০৪:০৫ পি.এম
৩ নভেম্বর ২০২৬
সমাজের নানা অবহেলা, বঞ্চনা আর প্রতিকূলতাকে জয় করে নিজের চেষ্টায় স্বাবলম্বী হয়েছেন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার তৃতীয় লিঙ্গের নারী স্বপ্না (২৩)। একসময় জীবিকার প্রয়োজনে মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে হতো তাঁকে। কিন্তু কারও কাছে হাত না পেতে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে শুরু করেন ছাগল পালন। মাত্র দুটি ছাগল দিয়ে শুরু করা তাঁর সেই উদ্যোগ এখন পরিণত হয়েছে একটি ছোট খামারে। বর্তমানে সেখানে রয়েছে ১৮টি ছাগল। কঠোর পরিশ্রম আর অদম্য মনোবল দিয়ে গড়ে তোলা এই খামারই এখন তাঁর জীবিকার প্রধান অবলম্বন।
স্বপ্নার বাড়ি উল্লাপাড়া উপজেলার মোহনপুর মিলপাড়া এলাকায়। রেলওয়ের জায়গায় পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেন তিনি। তাঁর বাবা রফিকুল ইসলাম ও মা নুরজাহান বেগম। ছোটবেলায় বাবা-মা তাঁর নাম রেখেছিলেন স্বপন। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনাও করেছেন। পরবর্তী সময়ে জীবনের নানা বাস্তবতায় স্বপন থেকে পরিচিতি পান স্বপ্না নামে।
আরও পড়ুন: মাদক ও কিশোর গ্যাং দমনে বরিশাল নগরীতে ডিবি পুলিশের আকস্মিক চেকপোস্ট ও সাঁড়াশি অভিযান
স্বপ্না জানান, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ হওয়ায় জীবিকার জন্য একসময় অন্যের কাছে সাহায্য চাইতে হতো তাঁকে। এ সময় নানা মানুষের কটূক্তি ও নেতিবাচক মন্তব্য শুনতে হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে নিজের উপার্জনের পথ খুঁজতে উৎসাহিত করে। অন্যের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজেই কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এরপর ছাগল পালনের প্রতি আগ্রহ তৈরি হলে বাবা-মায়ের সহযোগিতায় শুরু করেন খামার।
স্বপ্নার মা নুরজাহান বেগম বলেন, তাঁদের নিজস্ব কোনো জমিজমা নেই। সরকারি জায়গায় বসবাস করেন তাঁরা। সংসার চালাতেও অনেক কষ্ট করতে হয়। পাশের বাড়িতে একজনকে ছাগল পালন করতে দেখে স্বপ্নারও ছাগল কেনার আগ্রহ তৈরি হয়। পরে তাঁর বাবা ১৩ হাজার ও ১৪ হাজার টাকা দিয়ে দুটি ছাগল কিনে দেন। সেই দুটি ছাগল থেকেই শুরু হয় স্বপ্নার খামারের পথচলা।
শুরুতে অল্পসংখ্যক ছাগল নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও ধীরে ধীরে খামার বড় করার চেষ্টা করেন তিনি। একপর্যায়ে ছাগলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২টিতে। কিন্তু হঠাৎ রোগে আক্রান্ত হয়ে ছয়টি ছাগল মারা গেলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি ছাগল মারা যাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়লেও হাল ছাড়েননি তিনি। নতুন করে উদ্যোগ নিয়ে আবারও খামার গড়ে তোলেন। বর্তমানে তাঁর খামারে রয়েছে ১৮টি ছাগল। এর মধ্যে তোতা, হরিয়ানা, বিটল, যমুনাপাড়ি ও ব্ল্যাক বেঙ্গলসহ বিভিন্ন জাতের ছাগল রয়েছে। তাঁর দাবি, জাত ও আকারভেদে প্রতিটি ছাগলের বাজারমূল্য এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত।
স্বপ্না জানান, খামারের পাঠা প্রজননের মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা আয় হয়। পাশাপাশি বছর শেষে বিক্রির উপযোগী ছাগল বিক্রি করেও ভালো অর্থ পাওয়া যায়। গত বছর চট্টগ্রামে বিভিন্ন পূজা উপলক্ষে ১০টি ছাগল বিক্রি করে মোট ৭ লাখ ১০ হাজার টাকা পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
আরও পড়ুন: রংপুরে ৩৩ ওয়ার্ডে প্রাইমারি হেলথ কেয়ার প্রোগ্রামের উদ্বোধন
স্বপ্না বলেন, ‘আমি চাই না জীবিকার জন্য আর কারও কাছে হাত পাততে হোক। নিজের পরিশ্রমে কিছু করে বাঁচতে চাই। এই খামার দিয়েই আমার সংসার চলে। অনেক কষ্ট করে খামারটি দাঁড় করিয়েছি। মাঝেমধ্যে ছাগল মারা যাওয়ায় লোকসান হয়েছে, তবুও দমে যাইনি। আমার স্বপ্ন, খামারটিকে আরও বড় করা। সরকার সহযোগিতা করলে উন্নত জাতের ছাগল পালন, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আরও ভালোভাবে এগিয়ে যেতে পারব। পাশাপাশি অন্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করতে চাই।’
স্বপ্নার এই উদ্যোগ শুধু তাঁর নিজের জীবিকার পথই তৈরি করেনি, বরং সমাজের প্রচলিত নেতিবাচক ধারণার বিপরীতে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। প্রয়োজনীয় পুঁজি, সরকারি সহযোগিতা ও পশুপালনবিষয়ক প্রশিক্ষণ পেলে তাঁর খামারটি আরও সম্প্রসারিত হতে পারে। স্বপ্নার প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর তাঁর পাশে দাঁড়াবে, যাতে আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার পাশাপাশি ভবিষ্যতে আরও বড় উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন