০৮:৪০ এম
দীর্ঘ ১০ মাসের বিরতির পর আবারও দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের পদচারণা শুরু হয়েছে। নীল সমুদ্র, স্বচ্ছ জলরাশি এবং দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভ্রমণপিপাসুরা ছুটে আসছেন। পর্যটকদের আগমনে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ এবং পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর এই দ্বীপে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি ফিরিয়ে আনার ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
সেন্টমার্টিনের স্বচ্ছ নীল জলরাশি, শান্ত সমুদ্র এবং দিগন্তজোড়া সৌন্দর্য পর্যটকদের মুগ্ধ করছে। ছোট ছোট ঢেউয়ের সঙ্গে উপকূলে ভিড়ছে ডিঙি নৌকা। প্রকৃতির এমন রূপ উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দ্বীপে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য দ্বীপটি উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) চলতি পর্যটন মৌসুমে একটি জাহাজে করে কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিনে পৌঁছান ৮৩০ পর্যটক। প্রায় ছয় ঘণ্টার সমুদ্রযাত্রা শেষে দ্বীপে পৌঁছেই অনেকে এর সৌন্দর্য উপভোগে মেতে ওঠেন। কিছু পর্যটকের কাছে এটি প্রথম সমুদ্র দেখার অভিজ্ঞতা, আবার কারও জন্য নীল জলরাশির মাঝে আনন্দঘন সময় কাটানোর সুযোগ।
আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে মাদক মামলায় নারীসহ ২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
প্রথমবার সমুদ্র দেখতে এসে উচ্ছ্বসিত পর্যটক তামান্না রহমান বলেন, ‘আগে কখনো সমুদ্র দেখা হয়নি। জীবনে প্রথমবার সমুদ্র দেখতে এসেছি। সেন্টমার্টিনের মতো সুন্দর একটি জায়গায় আসতে পেরে আমি ভীষণ আনন্দিত। এটি আমার জন্য এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। তার ওপর প্রথমবার দ্বীপে এসে ফুল উপহার পেয়ে আনন্দটা যেন আরও বেড়ে গেছে।’
পর্যটক ফারাহ খানম মন্তব্য করেন, ‘এখানকার নীল সমুদ্রের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য সত্যিই অসাধারণ। এই সুন্দর পরিবেশে অনেক ছবি তোলার ইচ্ছে রয়েছে। বিশেষ করে সেন্টমার্টিনে বেশি বেশি ছবি তুলব, যাতে এই সুন্দর মুহূর্তগুলো স্মৃতি হিসেবে ধরে রাখতে পারি।’
সমুদ্রের সৌন্দর্যে মুগ্ধ আরেক পর্যটক হাবিব উল্লাহ বলেন, ‘এখানে এসে সবচেয়ে বেশি ভালো লাগছে, সমুদ্রকে এত কাছ থেকে এবং এত সুন্দরভাবে উপভোগ করতে পারব, তা কখনো কল্পনাও করিনি। আমরা খুবই আনন্দিত। পাশাপাশি আমরা সবাই চাই, দ্বীপের এই অপরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশ যেন অক্ষুণ্ন থাকে। তাই পরিবেশ রক্ষায় প্রত্যেকেরই সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত।’
দ্বীপের বাজার ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতেও কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। দীর্ঘ ১০ মাস পর্যটক না থাকায় হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, দোকানপাট এবং পরিবহন খাতে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, পর্যটকদের আগমনে তা কাটতে শুরু করেছে। হোটেলকর্মী, ইজিবাইকচালক, দোকানি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে।
আরও পড়ুন: ঝালকাঠিতে শিশুদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা ক্যাম্প অনুষ্ঠিত
দ্বীপের হোটেল ব্যবসায়ী আলী হোসেন জানান, ‘দীর্ঘ ১০ মাসের প্রতীক্ষার পর আবারও পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে সেন্টমার্টিন। এতে আমাদের ব্যবসায়িক ব্যস্ততা অনেক বেড়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর পর্যটকদের আগমনে আমরা আনন্দিত এবং নতুন করে আশার আলো দেখছি।’
ইজিবাইকচালক রফিক বলেন, ‘এখন পর্যটকদের আগমন শুরু হওয়ায় আমাদের কাজের ব্যস্ততা বাড়বে। পর্যটকের সংখ্যা যত বাড়বে, আমাদের আয়ও তত বাড়বে বলে আশা করছি। দীর্ঘদিন পর পর্যটকদের আগমনে আমরা বেশ আশাবাদী।’
পর্যটকদের সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত খাবার পরিবেশনের চেষ্টা করছেন রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরাও। ব্যবসায়ী শাহাবউদ্দিন বলেন, ‘পর্যটকদের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে আমরা সব সময় আন্তরিকভাবে কাজ করার চেষ্টা করি। খাবারের মান বজায় রাখার পাশাপাশি সাশ্রয়ী মূল্যে ভালো খাবার পরিবেশনের ওপর গুরুত্ব দেব, যাতে পর্যটকেরা স্বাচ্ছন্দ্যে খাবার খেতে পারেন।’
পর্যটকদের সেবা এবং হয়রানিমুক্ত ভ্রমণ নিশ্চিত করার বিষয়েও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা গুরুত্ব দিচ্ছেন। সেন্টমার্টিন দ্বীপের হোটেল-রিসোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি কেফায়েত উল্লাহ বলেন, ‘পর্যটকেরা যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, নির্বিঘ্নে দ্বীপে চলাফেরা করতে পারেন এবং যথাযথ সেবা পান, সে বিষয়ে তারা নজরদারি করছেন। পর্যটকেরা যেন স্বাচ্ছন্দ্যে দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন, সেটিই তাদের প্রত্যাশা।’
আরও পড়ুন: চাঁদা দাবিতে হামলা-ভাঙচুরের পর এজেআর কুরিয়ারের গাড়িতে আগুন
পর্যটকদের আগমনের পাশাপাশি দ্বীপের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কাজ করছে পুলিশ ও কোস্টগার্ড। সেন্টমার্টিন পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মো. সরওয়ার উদ্দিন বলেন, ‘দ্বীপের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেয়ার চেষ্টা করছি। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে দায়িত্ব পালন অব্যাহত থাকবে।’
সেন্টমার্টিন কোস্টগার্ড স্টেশনের স্টেশন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মারুফ আহমেদ সৌখিন জানান, দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ দমন এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় কাজ করছে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড। পর্যটকবাহী জাহাজের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। উচ্চগতিসম্পন্ন বোটের মাধ্যমে নিয়মিত টহল দেয়া হচ্ছে। যাত্রাপথে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি বা দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত সাড়া দিতে কোস্টগার্ডের জাহাজ ও বোট প্রস্তুত রয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে পর্যটক ও যাত্রীদের সহায়তায় কোস্টগার্ড সদস্যরা তৎপর রয়েছেন।
প্রায় আট বর্গকিলোমিটার আয়তনের সেন্টমার্টিন দ্বীপে বসবাস করেন ১১ হাজারের বেশি মানুষ। তাদের বড় একটি অংশের জীবিকা পর্যটননির্ভর। ফলে পর্যটকদের আগমন দ্বীপের মানুষের জন্য অর্থনৈতিক স্বস্তি নিয়ে এসেছে। তবে একই সঙ্গে দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়টিও নতুন করে সামনে এসেছে। পর্যটন, স্থানীয় মানুষের জীবিকা এবং দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
আরও পড়ুন: সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে স্বস্তি ফিরেছে, জনজীবন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন