০৫:১৯ পি.এম
তর্কসাপেক্ষে লিওনেল মেসি ফুটবলের সর্বকালের সেরা। তার জাদুতেই ঘুচেছে আর্জেন্টিনার ৩৬ বছরের দীর্ঘ বিশ্বকাপখরা। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জিতিয়ে ক্যারিয়ারের একমাত্র অপ্রাপ্তি ঘুচিয়েছেন এই মহাতারকা। পাশাপাশি তিনি দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে খেলেছেন তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল।
আর্জেন্টিনাকে সাফল্যের মুকুট এনে দেয়া মেসির এই কাহিনির কিছুটা এদিক এদিক হলে ব্রাজিল উপকৃত হতে পারতো। হয়তো মেসির হাত ধরেই সেলেসাওদের দীর্ঘ শিরোপাখরাও ঘুচত। মেসি আর্জেন্টিনার পরিবর্তে ব্রাজিলের জার্সি গায়ে চাপালে ফুটবল ইতিহাসটাও সম্ভবত ভিন্নরূপে গড়ে উঠতো।
আলবিসেলেস্তেদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুই তারকার একজন লিওনেল মেসির শেকড় নাকি বিস্তৃত ব্রাজিলেও। আরও সঠিকভাবে বললে সেটি দেশের সাও পাওলো রাজ্যের অন্তর্গত অঞ্চলে। বিষয়টি হয়তো কিছুটা কাকতালীয় মনে হবে, কিন্তু একজন ইতালীয় গবেষকের অনুসন্ধানে এমন তথ্য উঠে এসেছে। তিনি দাবি করেছেন যে, এই মহাতারকার এক প্রপিতামহ বিশ শতকের শুরুর দশকে রিবেরাও প্রেতোতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
আরও পড়ুন: যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাই সন্দেহে গণপিটুনিতে আহত যুবক নিশাত মিয়ার মৃত্যু
পেশায় ব্যাংকার এবং ইতিহাসবিদ ফিওরেনজো সান্তিনি আর্জেন্টাইন তারকার বংশলতিকা বা ফ্যামিলি ট্রি অনুসন্ধানের কাজটি করেন।
যখন মেসি তরুণ বয়সে বার্সেলোনায় নিজের প্রতিভার পরিচয় দিতে শুরু করেন, তখনই সান্তিনির মনে এই ধারনা আসে। ফুটবলপ্রেমী এবং ইন্টার মিলানের কট্টর সমর্থক ফিওরেনজো 'মেসি' পদবিটির উৎস খুঁজতে কৌতুহলী হয়ে ওঠেন।
এতে তিনি এর ইতালীয় সংযোগ আবিষ্কার করেন। মেসির প্রপিতামহ আঞ্জেলো মেসি ইতালির মার্কে অঞ্চলের মাসেরাটা প্রদেশের রেকানাত শহর থেকে এসেছিলেন। ১৮৯৩ সালে তিনি স্ত্রীসহ ইতালি ছেড়ে আর্জেন্টিনার রোসারিওতে পাড়ি জমান।
গবেষক জানান, 'আমি ২০১৫ সালে তার (মেসির) বাবার সাথে যোগাযোগ করি এবং এই ইতিহাস জানাই। কয়েক বছর পর তার বাবা আবার আমার সাথে যোগাযোগ করেন যেন আমি তার মায়ের দিকের বংশলতিকা খুঁজে বের করি, যাতে তারা ইতালির নাগরিকত্ব পেতে পারেন।'
আরও পড়ুন: গণভোটের রায় না মানলে তারেক রহমানের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই: জুনায়েদ
ফিওরেনজো সান্তিনির দাবি, মেসির মাতুলালয়ের অনুসন্ধানের শুরু তার প্রপিতামহ রানিয়েরো কোচেত্তিনির মাধ্যমে হয়েছিল, যিনি মেসির পিতৃপক্ষের পরিবারের মতো একই প্রদেশ অর্থাৎ সান সেভেরিনো মার্কেতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
মেসির পরিবারের পাশাপাশি একই অঞ্চলের আশেপাশের মাত্র কয়েক কিমি দূরে আর্জেন্টিনা ফুটবলের জাতীয় দলের কোচ লিওনেল স্কালোনি, সাবেক বাস্কেটবল খেলোয়াড় মানু জিনোবিলি এবং দেশের প্রেসিডেন্ট হাভিয়ার মিলেইয়ের পূর্বপুরুষদের শেকড়ের প্রমাণও মেলে।
সান্তিনি বলেন, 'গ্রামগুলো খুব কাছাকাছি, মাসেরাটা প্রদেশের একই এলাকায় প্রায় ২০ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত।'
রানিয়েরো ইতালিতে থাকার সময় রোসা রিকেজাকে বিয়ে করেন এবং তাদের ঘরে জুলিয়া ও ফ্রান্সেসকো নামের দুই সন্তান হয়। সাঁও পাওলোর 'ইমিগ্রেশন মিউজিয়াম অব দ্য স্টেট'-এর ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, এই পরিবারটি 'ওয়াশিংটন' নামের জাহাজে চেপে ব্রাজিলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে এবং ১৮৯৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সাও পাওলোর সান্তোস বন্দরে অবতরণ করে।
আরও পড়ুন: বিয়ের ১৫ দিনের মাথায় সড়কে প্রাণ গেল ইতালি প্রবাসী তানভীরের
তবে বন্দরে পৌঁছানোর পর রানিয়েরো কোচেত্তিনির নাম পরিবর্তন হয়ে 'রামিয়োরো কনসেন্টিনী' হয়ে যায়। সে সময় মূল ভাষার বানান ও উচ্চারণের জটিলতার কারণে অভিবাসীদের নাম ও পদবি পরিবর্তনের বিষয়টি সাধারণ ছিল।
জাদুঘরের ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, রানিয়েরো (বর্তমানে রামিয়োরো) পেশায় একজন কৃষক ছিলেন। তিনি রিবেরাও প্রেতো থেকে ৭০ কিমিরও বেশি দূরবর্তী রিনকাও এলাকায় ড. মার্টিনহো প্রাডো জুনিয়রের একটি খামারে কাজের জন্য নিয়োগ লাভ করেন।
পরিবারটি সাও পাওলো রাজ্যের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে চলে আসে। সান সেভেরিনো মার্কে পৌরসভার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রিবেরাওতে রামিয়োরো এবং রোসা দম্পতির ঘরে আরও দুটি সন্তানের জন্ম হয়। ১৯০০ সালের ১ জানুয়ারি এরমিনিয়া এবং ১৯০৪ সালের ২৭ জানুয়ারি আর্দেরিগো জন্মগ্রহণ করে।
এই আর্দেরিগোর মাধ্যমেই লিওনেল মেসির পদবিতে পরিবর্তন আসে। গবেষক বলছেন, রিবেরাও প্রেতোতে নাম নিবন্ধনের সময় এই পরিবর্তনটি ঘটে।
আরও পড়ুন: হাসিনার পতনের আগে ইউনূসকে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান করেন শফিকুল আলম
তিনি ব্যাখ্যা করেন, 'ব্রাজিলে এসে আর্দেরিগো হয়ে যান ফেদেরিকো। আর কোচেত্তিনি পরিবর্তিত হয়ে হয় কুচিতিনী। এই ফেদেরিকোই হলেন মেসির প্রপিতামহ (নানা)।'
ফেদেরিকোর জন্মের এক বছর পর পুরো পরিবার আর্জেন্টিনায় স্থানান্তরিত হয়। ১৯০৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তারা সেখানে পৌঁছান এবং রোসারিও অঞ্চলে চলে যান। এখানেই জন্ম নেন ফুটবলারের মাতামহ আন্তোনিও কুচিতিনী এবং মা সেলিয়া মারিয়া কুচিতিনী। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন জন্ম নেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচিতিনী।
মূলত 'কুচিতিনী' পদবিটিই গবেষককে ব্রাজিলের সাথে সংযোগটি খুঁজে পেতে সহায়তা করেছিল, কারণ ইতালিতে এই পদবির কোনো অস্তিত্ব বা রেকর্ড ছিল না। ফিওরেনজো ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত মেসির মায়ের দিকের ফ্যামিলি ট্রির অনুসন্ধানে সময় ব্যয় করেন।
তিনি বলেন, 'গবেষণার সময় আমি দেখি যে এখানে 'কুচিতিনী' নামে কেউ নেই। পরে মেসির মায়ের এক খালাতো/মামাতো ভাইয়ের কাছ থেকে কিছু নথি পাওয়ার পর বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট হয়, যিনি ব্রাজিলে পৌছানোর পর নাম ও পদবি পরিবর্তনের বিষয়টি আমাকে জানান।'
আরও পড়ুন: ভোটার এলাকা পরিবর্তনের আবেদন সময়সীমা ১ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়াল ইসি
ফিওরেনজোর এই গবেষণার ওপর ভিত্তি করে ২০২২ সালে ইতালির সান সেভেরিনো মার্কে শহর মেসিকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রদান করে।
আজ রিবেরাও প্রেতোতে মেসির পরিবারের কোনো সদস্যের বসবাসের তথ্য নেই, কারণ তারা সবাই ১৯০৫ সালেই আর্জেন্টিনায় চলে গিয়েছিলেন।
তবে শহরটির সাথে তার ইতিহাসের একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন হয়ে রয়েছে 'ভিলা তিবেরিও' পাড়ার একটি রাস্তা। মজার বিষয় হলো, এই পাড়াতেই শহরের অন্যতম ফুটবল ক্লাব 'বোটাফোগো-এসপি' প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
পাড়ার এই রাস্তাটির নাম 'রুয়া মার্টিনিকো প্রাডো', যা রাখা হয়েছে সেই কৃষকের স্মরণে, যিনি এই তারকা খেলোয়াড়ের পূর্বপুরুষদের আশ্রয় দিয়েছিলেন।
আরও পড়ুন: রাজউকের ১২৬৯ ভবনের মালিককে চূড়ান্ত নোটিশ, নির্দেশনা না মানলে আইনানুগ ব্যবস্থা
মার্টিনহো প্রাডো জুনিয়র বা 'মার্টিনিকো প্রাডো' নামে পরিচিত এই ব্যক্তি কৃষিকাজের পাশাপাশি ব্রাজিলের একজন রাজনীতিবিদও ছিলেন। তাঁর বাবা-মা লিমিরা এবং পরে আরারাসের একটি খামারে থাকতেন। কিন্তু তিনি তার দাদা-দাদীর সাথে সাও পাওলোতে থাকতেন, যেখান থেকে তিনি আইনে স্নাতক অর্জন করেন, একটি সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং এমনকি প্যারাগুয়ে যুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন।
বিয়ের পর তিনি রাজ্যের ভেতরের অঞ্চলে চলে যান এবং তাদের পারিবারিক খামারগুলো পরিচালনা করতে শুরু করেন। তিনি আরারাসের সিটি কাউন্সিলর এবং স্টেট রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
রিবেরাও প্রেতো অঞ্চলটি উন্মোচিত হওয়ার পর তিনি সেখানে জমি কিনে খামার গড়ে তোলেন। এই অঞ্চলটি কফি উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ হওয়ায় তিনি ও তার ভাই মিলে বিশ্বের সর্ববৃহৎ কফি উৎপাদক হয়ে ওঠেন এবং ইউরোপীয় রাজাদেরও আতিথ্য প্রদান করেন। সান্তোস বন্দরের কাছে প্রাডোর নিজস্ব রপ্তানি প্রতিষ্ঠানও ছিল, যা তার কফি ব্যবসাকে সহজ করে তুলেছিল।
মেসির ইতালীয় পরিবার সাও পাওলো থেকে আর্জেন্টিনায় পাড়ি দেওয়ার এক বছর পর, ১৯০৬ সালে মার্টিনিকো প্রাডো মৃত্যুবরণ করেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন