০৮:৫৮ পি.এম
ফিফা বিশ্বকাপে মাঠে মাঠে পাকিস্তানকে দেখা যাবে না। কিন্তু টুর্নামেন্টের প্রতিটি ম্যাচ, প্রতিটি গোল এবং শিরোপা নির্ধারণী মুহূর্তের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে পাকিস্তান তৈরি করা বল।
এবারের বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ম্যাচ বল 'ট্রিওন্ডা' তৈরি করেছে দেশটির সিয়ালকোটভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'ফরওয়ার্ড স্পোর্টস'।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা খাজা মাসুদ আখতার একসময় পাকিস্তান রেলওয়েতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করতেন। ১৯৯১ সালে মাত্র ২০ জন কর্মী এবং একটি ছোট কক্ষ নিয়ে ফরওয়ার্ড স্পোর্টস শুরু করে ব্যবসা। আর ৩৫ বছর পর এখন প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ২ কোটি ৫ লাখ ফুটবল উৎপাদন করে।
আরও পড়ুন: সরকারকে সেলিম উদ্দিনের আহ্বান, গণরায়ের বিরুদ্ধে না গিয়ে জনগণের পক্ষে দাঁড়ান
ফরওয়ার্ড স্পোর্টস টানা চতুর্থবারের মতো ফিফা বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ম্যাচ বল তৈরির দায়িত্ব পেয়েছে।
এর আগে তারা ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের 'ব্রাজুকা', ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের 'টেলস্টার ১৮' এবং ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের 'আল রিহলা' বলগুলোও তৈরি করেছিল।
দেশটি 'বিশ্বের ফুটবল কারখানা' হিসেবে পরিচিত এবং সিয়ালকোটে বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ ফুটবল তৈরি হয়। স্থানীয় ক্লাবের অনুশীলন বল থেকে শুরু করে বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ম্যাচ বল—সব ক্ষেত্রেই এই শহরের অবদান রয়েছে।
পাকিস্তান বছরে প্রায় ৪ কোটি ফুটবল রপ্তানি করে এবং প্রতিদিন সিয়ালকোটের কারখানাগুলো থেকে প্রায় ৩ লাখ ফুটবল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হচ্ছে।
আরও পড়ুন: স্বাস্থ্য খাত ধ্বংস করেছে ফ্যাসিস্ট সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করে খাজা মাসুদ আখতার পাকিস্তান রেলওয়েতে চাকরি শুরু করেন। পরে তার চাচার উৎসাহে ক্রীড়া সামগ্রী উৎপাদন শিল্পে যোগ দেন।
মুসলিম নেটওয়ার্ক টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, 'আমি কখনো ভাবিনি ফুটবল তৈরি করব। এ শিল্পে আমার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না।
তবে প্রযুক্তিগত চিন্তাভাবনা ছিল এবং চাচার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করি।'
প্রথমদিকে উৎপাদন ছিল মাসে মাত্র এক হাজার ফুটবল। প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকাও ছিল কঠিন।
আরও পড়ুন: হাসনাত আবদুল্লাহ: জনগণের বিরুদ্ধে অবৈধ সাম্রাজ্য রক্ষার দায়িত্ব পুলিশের নয়
ফরওয়ার্ড স্পোর্টসের সাফল্যের বড় মোড় আসে ১৯৯৪ সালে, যখন বিশ্বখ্যাত ক্রীড়া সামগ্রী নির্মাতা অ্যাডিডাস তাদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব শুরু করে।
খাজা মাসুদ আখতার বলেন, 'অ্যাডিডাসের সঙ্গে কাজ শুরু করার পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। কঠোর পরিশ্রম ও নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে আমরা বিশ্বমানের উৎপাদক হয়ে উঠেছি।'
প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা
প্রথমে হাতে সেলাই করা ফুটবল উৎপাদন করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফরওয়ার্ড স্পোর্টস থার্মো-বন্ডেড প্রযুক্তি, মেশিন স্টিচিং, ল্যামিনেটেড ফুটবল প্রযুক্তি এবং সর্বশেষ সেন্সরযুক্ত 'ট্রিওন্ডা' বল উৎপাদনে সক্ষম হয়েছে।
আরও পড়ুন: আইফোনের জন্য বন্ধুকে খুন করেছে সায়েল মিয়া
একটি বিশ্বকাপ বল তৈরি করতে সাধারণত তিন থেকে চার বছর সময় লাগে। বলের গোলাকৃতি, স্থায়িত্ব, সেলাইয়ের নিখুঁততা এবং বিভিন্ন আবহাওয়ায় পারফরম্যান্স নিশ্চিত করতে কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।
ফরওয়ার্ড স্পোর্টসের কর্মীদের একটি বড় অংশ নারী। তাদের অবদানকে প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি বলে মনে করেন খাজা মাসুদ আখতার।
নারীদের জন্য পরিবহন সুবিধা, স্বাস্থ্যসেবা এবং উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এখনও ফুটবল তৈরির অনেক ধাপে দক্ষ কারিগরদের হাতে কাজ সম্পন্ন হয়।
আখতার বলেন, 'নারীরা আমাদের সাফল্যের বড় অংশ। সুযোগ ও সম্মান পেলে তারা অসাধারণ ফল দেখাতে পারে।'
আরও পড়ুন: বৃষ্টি বলয়ের দিকে ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে পাকিস্তানের অবস্থান অনেক নিচে এবং দেশটি কখনো বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলতে পারেনি। কিন্তু ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আসরে তাদের অবদান অনন্য।
বিশ্বকাপের ফাইনালে কোনো শিরোপা নির্ধারণী গোল হোক কিংবা টাইব্রেকারের নাটকীয় মুহূর্ত—সবকিছুর কেন্দ্রে থাকবে সিয়ালকোটে তৈরি একটি বল।
এ যেন বিশ্ব ফুটবলের এক অনন্য গল্প—যে দেশ বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায় না, সেই দেশই বিশ্বকাপের প্রতিটি মুহূর্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ তৈরি করে।
আরও পড়ুন: মুশফিক ইনজুরিতে, সিলেট টেস্টে খেলবেন তো?
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন