০৩:১৫ এম
বিশ্বজুড়ে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করতে দেশে দেশে আইন করে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও কড়াকড়ি আরোপের হিড়িক পড়েছে। বিভিন্ন দেশের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, কানাডা, স্পেনসহ ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যেই বয়স কিংবা ক্লাস ভেদে সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ বা ‘কারফিউ’ জারির পথে অগ্রসর হয়েছে। ইন্টারনেটের নেতিবাচক প্রভাব থেকে নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করতে এবং তাদের স্বাভাবিক ঘুম ও পড়াশোনায় মনোযোগ ফিরিয়ে আনতেই সরকারগুলো এই কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। তবে এই নিষেধাজ্ঞার সুফলের পাশাপাশি, প্রযুক্তির ফাঁকফোকর গলে এর কার্যকারিতা ও ভিপিএন (VPN) ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্কও চলছে।
কেন এই কঠোর নিষেধাজ্ঞা? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বিভিন্ন দেশের সমাজবিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রলিংয়ের কারণে কিশোর-কিশোরীদের মাঝে বিষণ্ণতা, অনিদ্রা, সাইবার বুলিং এবং পড়াশোনায় মনোযোগহীনতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে ‘ইনফিনিট স্ক্রল’ (টানা স্ক্রল করার ফিচার) এবং ‘অটো-প্লে’ ভিডিওর মতো আসক্তিমূলক ফিচারের ফাঁদে পড়ে কিশোর বয়সীরা রাতের পর রাত জেগে থাকছে। এই পরিস্থিতিকে একটি ‘মানসিক স্বাস্থ্য মহামারি’ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। মূলত এই আসক্তি থেকে তরুণদের বের করে এনে মাঠের খেলাধুলা, পড়াশোনা এবং পারিবারিক বন্ধনে ফিরিয়ে আনাই এই আইনগুলোর মূল লক্ষ্য।
পড়াশোনা ও মনোযোগে ইতিবাচক প্রভাব ইউনেস্কো (UNESCO) এবং বিভিন্ন শিক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যেসব স্কুল বা অঞ্চলে সোশ্যাল মিডিয়া ও স্মার্টফোন ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, সেখানে শিক্ষার্থীদের একাগ্রতা বা মনোযোগের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। বিশেষ করে শ্রেণিকক্ষে ডিজিটাল ডিভাইসের অনুপস্থিতি পরীক্ষার ফল ভালো করতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে। নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড ও ফ্রান্সের স্কুলগুলোতে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার পর ক্লাসরুমের শৃঙ্খলা ও শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক যোগাযোগ আগের চেয়ে বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া ব্লক করার চেয়ে রাতের বেলা ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখার ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পর পর্যাপ্ত ঘুমাতে পারছে, যা তাদের পরদিনের ক্লাসে পারফরম্যান্স অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।
আরও পড়ুন: ঢাকায় জরুরি অবতরণে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের দরজা খুলে গেল, রোগীর মৃত্যু
বিশ্বজুড়ে নিষেধাজ্ঞার মানচিত্র ও বর্তমান পরিস্থিতি বিভিন্ন দেশে বয়স ও ক্লাস ভেদে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা নিচে তুলে ধরা হলো: অস্ট্রেলিয়া: বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করে আইন পাস করেছে। এর প্রভাবে প্রাথমিকভাবে পারিবারিক যোগাযোগ বৃদ্ধি ও রাতে স্ক্রিন টাইম কমার লক্ষণ দেখা গেছে।
যুক্তরাজ্য: অতি সম্প্রতি ২০২৬ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাজ্য সরকার ১৬ ও ১৭ বছর বয়সীদের জন্য রাত ১২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়া ‘কারফিউ’ বা সান্ধ্য আইন জারির ঘোষণা দিয়েছে। সরকারের এক মাসব্যাপী গবেষণায় দেখা গেছে, রাতের এই কারফিউ কিশোর-কিশোরীদের ঘুমের মান উন্নত করতে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী।
কানাডা ও নেদারল্যান্ডস: কানাডার ওন্টারিও ও ব্রিটিশ কলম্বিয়াসহ বেশ কয়েকটি বড় প্রদেশ এবং নেদারল্যান্ডস ইতিমধ্যেই স্কুলগুলোতে সোশ্যাল মিডিয়া এবং ব্যক্তিগত ফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে।
স্পেন ও ফ্রান্স: ইউরোপের দেশ স্পেন সম্প্রতি ১৪ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য আইন প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে। আর ফ্রান্স সরাসরি স্কুল প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীদের ফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে পড়াশোনার পরিবেশ ফিরিয়ে এনেছে।
আরও পড়ুন: গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধের আদেশ স্থগিত
যুক্তরাষ্ট্র: আমেরিকার ফ্লোরিডা এবং ইউটাহসহ বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ১৪ থেকে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খোলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এশিয়ার দেশগুলোতে কী পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ আভাস? পশ্চিমা বিশ্বের এই ‘ডিজিটাল লকডাউন’ বা সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞার ঢেউ এশিয়ায়ও আছড়ে পড়তে শুরু করেছে।
চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া: চীন ইতিমধ্যেই অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য 'অ্যান্টি-অ্যাডিকশন' বা আসক্তি-বিরোধী সিস্টেম চালু করেছে, যেখানে নির্দিষ্ট সময়ের পর গেম বা সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক হয়ে যায়। দক্ষিণ কোরিয়াও সাইবার বুলিং ঠেকাতে কঠোর আইন ও বয়স যাচাই প্রক্রিয়া জোরদার করেছে।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া: বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এখনো প্রাতিষ্ঠানিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের নির্দিষ্ট বয়সসীমা বেঁধে দিয়ে আইন কার্যকর করা হয়নি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অঞ্চলে কিশোর অপরাধ (যেমন গ্যাং কালচার), সাইবার ক্রাইম এবং পড়াশোনা থেকে শিক্ষার্থীদের দূরে সরে যাওয়ার পেছনে সোশ্যাল মিডিয়ার বড় ভূমিকা রয়েছে। ফলस्वরূপ ২০২৬ বা তার পরবর্তী সময়ে এশিয়ার দেশগুলোতেও স্কুল পর্যায়ে ফোন নিষিদ্ধ করা কিংবা নির্দিষ্ট বয়সের নিচে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে কঠোর রাষ্ট্রীয় নীতিমালা বা ডিজিটাল অভিভাবকত্ব আইনের জোরালো তাগিদ তৈরি হচ্ছে।
আরও পড়ুন: পাট খাতের উন্নয়নে অর্থের চেয়ে চীনের প্রযুক্তি বেশি প্রয়োজন: পাটমন্ত্রী
নিষেধাজ্ঞা বনাম কার্যকারিতার এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত আইন কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বয়স যাচাইয়ের নিখুঁত প্রযুক্তি এবং পরিবারের সচেতনতার ওপর।
তথ্যসূত্র: বিবিসি নিউজ, রয়টার্স এবং বিভিন্ন গণমাধ্যম
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন