০৯:৪৪ পি.এম
এতে এখন শুধু ছাত্র-ছাত্রীরাই নয়, বরং পুরো ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি তথা দক্ষিণ ভারতের তামিল সিনেমা ও ভারতের বলিউডের অভিনেতা অভিনেত্রীগণ, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ, সোস্যাল এক্টিভিস্ট এবং এলিট ক্লাসের লোকজন থেকে শুরু করে পুলিশের বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, সাবেক সামরিক বাহিনীর সদস্য ছাড়াও বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণীর মানুষের সাথে লক্ষ লক্ষ সাধারণ নাগরিকও অংশগ্রহণ করছেন এবং আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকা ও সরকারের অবস্থান ঠিক যেন বাংলাদেশের ২৪ এর জুলাই বিপ্লবের মতোই একই পথে গড়াচ্ছে।
ছাত্রদের অনড় দাবির মুখে ভারত সরকার নমনীয় মনোভাব না দেখিয়ে শক্তি প্রয়োগ করে বিক্ষোভ দমন করতে চাচ্ছে। এতে করে ছাত্রদের উপর পুলিশের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, জল কামান এমনকি গুলি করতেও দেখা গেছে। এতে করে অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী আহত হচ্ছে। একারণে এই বিক্ষোভ দুর্বল না হয়ে যেন আগ্নেয়গিরির লাভার মত আজ গোটা ভারতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। ছাত্রদের আন্দোলনের সুশৃংখল পদ্ধতি, একটার পর একটা নতুন দাবি কিংবা অনেক দাবির পর অল্প দাবি, তারপর অবশেষে কি বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের মতো এক দফা সরকার পতনের আন্দোলনের মতোই পরিণত হবে? নরেন্দ্র মোদির পরিণতিও কি শেখ হাসিনার মত সেদিকেই যাচ্ছে?
রাজনীতির ইতিহাসে ছাত্রসমাজ বহুবার এমন এক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যারা ক্ষমতার অলিন্দে বসে থাকা শাসকদের মনে প্রথম অস্বস্তির সঞ্চার করেছে। তাদের হাতে অস্ত্র থাকে না, কিন্তু থাকে প্রশ্ন; থাকে প্রতিবাদের ভাষা; থাকে ভবিষ্যৎকে নতুন করে কল্পনা করার সাহস।
বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলন দেখিয়েছিল, একটি ছাত্রনির্ভর আন্দোলন কীভাবে ধাপে ধাপে নিজেদের দাবি সংগঠিত করতে পারে। প্রথমে নির্দিষ্ট ইস্যু, তারপর জনসম্পৃক্ততা, এরপর বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্ন—এভাবেই আন্দোলনের পরিধি বিস্তৃত হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ভারতের সাম্প্রতিক বিভিন্ন ছাত্রবিক্ষোভ ও তরুণদের সংগঠিত হওয়ার প্রচেষ্টাকে ঘিরেও এখন তুলনামূলক আলোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক সংগঠন, দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য, সমন্বিত কর্মসূচি এবং ধাপে ধাপে আন্দোলন বিস্তারের কৌশল—এসব কারণে অনেকে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল খুঁজছেন। তবে দুই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, সাংবিধানিক কাঠামো, দলীয় শক্তির ভারসাম্য এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট এক নয়; তাই সরল সমীকরণ টানা সহজ নয়।
তবু একটি বিষয় স্পষ্ট—যখন কোনো রাষ্ট্রে তরুণদের বড় একটি অংশ মনে করে যে তাদের কণ্ঠ যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না, তখন আন্দোলন কেবল একটি দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা ধীরে ধীরে আস্থা, জবাবদিহি এবং শাসনব্যবস্থার বৈধতা নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্নে রূপ নিতে পারে।
ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিও সেই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে দেশটিকে। ছাত্রদের অসন্তোষ কত দূর যাবে, তাদের দাবি কীভাবে রূপান্তরিত হবে, কিংবা তা শেষ পর্যন্ত জাতীয় রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে—এসব প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে।
ইতিহাস অবশ্য একটি শিক্ষা বারবার দেয়: কোনো সরকার শুধু প্রশাসনিক শক্তির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘদিন জনমতের সংকট মোকাবিলা করতে পারে না। আবার এটিও সত্য যে প্রতিটি আন্দোলনের গতিপথ ভিন্ন, এবং কোনো দেশের অভিজ্ঞতা হুবহু আরেক দেশে পুনরাবৃত্তি হয় এমন টা বলা যাবে না, তবে ভারতের ছাত্র জনতার আন্দোলন বাংলাদেশের চেয়েও দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে।
তাই আজকের বড় প্রশ্নটি হয়তো এটি নয় যে, ইতিহাস নিজেকে অবিকল পুনরাবৃত্তি করবে কি না; বরং প্রশ্ন হলো, ভারতের ছাত্রসমাজ যে নতুন রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করছে, সেটি কি দেশটির গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে? উত্তর ভবিষ্যতের হাতে, কিন্তু সেই ভবিষ্যতের বীজ যে বর্তমানের প্রতিবাদে রোপিত হচ্ছে—তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই,-ভারতের বর্তমান আন্দোলনের উত্তাল ও বিষ্ফোরণ্মুখ পরিস্থিতি দেখে এমন কথা বলা মনে হয় অমূলক হবে না।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন