০৬:২৬ পি.এম
ভূমিহীন ও অসহায় মানুষের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করতে একসময় নির্মাণ করা হয়েছিল গুচ্ছগ্রাম ও আশ্রয়ণ প্রকল্প। উদ্দেশ্য ছিল, আশ্রয়হীন মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেওয়া এবং তাঁদের জীবনমানের উন্নয়ন। কিন্তু নির্মাণের প্রায় ৪০ বছর পেরিয়ে গেলেও অনেক ঘরের সংস্কার হয়নি। ফলে জরাজীর্ণ ঘরে ঝুঁকি নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বাসিন্দারা। কোথাও টিনের চালায় মরিচা ধরেছে, কোথাও ভেঙে গেছে বেড়া, আবার কোনো কোনো ঘরের কাঠামো হেলে পড়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে চলাচলের পাকা রাস্তা ও সড়কবাতির সংকট। শুধু আবাসন নয়, অসহায় মানুষের জন্য বরাদ্দ দেওয়া সরকারি ঘর ও জমি জোরপূর্বক দখল কিংবা হস্তান্তরের অভিযোগও উঠেছে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে।
সরেজমিনে মাদারীপুরের কালকিনি পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চর পাঙ্গাশিয়া গ্রামের গুচ্ছগ্রাম ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ ঘরের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। টিনের চালা ও বেড়া নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় অনেক ঘরই এখন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
বাসিন্দারা জানান, নতুন ঘর কিংবা পুরোনো ঘর সংস্কারের জন্য জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বারবার আবেদন করেও কোনো কার্যকর সমাধান পাননি তাঁরা। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁদের দুর্ভোগ কমেনি। গুচ্ছগ্রামে যাতায়াতের জন্য নেই পর্যাপ্ত পাকা রাস্তা। বর্ষা মৌসুমে কাদাপানিতে চলাচল করতে হয়। অন্যদিকে সড়কবাতি না থাকায় সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে যায়। এতে নারী, শিশু ও বয়স্কদের চলাচলে তৈরি হয় নিরাপত্তাঝুঁকি। স্থানীয়দের দাবি, জেলার অধিকাংশ গুচ্ছগ্রামের চিত্র প্রায় একই রকম।
আরও পড়ুন: কেরানীগঞ্জে দুই খাল খননে অনিয়ম, কোটি টাকার মাটি বিক্রির অভিযোগ
এদিকে সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর ও জমি নিয়েও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। মাত্র ২০ হাজার টাকা ধার পরিশোধ করতে না পারায় কালকিনি পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চর পাঙ্গাশিয়া গ্রামের ফজিলা বেগম নামে এক বৃদ্ধার সরকারি ঘর ও জমি জোরপূর্বক লিখে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ২০১০ সালের ওই ঘটনার পর আশ্রয় হারিয়ে অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোনোরকমে জীবনযাপন করছেন তিনি। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এসব জমি বিক্রয় বা হস্তান্তরযোগ্য না হলেও সমঝোতার মাধ্যমে জমি কেনার দাবি করেছেন অভিযুক্ত আব্দুল হাকিম হাওলাদার। একইভাবে পাশের বাসিন্দা কবিরের ঘর ও জমিও হায়াত নামে আরেক ব্যক্তি কিনে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর জেলার পাঁচটি উপজেলায় মোট ১৫টি গুচ্ছগ্রাম রয়েছে। এসব গুচ্ছগ্রামে বসবাস করছে প্রায় এক হাজার পরিবার। ভূমিহীন ও অসহায় মানুষের আবাসনের জন্য নির্মিত এসব প্রকল্পের ঘর দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সরকারি এই উদ্যোগের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সুবিধাভোগীরা। নিয়মিত তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের।
গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা চম্পা বেগম বলেন, ‘সরকার প্রায় ৪০ বছর আগে আমাদের একটি টিনশেড ঘর দিয়েছিল। সেই ঘর এখন ভেঙে গেছে, বসবাসের উপযোগী নেই। বৃষ্টি হলে ঘরের সবকিছু ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। ঝড় হলে আতঙ্কে থাকতে হয়। আমরা সবাই নতুন ঘর চাই।’
আরেক বাসিন্দা শিপন বালী বলেন, ‘গুচ্ছগ্রামে বিয়ে কিংবা কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই। এ কারণে মেয়েদের ভালো জায়গায় বিয়ে দিতে সমস্যা হয়। ছেলেদের বিয়ের অনুষ্ঠানও ঠিকমতো করা যায় না। সরকার যদি জমিসহ বড় পরিসরে নতুন ঘরের ব্যবস্থা করে, তাহলে আমরা সবাই উপকৃত হব।’
আরও পড়ুন: মিয়ানমারে পাচারের সময় মিরসরাইয়ে ৩০০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ
ভুক্তভোগী ফজিলা বেগমের ছোট ছেলে মো. হান্নান সরদার বলেন, ‘আমার মা ২০ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলেন। সেই টাকা পরিশোধ করতে না পারায় হাকিম হাওলাদার সরকারের দেওয়া আমাদের ঘর ও জমি লিখে নেন। তিনি তখন পৌরসভায় চাকরি করতেন। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে আমাদের শেষ আশ্রয়টুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এখন আমাদের থাকার জায়গা নেই। সরকারের কাছে মায়ের জমি ফেরত চাই এবং এ ঘটনার বিচার চাই।’
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আব্দুল হাকিম হাওলাদার বলেন, ‘আমি টাকা দিয়ে জমি ও ঘর কিনেছি। এ বিষয় নিয়ে এলাকায় একাধিকবার সালিশ-বৈঠকও হয়েছে। পরে আমি কাগজপত্র ঠিক করেছি। ফজিলা বেগমের ঘর বা জমি জোরপূর্বক দখল কিংবা দলিল করে নিইনি।’
এ বিষয়ে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তার বলেন, ‘সরকার ভূমিহীন মানুষের বসবাসের জন্য এসব ঘর ও জমি বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু এসব জমি কখনোই বিক্রয় বা হস্তান্তরযোগ্য নয়। যারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের জমি ফিরিয়ে দেওয়াসহ গুচ্ছগ্রামের সমস্যাগুলো সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
ভূমিহীন মানুষের নিরাপদ আশ্রয়ের স্বপ্ন নিয়ে গড়ে ওঠা গুচ্ছগ্রামগুলো আজ নানা সংকটে জর্জরিত। জরাজীর্ণ ঘর সংস্কার, নতুন আবাসন নির্মাণ, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সরকারি জমি বেদখলমুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগই পারে গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে।
আরও পড়ুন: পিরোজপুরে ইনজেকশন দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই রোগীর মৃত্যু
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন