত মন্তব্যের প্রেক্ষিতে আলোচনা


ধর্ম ও বিশ্বাস: বিতর্কিত মন্তব্যের প্রেক্ষিতে আলোচনা

এক ছাত্রের পাঠানো একটি বয়ান শুনে কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের (১৮৬৩-১৯১৩) বিখ্যাত কবিতা ‘নতুন কিছু করো’র কিছু পঙ্‌ক্তি মনে পড়ে গেল।

নতুন কিছু করো,

একটা নতুন কিছু করো।

আরও পড়ুন: অটিজম থেকে স্বাভাবিক জীবনের পথে রাহির বিশেষ শিক্ষা পরিকল্পনা

নাকগুলো সব কাটো,

কানগুলো সব ছাঁটো;

পাগুলো সব উঁচু করে,

মাথা দিয়ে হাঁটো;

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিকের দুর্দশা ও রাষ্ট্রের দায় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ

হামাগুড়ি দাও, লাফাও,

ডিগবাজি খাও, ওড়ো;

কিংবা চিৎপাত হয়েÑ

পাগুলো সব ছোঁড়ো;

আরও পড়ুন: অদৃশ্য ক্ষত ও আমাদের বিবেকের দায়: কিশোর অপরাধ

ঘোড়াগাড়ি ছেড়ে এখন

বাইসিকেলে চড়ো।

কিংবা সবাই ওঠো, টাউন হলে জোটো;

ধর্ম প্রচার করতে আমেরিকায় ছোটো;

আরও পড়ুন: ফ্রান্সসহ ইউরোপে বিক্ষোভের জন্য মুসলিম তরুণদের দায়ী করা হচ্ছে

আমরা যেন নেহাতই খাটো

হয়ে না যাই দেখো,

খুব খানিক চেঁচাও কিংবা খুব খানিক লেখো;
ছাড়ো, আবার ভাগবত পড়ো।

Ñনতুন কিছু করো, একটা নতুন কিছু করো।

আরও পড়ুন: রাষ্ট্র সংস্কারে চিন্তা ও মূল্যবোধের পুনর্গঠন জরুরি

কলিকালে কত কিছুই নতুন দেখতে ও শুনতে পাচ্ছি। এই বয়ানেও তেমনই অদ্ভুত কিছু পেলাম। অন্যান্য সঠিক, সাহসী ও অপ্রিয় বক্তব্যের মধ্যে তিনি বলেন ভয়ংকর এক ভ্রান্ত কথা—‘ধর্মে বিশ্বাস বলে কিছু নেই!’

প্রেরিত বয়ানটি শ্রদ্ধেয় অগ্রজপ্রতিম মার্কসীয় চিন্তাধারার বুদ্ধিজীবী বলেই প্রতীয়মান এমন একজনের একটি চিত্রায়িত উপস্থাপন (ইউটিউব) পাঠান, যিনি সম্প্রতি একজন আধুনিক বাউল ধর্মগুরু বলেও আবির্ভূত। সাধারণত এ ধরনের চিত্রায়িত উপস্থাপন (ইউটিউব) দেখার বা শোনার অভ্যাস নেই। একজন আধা বাঙালি আধা জার্মান বালকের কিছুদিন আগে আবিষ্কৃত ‘ইউটিউব’ নামের এই ভয়ংকর অদ্ভুত জন্তু বা যন্ত্রের মাধ্যমে জ্ঞানরাজ্যে যে অভাবিত নৈরাজ্যের অরাজকতার দুয়ার অবারিত হয়েছে, তার পৃষ্ঠপোষকতায় অনাগ্রহেই এমন। কিন্তু মাঝে মাঝে ব্যতিক্রম ঘটে, আর এই বিশেষ ক্ষেত্রেও প্রেরিত চিত্রায়িত উপস্থাপনাটি (ইউটিউব) মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। বক্তার মার্কসীয় দর্শন, সামাজিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা আর সমাজে ধর্মের অনস্বীকার্য গুরুত্ব সম্পর্কে তার উপলব্ধির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকেই উপস্থাপনাটি মনোযোগ দিয়ে শুনলাম, যদিও আমি নিজে মার্কসবাদী নই, ধর্মান্ধতারও ভক্ত নই। আর বয়ানটি চিন্তাশীল স্নেহাস্পদ ছাত্রটি পাঠিয়েছিল বলেও আরো মনোযোগ দিয়ে দেখলাম বা শুনলাম।

বিবিধ গুরুত্বপূর্ণ কথা তিনি বলেছেন, যথার্থ সাহসিকতার সঙ্গে। তার জন্য সাধুবাদ। কিন্তু মার্কসীয় দর্শন ধর্মীয় বলে চালানো যে কূপমণ্ডূকতা বিনাশে আগ্রহী, তার বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে একপর্যায়ে ধর্ম নিয়ে ওই যে এমন একটি অদ্ভুত নতুন কথাও বলে ফেলেন, যার যথাসাময়িক সংশোধনী দরকার মনে করেই কলম ধরলাম।

দুদিন হলো মার্কসীয় দর্শনের এশীয় প্রেক্ষিতে প্রয়োগের প্রচেষ্টার মহানায়ক মাও সে তুংয়ের চীন থেকে এসেছি—চীনের সে মাও সে তুংও ধর্মসংক্রান্ত এই নতুন অদ্ভুত কথাটিতে হয়তো তাজ্জব হতেন। স্বয়ং মার্কসও! ধর্মের পাশ্চাত্য সমাজবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের পাণ্ডিত্যের পণ্ডিত, আর ধর্মানুরাগী ধর্মগুরুদের কথা তো রইলই!

আরও পড়ুন: ইসলামি ব্যাংকিং ও ইসলামি অর্থায়ন ভিন্ন: বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা

ওই বিশেষ গুরুজনপ্রতিম চিন্তাবিদ পর্যায়ের বুদ্ধিজীবী না হলে হয়তো বলেই ফেলতাম, এমন অদ্ভুত নতুন কথাটি বলে ফেলা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ওই ‘নতুন কিছু করো’র মতো ধর্মসংশ্লিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক স্টান্টবাজির মাধ্যমে কিছু দর্শক-শ্রোতাকে বিমোহিত করে আকর্ষিত করার চেষ্টার অংশই মাত্র; অনুজপ্রতিম হিসেবে সে বেয়াদবি এখানে করব না। দার্শনিকের দর্শনদৃষ্টির কিঞ্চিৎ ভ্রান্তিই ধরে নিয়ে আমাদের মতো সাধারণ্যেসহ সব সত্যাগ্রহীর জন্য তার সংশোধনী দেওয়ার চেষ্টা করব।

বিশ্বাসই ধর্মের বীজ, আর তার কেন্দ্রসম সারবত্তা। একে বাদ দিয়ে ধর্ম হয় না; কোনো ধর্মই হয় না। বলা হয়, বৌদ্ধধর্মে নাকি কোনো বিশ্বাস নেই, আছে শুধু দর্শন। কোনো এক সময় শ্যামদেশে (‘থাইল্যান্ড’-এ) বৌদ্ধ দর্শনে নিযুক্ত ‘আচার্ন’ (‘আচার্যন’ / ‘আচার্যম’, বা ‘আচার্য’) হিসেবে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান থেকেই বলতে পারি, কথাটি ঠিক নয়। বৌদ্ধ দর্শনটি বৌদ্ধধর্ম থেকেই প্রবাহিত ঠিক সেভাবেই, যেমনটি খ্রিষ্টীয় দর্শন প্রবাহিত খ্রিষ্টধর্ম থেকে। কিন্তু ধর্ম আর দর্শন এক নয়, দর্শন ধর্ম থেকে প্রবাহিত হলেও। উদাহরণস্বরূপ, আমার নিজের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খ্রিষ্টীয় পণ্ডিতদের মাধ্যমে পড়াশোনার ভেতর দিয়ে খোদ যিশুখ্রিষ্ট থেকে ধারাবাহিক সনদপরম্পরায় খ্রিষ্টীয় দর্শনে সনদ থাকলেও আমি খ্রিষ্টধর্মের ওই পর্যায়ের পাণ্ডিত্য ধারণ করি না। একইভাবে বৌদ্ধ সমাজে বৌদ্ধ দর্শন পড়ানোর জন্য নিযুক্ত আচার্ন বা আচার্য হলেও বৌদ্ধধর্মের পণ্ডিত নই সে পর্যায়ে। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই ধর্মোৎসারিত দর্শনের যৎসামান্য জ্ঞান থেকেই বলতে পারি, দর্শন উৎসারিত যে ধর্ম থেকে, তা তার মৌলিক ধর্মবিশ্বাস থেকেই। দর্শনের পরিভাষায় দর্শনের ভিত্তিরূপ এমন কিছু মৌলিক বিশ্বাস, যা প্রমাণোর্ধ্ব, তাকে স্বতঃসিদ্ধ, সিদ্ধান্ত বা মূলতত্ত্ব বলা হয়। এর সবই কোনো না কোনো ধর্মবিশ্বাস থেকে উৎসারিত।

ইউরোপের জনসাধারণ এবং সত্যসন্ধানী পণ্ডিত ও বিপ্লবীরা ধর্মব্যবসায়ী সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ভণ্ডামি ও নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে তাদের প্রধান ধর্ম, তথা খ্রিষ্টধর্মকে পরিত্যাগে উদ্যত হলে ধর্মকেই বাদ দিয়ে তার বিকল্প হিসেবে দর্শনকে তুলে ধরতে গেলে, তার ভিত্তিরূপ ‘স্বতঃসিদ্ধ’ সন্ধানে প্রবৃত্ত হলে, তার উৎস হিসেবে ইউরোপে প্রচলিত ধর্ম খ্রিষ্টবাদ, ও তার প্রতিপক্ষ হিসেবে ইউরোপীয়দেরই প্রতিপক্ষ হিসেবে মনে করা ইহুদি ও ইসলাম ধর্ম—এসব বাদ দিয়ে, তারও পেছনে, প্রাচীনতর ইউরোপের ধর্ম, তথা গ্রিক পৌত্তলিক ধর্মের বিশ্বাস ও জগদ্দৃষ্টির (Weltanschauung) দ্বারস্থ হয়ে তারই পুনরুজ্জীবনে (Renaissance) প্রবৃত্ত হয়। দর্শনের নামে প্রাচীন গ্রিক ও তার উৎস, ব্যাবিলনীয় ও প্রাচীন মিসরীয় পৌত্তলিক, শয়তান-উপাসনামূলক জাদুবিদ্যাভিত্তিক ধর্মবিশ্বাস, চর্চা ও দৃষ্টিভঙ্গির ‘পুনরুজ্জীবন’কে ‘নবজাগরণ’ বলেও তাকে প্রচলিত ধর্মের বিকল্প হিসেবে প্রচলিত করে সেই সদুদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিন্তু পথভ্রষ্ট বিপ্লবী ও তাদের অনুগামী। মধ্যযুগের ক্রুসেড যুদ্ধে এসে ইউরোপীয় যোদ্ধাদের অনেকে মধ্যপ্রাচ্যে সংগোপনে সংগঠিত শয়তানপূজারি জাদুবিদ্যাভিত্তিক ধর্মচর্চার গোপন নিয়ম শিখে, তার চর্চাকারীদের গোপন সংগঠন গড়ে তোলে ইউরোপময়, আর ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতা বিস্তারের ভেতর দিয়ে বিশ্বের অন্যান্য জায়গায়, বিশেষ করে সমাজপতি ও শাসক শ্রেণিগুলোর ভেতর।

এদের প্রভাবে প্রাচীন গ্রিক, ব্যাবিলনীয় ও মিসরীয় জাদুবিদ্যাভিত্তিক শয়তানপূজারি পৌত্তলিক ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গির প্রসারে ‘নবজাগরণ’-এর প্রবক্তারা প্রচলিত ধর্মগুলোর গণগ্রহণীয়তা ও জনপ্রিয়তার শেকড় কাটতে ধর্ম বিষয়টিরই বিরোধিতার ভান করে তার পরিবর্তে বিকল্প হিসেবে দর্শন, ও তার অন্যতম শাখা বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠার কথা বলে, যদিও তার আড়ালে নানা মোড়কে, তাদের নিজেদের প্রাচীনতর ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি, আচার-আচরণ ও চর্চার প্রসার করে। অন্যদিকে তারা প্রচলিত ধর্মের কোনো একটা চর্চার ভান করে, ভেতর থেকে তার শেকড় কাটতে তার বিশ্বাসগুলোকে হয় অস্বীকার বা পরিবর্তনের কার্যক্রম করে। এরই প্রভাবে বিভিন্ন সমাজে নানা ‘নবজাগরণ’-ধারার বুদ্ধিজীবী, সমাজের প্রচলিত ধর্মচর্চা করে তার গুরু সেজে বসে সে ধর্মের নিয়মনীতি, দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিচ্ছে—তার অংশ হিসেবে, কখনো কখনো তার বিশ্বাসমালাকেই হয় বদলে দিচ্ছে, না হয় আমূল অস্বীকারই করে ফেলার প্রচার করছে—নিজেরা যে এর জন্য ব্যবহৃত হচ্ছেন, সেটা না জেনে না বুঝেই।

মস্তিষ্কবিজ্ঞান অনুযায়ী কোনো জীবের মস্তিষ্কই কোনোরূপ বিশ্বাসমালা ছাড়া কার্যকর হতে বা থাকতে পারে না; মানুষের তো নয়ই। মস্তিষ্কমাত্রই দ্বিমিক (binary), অর্থাৎ তা কার্যকরই হয় সব সময়ই দুই সম্ভাব্য করণীয়ের ভেতর একটি বেছে নিয়ে তার ওপর কার্যকর হয়। দুই সম্ভাবনার ভেতর এভাবে একটি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে, মস্তিষ্ক যেই সম্ভাবনাকে সঠিক বিশ্বাস করে, তাকেই বেছে নেয়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো একটি পরিস্থিতিতে একজন চুরি করবে, না করবে না, তা ঠিক করার জন্য মস্তিষ্ক চুরি করা ঠিক বলে বিশ্বাস করলে, চুরি করার সিদ্ধান্ত নেবে। কোনো একটি পরিস্থিতিতে একজন মিথ্যা বলবে, না বলবে না, তা ঠিক করার জন্য মস্তিষ্ক মিথ্যা বলা ঠিক বলে বিশ্বাস করলে, মিথ্যা বলার সিদ্ধান্ত নেবে। কোনো একটি পরিস্থিতিতে একজন ঘুস খাবে, না খাবে না, তা ঠিক করার জন্য মস্তিষ্ক ঘুস খাওয়া ঠিক বলে বিশ্বাস করলে ঘুষ খাওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে।

এ রকম নানা বিশ্বাসের সমষ্টি নিয়ে বিশ্বাসমালা দিয়েই মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালি পরিচালনা ব্যবস্থা রূপায়িত হয়। একটি কম্পিউটার যেভাবে তার ‘ডিস্ক অপারেটিং সিস্টেম (DOS)’ দ্বারা তার অজ্ঞাতেই পরিচালিত হয়—মস্তিষ্কও সেভাবে এই বিশ্বাসমালার দ্বারা, সাধারণত তার সচেতনতা ছাড়াই পরিচালিত হয়।

ধর্ম মূলত এরূপ একটি বিশ্বাসমালা ও তার নির্দেশানুগ আচার-আচরণ এবং তদনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির সমষ্টি। দর্শনও এরূপ একটি বিশ্বাসমালা ও তদনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির সমষ্টি সংশ্লিষ্ট আচার-অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে। কিন্তু কিছু স্বতঃসিদ্ধ বলে মেনে নেওয়া বিষয়ের ওপর বিশ্বাস বাদ দিয়ে না কোনো ধর্ম, না কোনো দর্শন বা তার শাখারূপ বিজ্ঞান সম্ভব।

তাই ধর্মে বিশ্বাস বলে কিছু নেই, কথাটি ধর্মমতেই শুধু নয়, বৈজ্ঞানিক বিচারেও একেবারেই অযৌক্তিক ও অসম্ভব। এমন কথা এমন এক নতুন অদ্ভুত কথা, যা শুধু দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের উদ্ধৃত কবিতাটিতে উল্লিখিত নতুন কিছু করা বা বলার জন্য বলার মতো উদ্ভট কিছু বৈ নয়।

তাহলে বুদ্ধিমান বুদ্ধিজীবী কোন বুদ্ধিতে এমন কথা বলেন? ভাষাবিভ্রাটে এমন হয়েছে।

বক্তা বলেন, ধর্ম হলো ‘ঈমান’, আর ‘ঈমান’ অর্থ ‘সমর্পণ’, তাই এখানে বিশ্বাসের কোনো বিষয় নেই।

কিন্তু ‘ঈমান’-এর আক্ষরিক অর্থ ‘সমর্পণ’ নয়, ‘বিশ্বাস’। ‘ঈমান’-এর শব্দমূল ‘অ-ম-ন’-এর অর্থ ‘নিরাপত্তা’, সেখান থেকে নিরাপত্তাজনিত ‘শান্তি’, আর সেখান থেকে নিরাপত্তা ও শান্তির ভিত্তি, তথা নিরাপত্তাজাত শান্তিদায়ক ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ এবং তারই চূড়ান্ত রূপ হলো ‘আমান’, তথা ‘ঈমান’।

তাহলে ‘ধর্ম হলো সমর্পণ’—কথাটি কোত্থেকে এলো? তার উৎস অন্য একটি শব্দ, ‘ইসলাম’, যার অর্থ ‘সমর্পণ’। প্রাচীন সেমিটিক ভাষা, তথা আরব্য ভাষা ও সংস্কৃতি, যাতে সব ধর্মেরই আদি উৎস নিহিত, তাতে ধর্মের নাম হলো ‘ইসলাম’। যেমনটি কোরআন শরিফে বলা আছে, মোটামুটি ভাষান্তরে, ‘খোদার নিকট ধর্ম হলো ইসলাম।’ আর ‘জিবরাইলের হাদিস’ বলে পরিচিত হাদিস শরিফ মতে, ধর্মের তিন বলয়—তার একটি ‘ইসলাম’, অর্থাৎ ‘সমর্পণ’; দ্বিতীয়টি ‘ঈমান’, অর্থাৎ বিশ্বাস; আর তৃতীয়টি ‘ইহসান’, অর্থাৎ ‘সুন্দরায়ণ’, অর্থাৎ বিশ্বাসভিত্তিক সমর্পণকে সুন্দর করে তোলা।

ধর্ম তাহলে অবশ্যই সমর্পণ, তথা ‘ইসলাম’, কিন্তু তা শুধুই সমর্পণ নয়, বিশ্বাসের বিকল্প হিসেবেও নয়, বরং বিশ্বাসে সমর্পণ, তাও সুন্দরভাবে। তার মাধ্যমে বিশ্বস্ততা অর্জন ও তার মাধ্যমে নিরাপত্তামূলক শান্তি অর্জন ও প্রতিষ্ঠা।

ধর্মকে বিশ্বাসের বিকল্পে বিশ্বাসবিহীন সমর্পণ হিসেবে উপস্থাপনের সুবাদে বুদ্ধিজীবী নির্বুদ্ধিমূলক আরেকটি ভ্রান্তির অবতারণা করে বলেন, ধর্ম হিসেবে ‘সমর্পণ’ হবে ‘গায়েব’-এ, যার ভয়ংকর ভ্রান্ত ‘অনুবাদ’ করেন তিনি অস্তিত্বহীন বলে। অর্থাৎ, তার মতে, ধর্ম হবে বিশ্বাসহীন এক সমর্পণ অস্তিত্বহীনের। ধর্মের আবহমানকালের চিরায়ত ধারণায় আসলে তো ধর্ম হলো সমর্পণ আল্লাহ, ‘গড’ বা ঈশ্বরের। এই নতুন কিছু করো মার্কা নতুন উদ্ভট ধারণায় ধর্ম যদি হয় অস্তিত্বহীনের সমর্পণ, তাহলে কি তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন যে, আল্লাহ, গড বা ঈশ্বর অস্তিত্বহীন? এ কি ধর্মের নামে নাস্তিকতার উপস্থাপন ও পসরা? তার এ ভ্রান্তিরও উৎস ভাষাবিভ্রাট! কোরআন শরিফে ধর্ম শিক্ষা দিতে গিয়ে যে বলা হয়েছে, ‘গায়েব’-এ ‘ঈমান’-এর কথা, তার ‘গায়েব’-এর চরম ভুল ‘অনুবাদ’ করেছেন তিনি ‘অস্তিত্বহীন’ বলে, অথচ আরবি ‘গায়েব’ শব্দের অর্থ আদৌ অস্তিত্বহীন নয়, বরং পঞ্চেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অনুধাবনের বাইরে যা, তা-ই। একটি লোক বহু দূরে দেখা যাচ্ছে না, তার কোনো শব্দও শোনা যাচ্ছে না, তার ঘ্রাণও পাওয়া যাচ্ছে না, স্পর্শ দিয়ে তাকে অনুভবও করা যাচ্ছে না, চেটে তার স্বাদও নেওয়া যাচ্ছে না—সে অবস্থায় সে ‘গায়েব’; তাই বলে সে অস্তিত্বহীন নয়।

‘গায়েব’-এ ঈমানের অর্থ তাই অস্তিত্বহীনের সমর্পণ নয়, পঞ্চেন্দ্রিয়াতীত অস্তিত্বমানে বিশ্বাস, আর ধর্ম, তথা ‘ইসলাম’ হলো সেই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই তাতে আত্মসমর্পণ।

বুদ্ধিজীবীর বুদ্ধি এভাবে অদৃশ্য বিশ্বাসে সমর্পণ করতে পারলে দেহ বেঁচে খাওয়া দেহজীবীতুল্য বুদ্ধি বেঁচে খাওয়া বুদ্ধিজীবী থেকে বোদ্ধাতে উত্তীর্ণ হয়ে ভ্রান্তির মায়াজাল থেকে মোহমুক্ত হতে পারেন। আমাদের মতো সাধারণ মানুষও। আর তার ফলে ইউটিউবের এসব ফেতনা থেকেও আমরা সবাই মুক্ত হতে পারি।

লেখক: প্রফেসর, ঢাকা ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশ ও বিদেশের বিবিধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূতপূর্ব শিক্ষক। যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি থেকে তুলনামূলক মার্কসবাদ, ধর্মীয় সংস্কৃতি, দর্শন ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ পদ্ধতির ওপর পড়াশোনাপূর্বক পিএইচডি অর্জন করেন।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

মুম্বাইয়ের কোচিং স্টাফে তিন পরিবর্তন, প্রধান কোচ হলেন কাইরন পোলার্ড

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

স্পোর্টস ডেস্ক

শুক্রবার, ৩০শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০৮:০০ এম


মুম্বাইয়ের কোচিং স্টাফে তিন পরিবর্তন, প্রধান কোচ হলেন কাইরন পোলার্ড

আইপিএলের আসন্ন মৌসুমের প্রস্তুতির জন্য মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স কোচিং স্টাফে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনছে। তিন কোচকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। বোলিং কোচ লাসিথ মালিঙ্গা, পারাস মাহামব্রে এবং ফিল্ডিং কোচ কার্ল হপকিনসন আর মুম্বাইয়ের সঙ্গে থাকবেন না। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ফ্র্যাঞ্চাইজিটি এক বিবৃতির মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

তবে, এই তিন কোচের স্থলাভিষিক্ত কারা হবেন তা এখনও জানানো হয়নি। এর আগে, চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে প্রধান কোচ মাহেলা জয়াবর্ধনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফ্র্যাঞ্চাইজিটি। নতুন প্রধান কোচ হিসেবে কাইরন পোলার্ডকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

মালিঙ্গা খেলোয়াড় হিসেবে মুম্বাইয়ের হয়ে চারটি আইপিএল শিরোপা জিতেছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে কোচিং স্টাফে যোগ দেন শ্রীলঙ্কার প্রাক্তন এই পেসার। অন্যদিকে, ২০২৫ আসরের আগে বোলিং কোচ হিসেবে মাহামব্রে এবং ফিল্ডিং কোচ হিসেবে হপকিনসনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

মাহামব্রের মুম্বাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তিনি ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ফ্র্যাঞ্চাইজির কোচিং স্টাফে কাজ করেছেন এবং গত আসরের আগে দ্বিতীয়বারের মতো দলের সঙ্গে যুক্ত হন।

মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স আইপিএলের প্রথম দল হিসেবে পাঁচবার শিরোপা জিতেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাদের সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। গত ছয় আসরে তারা একবারও ফাইনালে উঠতে পারেনি। ২০২৩ ও ২০২৫ সালে প্লে-অফে জায়গা করে নিলেও ২০২৪ সালে দশম এবং সর্বশেষ আসরে নবম স্থানে থেকে প্রতিযোগিতা শেষ করেছে তারা।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

আজ আইসিসিবিতে শুরু হচ্ছে ‘সুপার সেল কার বাজার’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

শুক্রবার, ৩০শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০৮:০১ এম


আজ আইসিসিবিতে শুরু হচ্ছে ‘সুপার সেল কার বাজার’

রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) আজ শুক্রবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘সুপার সেল কার বাজার’। টানা সাত সপ্তাহের সফলতার পর এটি অষ্টমবারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে গাড়ি কেনাবেচার এই বিশেষ আয়োজন।

ক্রেতারা এখানে নিজেদের পছন্দের গাড়িটি ক্রয় করার পাশাপাশি, ব্যবহৃত গাড়ি উপযুক্ত দামে বিক্রির সুযোগও পাবেন।

গত ৪ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই গাড়ি কেনাবেচার আয়োজন প্রতি শুক্রবার নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ক্রেতারা এখানে ঝক্কিঝামেলা ছাড়াই পছন্দের বাইক কিংবা গাড়ি কিনতে সক্ষম হচ্ছেন। প্রয়োজনে নিজের ব্যবহৃত বাইক বা চার চাকার গাড়িও বিক্রি করার সুযোগ রয়েছে।

‘সুপার সেল কার বাজার’ উদ্বোধনী দিন থেকেই অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ক্রেতাদের অনেকেই মনে করছেন, এই ব্যস্ত শহরে এমন আয়োজন নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। তাই ক্রেতাদের নিয়মিত স্বস্তি দিতে শুক্রবার সকাল ১০টায় পূর্বঘোষণা অনুযায়ী শুরু হবে ‘সুপার সেল কার বাজার’। নতুন, পুরাতন ও রিকন্ডিশন্ড গাড়ি, মোটরবাইক এবং ইউটিলিটি ভেহিকেলের বিশাল সমাহার থাকবে এই বাজারে।

উদ্যোক্তাদের মতে, বাংলাদেশের অটোমোবাইল বাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে একটি নিয়মিত ও আধুনিক মার্কেটপ্লেসের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। ‘সুপার সেল কার বাজার’ সেই চাহিদার পূরণে একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর মাধ্যমে ক্রেতারা এক জায়গায় বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও মডেলের যানবাহন সম্পর্কে জানার এবং তুলনা করার সুযোগ পাচ্ছেন। একইসঙ্গে বিক্রেতারাও সরাসরি সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাতে পারছেন।

‘সুপার সেল কার বাজার’ আয়োজন করছে উইজার্ড শোবিজ এবং ভেন্যু পার্টনার হিসেবে রয়েছে আইসিসিবি।

এই আয়োজনে বিভিন্ন ব্র্যান্ড, ডিলারশিপ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অটোমোবাইল-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করছে। পাশাপাশি ব্যক্তি মালিকানাধীন নতুন, রিকন্ডিশন্ড ও ব্যবহৃত গাড়ি এবং মোটরসাইকেল বিশেষ ছাড়ে কেনাবেচার সুযোগও রয়েছে।

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

ঘর অগোছালো থাকলে কি মনের ওপরও পড়ে নেতিবাচক প্রভাব?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

শুক্রবার, ৩০শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০৮:০৯ এম


ঘর অগোছালো থাকলে কি মনের ওপরও পড়ে নেতিবাচক প্রভাব?

সারাদিনের কাজ শেষে যখন কেউ ঘরে ফিরে একটু শান্তিতে বসতে চান, তখন যদি সোফায় ছড়িয়ে থাকা কাপড়, টেবিলে জমে থাকা কাগজপত্র, মেঝেতে পড়ে থাকা খেলনা কিংবা রান্নাঘরের অপরিষ্কার বাসনপত্র দেখে বিরক্তি অনুভব করেন, তখন বিষয়টিকে নিছক ঘর পরিষ্কারের ঝামেলা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, আপনার চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে মানসিক স্বস্তির সম্পর্ক বিদ্যমান।

অগোছালো ঘর ও মানসিক চাপের সম্পর্ক

ঘর অগোছালো থাকলে কি সত্যিই মন খারাপ হয়? ২০২৫ সালের আগস্টে Journal of Environmental Psychology সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ৫০১ জন প্রাপ্তবয়স্কের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকেরা লক্ষ্য করেছেন, ঘরের অগোছালো অবস্থা এবং মানুষের মানসিক সুস্থতার মধ্যে নেতিবাচক সম্পর্ক বিদ্যমান। যাঁরা নিজেদের ঘরকে বেশি অগোছালো মনে করেছেন, তাঁদের মধ্যে নেতিবাচক অনুভূতি বেশি এবং জীবন নিয়ে সন্তুষ্টি ও মানসিক সুস্থতার মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেছে।

তবে গবেষণাটি থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে অগোছালো ঘরই মানসিক অশান্তির একমাত্র কারণ। আগে থেকেই মানসিক চাপে থাকা ব্যক্তির পক্ষে ঘর গোছানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ, সম্পর্কটি দুই দিক থেকেই কাজ করতে পারে।

চোখের সামনে বিশৃঙ্খলা থাকলে মনের ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে। ঘরে অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছড়িয়ে থাকলে প্রয়োজনীয় জিনিস খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কোথায় চাবি রাখা হয়েছে, জরুরি কাগজপত্র কোথায়, কিংবা কাপড়ের স্তূপের মধ্যে পছন্দের পোশাকটি খুঁজে পাওয়া—এ ধরনের ছোটখাটো সমস্যা প্রতিদিনের বিরক্তি বাড়াতে পারে।

অন্যদিকে, ঘরে ফিরেই যদি অসমাপ্ত কাজের তালিকা চোখে পড়ে, তাহলে অবসর সময়েও মনে হতে পারে অনেক কিছু এখনো করা বাকি। ফলে বাড়িতে থেকেও বিশ্রামের অনুভূতি পাওয়া কঠিন হতে পারে।

ঘরের পরিবেশ কি মানসিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত? ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের গবেষক ডারবি স্যাক্সবে ও রেনা রেপেত্তির ২০১০ সালের একটি গবেষণায় ৩০ জন দ্বৈত-আয়ের দম্পতির বাড়ির পরিবেশ ও মানসিক অবস্থার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যেসব নারী তাঁদের ঘরকে বেশি চাপপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে দিনের সঙ্গে নেতিবাচক মেজাজ বাড়ার সম্পর্ক দেখা গেছে। তাঁদের কর্টিসলের দৈনিক ওঠানামার ধরনও তুলনামূলকভাবে কম খাড়া ছিল, যা কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত।

গবেষণাটি ছোট পরিসরের হওয়ায় এর ফলাফল সবার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য বলা যায় না। তবে বাড়ির পরিবেশ যে মানুষের মানসিক অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, তা বোঝার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ।

অগোছালো ঘর থেকে অপরাধবোধও তৈরি হতে পারে। অনেকেই ঘর অগোছালো দেখে মনে মনে ভাবেন, ‘এতটুকু কাজও কেন করতে পারছি না?’ কর্মজীবী মানুষ, ছোট সন্তানের অভিভাবক কিংবা যাঁদের ওপর পরিবারের বেশির ভাগ দায়িত্ব থাকে, তাঁদের জন্য ঘর গোছানো আরও একটি অসমাপ্ত কাজের বোঝা হয়ে উঠতে পারে।

ফলে শুধু ঘরের বিশৃঙ্খলা নয়, নিজের প্রতি বিরক্তি ও অপরাধবোধও তৈরি হতে পারে। অথচ ক্লান্তি, সময়ের অভাব, আর্থিক সীমাবদ্ধতা কিংবা মানসিক চাপের মতো বাস্তব কারণেও ঘর অগোছালো থাকতে পারে। তাই ঘর গোছানো না থাকাকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

ঘর শুধু থাকার জায়গা নয়, এটি আমাদের বিশ্রাম, অভ্যাস ও দৈনন্দিন অনুভূতির সঙ্গেও জড়িত। গবেষণায় অগোছালো পরিবেশের সঙ্গে কম মানসিক সুস্থতা ও বেশি নেতিবাচক অনুভূতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে অগোছালো ঘর সরাসরি মানসিক সমস্যার কারণ- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো যথেষ্ট নয়।

চলবে....

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

পরবর্তী খবর

অটিজম থেকে স্বাভাবিক জীবনের পথে রাহির বিশেষ শিক্ষা পরিকল্পনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

তালাশ বিডি ডেস্ক

শুক্রবার, ৩০শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং

০৮:১০ এম


অটিজম থেকে স্বাভাবিক জীবনের পথে রাহির বিশেষ শিক্ষা পরিকল্পনা

রাহি নামের একটি ছোট ছেলে ঢাকার একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করে। যখন রাহির বয়স দুই বছর, তখন তার মা-বাবা লক্ষ্য করেন যে রাহি অন্য শিশুদের মতো সাড়া দেয় না। তার নাম ধরে ডাকলে সে তাকায় না, চোখের সামনে হাত নাড়লেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না এবং একা একা খেলতে পছন্দ করে। প্রথমে রাহির মা-বাবা মনে করেন, এটি হয়তো তার স্বাভাবিক বিকাশের অংশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের উদ্বেগ বাড়তে থাকে। রাহি কথা বলা শুরু করেনি এবং মাঝে মাঝে অস্বাভাবিক আচরণ, যেমন বারবার হাত নাড়া বা একই কাজ পুনরাবৃত্তি করা করে।

তিন বছর বয়সে রাহির মা-বাবা তাকে একজন শিশু মনোবিজ্ঞানীর কাছে নিয়ে যান। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়, রাহি অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে (এএসডি) আক্রান্ত। এই খবরটি রাহির পরিবারের জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল। তারা প্রথমে হতাশায় ভুগলেও মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শে ঢাকার একটি অটিজম বিশেষায়িত স্কুলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এই স্কুলটি ছিল জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের অধীনে পরিচালিত ‘স্পেশাল স্কুল ফর চিলড্রেন উইথ অটিজম’।

রাহিকে স্কুলে ভর্তি করা হয়, যেখানে তার জন্য একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা পরিকল্পনা (Individualized Education Plan—IEP) তৈরি করা হয়। এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত ছিল স্পিচ থেরাপি—রাহির যোগাযোগদক্ষতা উন্নত করার জন্য; অকুপেশনাল থেরাপি—তার সূক্ষ্ম মোটর দক্ষতা এবং দৈনন্দিন কাজে স্বাধীনতা বাড়ানোর জন্য; আচরণগত থেরাপি (ABA—Applied Behavior Analysis)—তার পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ কমানো এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়া উন্নত করার জন্য; এবং গ্রুপ থেরাপি—অন্য শিশুদের সঙ্গে মেলামেশার দক্ষতা বাড়ানোর জন্য। রাহির মা-বাবাও স্কুলের কাউন্সেলিং কর্মসূচিতে অংশ নেন, যেখানে তারা শেখেন, কীভাবে রাহির সঙ্গে ধৈর্যশীল ও সহায়ক আচরণ করতে হয়। তারা বুঝতে পারেন, রাহির সুপ্ত প্রতিভা খুঁজে বের করে তাকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া গেলে সে সমাজে অবদান রাখতে পারবে।

রাহির মতো শিশুদের গল্প প্রমাণ করে যে অটিজম কোনো অভিশাপ নয়। সঠিক যত্ন, শিক্ষা ও সমাজের সমর্থন দিয়ে অটিস্টিক শিশুরা তাদের সম্ভাবনার বিকাশ ঘটাতে পারে এবং সমাজে অবদান রাখতে পারে। বাংলাদেশে এ ক্ষেত্রে আরো সচেতনতা এবং সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন, যাতে প্রতিটি অটিস্টিক শিশু তার জীবনের গল্প নিজেদের মতো করে লিখতে পারে। বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে কাজের ফলে অনেক শিশু স্বাভাবিক জীবনযাপনে সক্ষম হয়েছে।

অটিজম একটি মস্তিষ্কের বিকাশজনিত সমস্যা, যা শিশুদের সাধারণত জন্মের প্রথম তিন বছরের মধ্যে প্রকাশ পায়। এটি সামাজিক যোগাযোগ, পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ এবং সীমিত আগ্রহের ক্ষেত্রে অসুবিধা সৃষ্টি করে।

অটিজম একটি স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারÑঅর্থাৎ এর লক্ষণ ও তীব্রতা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। কিছু ব্যক্তি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারলেও অনেকের জন্য বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন। বাংলাদেশে প্রতি এক হাজার শিশুর মধ্যে প্রায় দুজন অটিজমে আক্রান্ত। শহরাঞ্চলে এই হার তুলনামূলক বেশি। সমাজসেবা অধিদপ্তরের ২০১৮ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশে অটিজমে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা প্রায় ৪২ হাজার ৪৫০ জন।

অটিজমের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পুরোপুরি চিহ্নিত করা যায়নি। তবে কিছু সম্ভাব্য কারণ রয়েছে। জিনের ত্রুটি বা মিউটেশন অটিজমের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। রেট সিনড্রোম বা ফ্র্যাজাইল এক্স সিনড্রোমের মতো জেনেটিক ডিজঅর্ডারের সঙ্গে অটিজম যুক্ত হতে পারে।

গর্ভকালীন ভাইরাল সংক্রমণ (যেমন : জিকা ও রুবেলা), বায়ুদূষণ, বিষাক্ত রাসায়নিক (মার্কারি ও লেড) এবং খাদ্য সংরক্ষণের রাসায়নিক দ্রব্য অটিজমের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

মা-বাবার বেশি বয়স, গর্ভকালীন জটিলতা এবং মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক গঠন বা রাসায়নিক কার্যকলাপ অটিজমের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, ভ্যাকসিনের সঙ্গে অটিজমের কোনো সম্পর্ক নেই।

অটিজমের লক্ষণ

অটিজমের লক্ষণ সাধারণত শিশুর ১৮ থেকে ৩৬ মাস বয়সের মধ্যে প্রকাশ পায়। প্রধান লক্ষণগুলো হলো সামাজিক যোগাযোগে সমস্যা, চোখে চোখ না রাখা, নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেওয়া এবং অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে অসুবিধা। একই কাজ বারবার করা এবং নির্দিষ্ট বস্তু বা ক্রিয়াকলাপের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহও এর লক্ষণ। এছাড়া কথা বলতে দেরি, অস্বাভাবিক সুরে কথা বলা বা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে যোগাযোগে অসুবিধা হতে পারে। নির্দিষ্ট শব্দ, আলো, স্পর্শ বা টেক্সচারের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা বা উদাসীনতাও দেখা যায়।

দেশের ৬৪টি জেলা এবং ৩৯টি উপজেলায় ১০৩টি কেন্দ্রে অটিজম কর্নার চালু করা হয়েছে।

সেনানিবাসে ‘প্রয়াস’ নামে প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ এবং নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট এ ক্ষেত্রে কাজ করছে।

চিকিৎসা ও প্রশিক্ষণ

অটিজমের কোনো নির্দিষ্ট ওষুধভিত্তিক চিকিৎসা নেই। তবে বিভিন্ন থেরাপি ও শিক্ষার মাধ্যমে শিশুদের উন্নতি সম্ভব। গ্রামাঞ্চলে অটিজম সম্পর্কে সচেতনতা এখনো কম। অনেক অভিভাবক তাদের শিশুর অটিজম শনাক্ত করতে পারেন না।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয়

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের মাধ্যমে অটিজমবিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ এবং আর্থিক অনুদান প্রদান করে।

নীতিমালা ও আইনি কাঠামো

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ : এই আইনের আওতায় অটিস্টিক ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষিত করা হয়। মন্ত্রণালয় এই আইন বাস্তবায়নে বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন ও সংশোধন করেছে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার নীতিমালা, ২০১৮ (খসড়া) : অটিস্টিক ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের জন্য এই নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে।

মায়ের ভূমিকা

অটিজমে আক্রান্ত শিশুর বিকাশে মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মায়েরা শিশুর আচরণের প্রাথমিক লক্ষণ, যেমন চোখে চোখ না রাখা ও কথা না বলা, শনাক্ত করতে পারেন। মায়েরা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে শিশুকে ভাষা, সামাজিকতা ও দৈনন্দিন কাজ শেখাতে পারেন। ধৈর্য, ভালোবাসা ও সহজ ব্যবহারের মাধ্যমে শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারেন তার মা। মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় কাউন্সেলিং গ্রহণ করা উচিত। মায়েরা সমাজে অটিজম নিয়ে কুসংস্কার দূর করতে সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারেন। অটিজমে আক্রান্ত শিশুর মা-ই পারেন তার শিশুটিকে স্বাভাবিক জীবন উপহার দিতে।

বাংলাদেশে অটিজম বিষয়ে সচেতনতা ও সেবা প্রদানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও এখনো অনেক কাজ বাকি। সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নের মাধ্যমে অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য আরো সমৃদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। প্রাথমিক শনাক্তকরণ, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই শিশুরা সমাজের মূলধারায় যুক্ত হতে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা।

লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়

তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ

আর্কাইভ

Please select a date!

নামাজের সময়সূচী

তারিখঃ ২০ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮হিঃ
ফজর ০৪:৪৭
জোহর ১১:৪৩
আসর ০৩:৪৩
মাগরিব ০৫:২০
ইশা ০৬:৩২
সূর্যোদয় : ০৬:০৪ সূর্যাস্ত : ০৫:২০
অনলাইন জরিপ
ফলাফল
থার্টি-ফার্স্ট নাইটে তরুণদের জন্য প্রকাশ্যে পানি-টানি খাওয়ার বিরুদ্ধে আহ্বান। আপনার মন্তব্য দিন
হ্যা
100%
না
0%
মন্তব্য নেই
0%