বৃহস্পতিবার, ৫ই নভেম্বর, ২০২৬ ইং
০৩:৫২ পি.এম
বরিশাল মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন, পরিবেশ উন্নয়ন ও নান্দনিক নগর গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে ৭৩০ কোটি টাকার একটি বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
এ প্রকল্পের আওতায় নগরীর ৩০টি খাল ও ১০টি পুকুর পুনঃখনন ও সংস্কার করা হবে, পাশাপাশি ১৯টি ঘাটলা নির্মাণ এবং ৫৭ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণের কাজও সম্পন্ন হবে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ‘বরিশাল সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন খালের পাড় সংরক্ষণসহ পুনরুদ্ধার ও পুনঃখনন প্রকল্প’টির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
এ প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৯০ শতাংশ সরকার বহন করবে এবং অবশিষ্ট ১০ শতাংশ, অর্থাৎ ৭৩ কোটি টাকা বরিশাল সিটি করপোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে খরচ করা হবে।
প্রকল্পটি অনুমোদনের খবর পেয়ে বরিশাল নগরবাসীর মধ্যে আনন্দ ও আশার সঞ্চার হয়েছে।
বরিশাল নাগরিক সমাজ ও সচেতন নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব ডা. মিজানুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, "দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং খাল-পুকুরের নাব্যতা ও পরিবেশগত সংকট নিরসনে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।" তিনি আরও বলেন, "এটি বরিশালের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের পথও সুগম করবে।"
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পের আওতায় মহানগরীর ৩০টি খাল পুনঃখনন ও সংস্কারের পাশাপাশি খালের পাড় সংরক্ষণ, সৌন্দর্যবর্ধন এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি খালের দুই পাশে ওয়াকওয়ে নির্মাণ, বৃক্ষরোপণ ও নান্দনিক আলোকসজ্জার পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া কীর্তনখোলা নদী থেকে খালগুলোতে জোয়ার-ভাটার পানি চলাচল এবং পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্যোগও নেওয়া হবে।
নগরীর ১০টি পুকুর ও লেক পুনঃখনন, পাড় সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ এবং টেকসই আলোকসজ্জার মাধ্যমে সৌন্দর্যবর্ধন করা হবে। সম্ভাব্য স্থানগুলোতে প্রচলিত বৈদ্যুতিক বাতির পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎচালিত বাতি স্থাপনের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
এ প্রকল্পের আওতায় নবগ্রাম রোডের চৌমাথা লেক, গোল পুকুর, ত্রিশ গোডাউন সংলগ্ন বধ্যভূমি সংলগ্ন পুকুর, গড়িয়ার পাড়ের ত্রিকোণ পুকুর ও আমানতগঞ্জ পুকুরসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি পুকুর সংস্কার করা হবে।
এছাড়া জনগুরুত্বপূর্ণ পুকুরগুলোতে বাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ১৯টি নান্দনিক ঘাটলা নির্মাণ করা হবে। বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী মো. হুমায়ুন কবির জানান, "এসব ঘাটলা নির্মাণের মাধ্যমে পুকুরগুলোকে জনসাধারণের ব্যবহার উপযোগী করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।"
এই উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নগরীর ৫৭ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কার করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, এসব কাজ সম্পন্ন হলে বরিশাল নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
উল্লেখ্য, ২০০২ সালে বরিশাল সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর ২০০৫-০৬ অর্থবছরে নগরীর অবকাঠামো উন্নয়নে ২শ’ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালের নভেম্বরে ৭শ’ ৮০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়। নতুন ৭শ’ ৩০ কোটি টাকার প্রকল্পটি বরিশাল মহানগরীর উন্নয়নে অন্যতম বৃহৎ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের নগর প্রশাসক অ্যাড. বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য।
তিনি বলেন, "আমরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে কৃতজ্ঞ, তিনি বরিশাল মহানগরীর উন্নয়নে এ প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়েছেন।" তিনি আরও উল্লেখ করেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বরিশাল জেলাকে নিজের জেলা মনে করতেন এবং তার যোগ্য উত্তরসূরি বেগম খালেদা জিয়া বরিশালের উন্নয়নে আন্তরিক ছিলেন।
তিনি বলেন, "জিয়া পরিবারের আরেক সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বরিশালের উন্নয়নে তার আন্তরিকতার স্বাক্ষর রাখলেন।" প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বরিশালের নগরজীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদে বরিশাল মহানগরীসহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে আরও ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
জামালপুরের বকশীগঞ্জে দশানী নদীর ভাঙন থেকে বালুগ্রামকে রক্ষার জন্য দশানী ব্রিজের নিচে জমে থাকা বালুচর পুনঃখনন করে নদীর গতিপথ পুনঃরুদ্ধারের দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এ মানববন্ধনটি এলাকাবাসীর উদ্যোগে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুর ১২ টার দিকে উপজেলা সাধুরপাড়া ইউনিয়নের বালুরগ্রাম এলাকায় অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন আব্দুস ছামাদ, জুব্বার আলী, শাহীনুর রহমানসহ আরো অনেক বক্তা।
বক্তারা এসময় বলেন, "কয়েক বছর ধরে বকশীগঞ্জ উপজেলার সাধুরপাড়া ইউনিয়নের বালুরগ্রাম সংলগ্ন দশানী নদীর তীব্র ভাঙনের ফলে ফসলি জমি, ঘর বাড়ি বিলীন হচ্ছে।"
তারা আরও উল্লেখ করেন, ভাঙনের কারণে দশানী নদীর ওপর নির্মিত দশানী ব্রিজটি হুমকির মুখে পড়েছে। দশানী নদীর ভাঙনের ফলে ব্রিজের নিচের পশ্চিম পাশে বালু জমে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে নদীর পূর্ব পাশ দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ার ফলে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে করে স্থানীয়দের মাঝে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
তাহলে, বালুরগ্রামকে রক্ষার জন্য অবিলম্বে দশানী নদীর পশ্চিম কিনারায় জমে থাকা বালু খনন করে নদীর গতিপথ পুনঃরুদ্ধার করতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
পটুয়াখালীর সাগরকন্যা কুয়াকাটা আন্তর্জাতিক সমুদ্র সৈকতে রূপান্তরিত করার জন্য আমাদের সকলের প্রচেষ্টা প্রয়োজন। পরিচ্ছন্ন সৈকত এই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই লক্ষ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর, পটুয়াখালী আজ কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত পরিচ্ছন্ন করার উদ্যোগ নিয়েছে। সহকারী পরিচালক লোভানা জামিল জানিয়েছেন, জিরো পয়েন্টে পরিচ্ছন্নতার স্লোগান সম্বলিত সাইনবোর্ড এবং ডাস্টবিন স্থাপন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকাল ১১ টার দিকে এই কার্যক্রমে ট্যুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা জোনের সদস্যরা, ট্যুর অপারেটরস এসোসিয়েশন অব কুয়াকাটা (টোয়াক), স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ধুমকেতু, উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন, কুয়াকাটা (উপরা), এ্যনিমেল লাভার্স অফ পটুয়াখালী এবং ছাত্রদলসহ প্রায় শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক অংশগ্রহণ করেন।
কুয়াকাটা সৈকতের জিরো পয়েন্ট থেকে পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় আধা কিলোমিটার সৈকত পরিচ্ছন্নতা অভিযান শেষে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে সৈকতকে পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বান জানানো হয়।
এসময় উপস্থিত ছিলেন কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো ইয়াসীন সাদেক, ট্যুর অপারেটরস এসোসিয়েশন অব কুয়াকাটা (টোয়াক) সেক্রেটারি জেনারেল আসাদুজ্জামান মিরাজ, উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন, কুয়াকাটা (উপরা) এর আহ্বায়ক কেএম বাচ্চু, কুয়াকাটা পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব নেছার উদ্দিন হাওলাদার এবং কুয়াকাটা ট্যুর গাইড এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শামিম রেজা।
কুয়াকাটা ট্যুর গাইড এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শামিম রেজা মন্তব্য করেন, পরিচ্ছন্ন কুয়াকাটা গড়ে তোলার জন্য তরুণ সমাজকে দল-মত নির্বিশেষে এগিয়ে আসতে হবে। এটি কেবল এক দিনের অভিযান নয়, বরং নিয়মিতভাবে সৈকত পরিষ্কার রাখা এবং ময়লা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। এই কাজে সহযোগিতা করতে আমরা সব সময় প্রস্তুত।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটা (টোয়াক)-এর সেক্রেটারি জেনারেল আসাদুজ্জামান মিরাজ বলেন, কুয়াকাটা পর্যটনশিল্পের প্রধান আকর্ষণ এর সমুদ্র সৈকত। সৈকত অপরিচ্ছন্ন থাকলে এটি পর্যটকদের কাছে নেতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেয়। পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সকলকে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে এবং পর্যটকদেরও যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলার বিষয়ে সচেতন করতে হবে।
কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক মো ইয়াসীন সাদেক বলেন, কুয়াকাটাকে পরিচ্ছন্ন ও পর্যটকবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে পৌরসভার পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। তবে এটি শুধুমাত্র পৌরসভার একার পক্ষে সম্ভব নয়। স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, পর্যটক এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো সম্মিলিতভাবে কাজ করলে পরিচ্ছন্ন কুয়াকাটা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
উনিশ ও বিশ শতকের সময়, পাশ্চাত্যের উপনিবেশবাদী আগ্রাসনের পাশাপাশি প্রাচ্যের ইতিহাস, ধর্ম ও সংস্কৃতিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা গড়ে ওঠে, যা ওরিয়েন্টালিজম বা প্রাচ্যবাদ নামে পরিচিত। এই ধারার অনেক গবেষক মহানবী (সা.)-এর জীবন, রিসালাত, পবিত্র কোরআনের ঐশী উৎস এবং ইসলামের ইতিহাস নিয়ে নানা সংশয় ও বিতর্ক সৃষ্টি করেন। উল্লেখযোগ্য গবেষকদের মধ্যে উইলিয়াম মূর, ডি. এস. মারগোলিউথ ও মন্টগোমারি ওয়াট রয়েছেন। পরে এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর বিখ্যাত ‘ওরিয়েন্টালিজম’ গ্রন্থে প্রাচ্যবাদী চিন্তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি বিশ্লেষণ করেন। তবে ইসলামের মূল উৎস, ঐতিহাসিক দলিল ও আধুনিক গবেষণাপদ্ধতির আলোকে এসব আপত্তির প্রামাণ্য জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে যাঁরা অসামান্য অবদান রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন বাংলাদেশের কৃতী ইতিহাসবিদ ড. মুহাম্মদ মোহর আলী (১৯২৯–২০০৭)।
১৯২৯ সালে অবিভক্ত বাংলার খুলনায় জন্মগ্রহণ করেন ড. মুহাম্মদ মোহর আলী। শৈশবে পিতৃবিয়োগের পর হুগলী মাদরাসায় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক দ্বীনি শিক্ষার সূচনা হয়। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর যশোর, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর বিভিন্ন সরকারি কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ (SOAS)-এ পিএইচডি গবেষণার মাধ্যমে। পাশাপাশি তিনি লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টারি সম্পন্ন করেন। ফলে ইসলামী জ্ঞানের পাশাপাশি পাশ্চাত্যের আধুনিক ইতিহাসচর্চা, গবেষণাপদ্ধতি, সূত্র-সমালোচনা ও যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে প্রাচ্যবাদীদের গবেষণার জবাব দিতে এই জ্ঞান ও দক্ষতাই তাঁর প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
পরবর্তীকালে তিনি সৌদি আরবে পাড়ি জমান এবং রিয়াদের ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সাউদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় ও মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেন। পাশাপাশি পবিত্র কোরআন মুদ্রণের বাদশাহ ফাহাদ কমপ্লেক্সে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর গবেষণা ও জ্ঞানসাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০০ সালে তিনি ইসলামি অধ্যয়নে মর্যাদাপূর্ণ কিং ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন।
প্রাচ্যবাদের বিরুদ্ধে কালজয়ী গবেষণা
ড. মুহাম্মদ মোহর আলীর সবচেয়ে আলোচিত গবেষণাগ্রন্থ ‘সীরাতুন নাবী অ্যান্ড দি ওরিয়েন্টালিস্টস’। এই গ্রন্থে তিনি উইলিয়াম মূর, ডি. এস. মারগোলিউথ ও মন্টগোমারি ওয়াটের মতো প্রাচ্যবাদী গবেষকদের বক্তব্য গভীরভাবে পর্যালোচনা করেছেন। মহানবী (সা.)-এর পারিবারিক জীবন, শৈশব, যৌবন, নবুয়তপ্রাপ্তি ও রিসালাত নিয়ে তাঁদের উত্থাপিত বিভিন্ন আপত্তি ও তত্ত্বের জবাবে তিনি প্রাচীন ঐতিহাসিক সূত্র, নির্ভরযোগ্য দলিল এবং যুক্তিনিষ্ঠ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। তাঁর গবেষণার বিশেষত্ব হলো, আবেগনির্ভর প্রতিবাদের পরিবর্তে প্রাচ্যবাদীদের নিজস্ব গবেষণাপদ্ধতি ও একাডেমিক মানদণ্ড ব্যবহার করে তাঁদের বক্তব্যের অসংগতি তুলে ধরা।
তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘দ্য কোরআন অ্যান্ড দি ওরিয়েন্টালিস্টস: অ্যান এগজামিনেশন অব দেয়ার মেইন থিওরিজ অ্যান্ড অ্যাসাম্পশনস’। এতে পবিত্র কোরআনের উৎস, সংকলন, ভাষাগত বৈশিষ্ট্য ও ঐশী পরিচয় নিয়ে প্রাচ্যবাদীদের উত্থাপিত বিভিন্ন তত্ত্ব ও আপত্তির বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়েছে। কোরআনবিষয়ক গবেষণায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
দ্বীনি জ্ঞান ও আধুনিক গবেষণার সমন্বয়
ড. মোহর আলীর গবেষণার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তিনি ইসলামী জ্ঞানচর্চা ও আধুনিক একাডেমিক গবেষণার মধ্যে সফল সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। হুগলী মাদরাসার দ্বীনি পরিবেশ তাঁকে ইসলামী ঐতিহ্য ও উম্মাহর প্রতি দায়বদ্ধতার চেতনা দিয়েছিল। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও লন্ডনের সোয়াস তাঁকে আধুনিক ইতিহাসচর্চা, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং গবেষণার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে দক্ষ করে তোলে। এই দুই ধারার সমন্বয়ে তিনি এমন একটি গবেষণাপদ্ধতি গড়ে তোলেন, যেখানে প্রতিটি বক্তব্যের ভিত্তি ছিল তথ্য, সূত্র ও প্রমাণ। তাঁর কাজ আমাদের শেখায়, ইসলামের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক আপত্তির জবাব শুধু আবেগ কিংবা বক্তব্য দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন গভীর অধ্যয়ন, নির্ভরযোগ্য তথ্য, গবেষণার দক্ষতা এবং প্রতিপক্ষের চিন্তাপদ্ধতি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা।
একবিংশ শতাব্দীতে প্রাচ্যবাদী চিন্তার প্রকাশ ও প্রচারমাধ্যম বদলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপত্র, ইন্টারনেট ও গণমাধ্যমে ইসলামের ইতিহাস, কোরআন ও নবীজির জীবন নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক সামনে আসছে। এমন বাস্তবতায় মুসলিম আলেম ও গবেষকদের জন্য দ্বীনি জ্ঞানের পাশাপাশি আধুনিক গবেষণাপদ্ধতি এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক ভাষায় দক্ষতা অর্জন অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে মাদরাসা ও ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণাভিত্তিক অধ্যয়নকে উৎসাহিত করা, আরবি-উর্দু-ফারসির পাশাপাশি ইংরেজি ভাষা ও আধুনিক গবেষণাপদ্ধতির চর্চা বাড়ানো সময়ের দাবি। ড. মুহাম্মদ মোহর আলীর জীবন ও কর্ম এ ক্ষেত্রে আমাদের সামনে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
ড. মুহাম্মদ মোহর আলী ছিলেন এমন এক জ্ঞানসাধক, যিনি নীরবে নিজের গবেষণা ও লেখনীর মাধ্যমে ইসলামের ইতিহাস, সিরাত ও কোরআনবিষয়ক গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বাংলাদেশের মাটিতে জন্ম নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি অর্জন করা এই মনীষীর রচনাবলি আজও গবেষক ও অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের জন্য মূল্যবান সম্পদ।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন এবং বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে ৪১ হাজার ৯০ কোটি টাকার একটি পাঁচ বছরের মেয়াদি কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। এই উদ্যোগটি পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) নামে পরিচিত, যার আওতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য বিনামূল্যে পোশাক, জুতা, মোজা ও স্কুলব্যাগ সরবরাহ করা হবে। প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান, অবকাঠামো নির্মাণ এবং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এই কর্মসূচির অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়ে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, কর্মসূচির মোট অর্থের বড় অংশ শিক্ষার্থীদের সহায়তা, ডিজিটাল শিক্ষা এবং বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ নির্মাণে ব্যয় হবে। এর মধ্যে ২৫ দশমিক ২ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে শিক্ষার্থীদের পোশাক, জুতা, মোজা ও ব্যাগ কেনার জন্য। মোট ১ কোটি ৬ লাখ ১৭ হাজার ৯৬২ জন শিক্ষার্থী এই সুবিধা পাবে।
প্রাথমিক পর্যায় থেকে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে ‘এক শিক্ষক, এক ট্যাব’ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এই খাতে মোট কর্মসূচির ৫ দশমিক ৯ শতাংশ ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আওতায় শিক্ষকদের জন্য ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৫১৩টি ট্যাব বিতরণ করা হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষে ২০ হাজার ইন্টার্যাক্টিভ ফ্ল্যাট প্যানেল (আইএফপি) ও প্রজেক্টর স্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে পাঠদানকে আরও অংশগ্রহণমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদ্যালয়ের ভৌত পরিবেশ উন্নয়নের জন্যও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হবে। মোট বরাদ্দের ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ এই খাতে রাখা হয়েছে। প্রয়োজনের ভিত্তিতে ১৫ হাজার ৬৪১টি নতুন শ্রেণিকক্ষ, দেড় হাজার ওয়াশ ব্লক এবং ১০ হাজার সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া শিশুদের ভাষা ও গণিতের প্রাথমিক ভিত্তি মজবুত করার পাশাপাশি শিক্ষকদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। এই উদ্দেশ্যে মোট ব্যয়ের ৭ দশমিক ৬ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় ৩ লাখ ১০ হাজার শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবেন। প্রশিক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে ফাউন্ডেশনাল লিটারেসি অ্যান্ড নিউমেরেসি (এফএলএন), অর্থাৎ প্রাথমিক পর্যায়ে পড়া ও গণনার সক্ষমতা অর্জনে।
পিইডিপি-৫ বাস্তবায়নে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ৩৩ হাজার ২০৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। অবশিষ্ট ৭ হাজার ৮৮৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা বিদেশি ঋণ ও অনুদান হিসেবে পাওয়া যাবে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং ইউনিসেফসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এতে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
কর্মসূচিটির অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে বেনিফিট-কস্ট রেশিও বা সুবিধা-ব্যয়ের অনুপাত ২ দশমিক ৭। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দীর্ঘ মেয়াদে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং দেশের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে উদ্যোগটি ভূমিকা রাখতে পারে।
এদিকে একই একনেক সভায় ৫৮ হাজার ৮৮৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে মোট ১৩টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প ১১টি, সংশোধিত দুটি।
সভায় দেশের ৬৩৯টি থানার যানবাহন সংকট মোকাবেলায় পুলিশকে ৫ হাজার ৮৩০টি গাড়ি কেনার প্রস্তাবও অনুমোদন করা হয়েছে। এ জন্য ব্যয় হবে ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। বর্তমানে দেশের থানাগুলোতে গড়ে দুটি গাড়ি নেই।
গাড়ি কেনার জন্য নেওয়া প্রকল্প দুটির মধ্যে একটি ৪ হাজার ৮২৯টি সাধারণ যানবাহন সংগ্রহের জন্য ৪ হাজার ৩২৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যটির আওতায় ১ হাজার ১টি বিশেষায়িত যান কেনা হবে। এ প্রকল্পে বরাদ্দ ২ হাজার ২৮০ কোটি ১০ লাখ টাকা।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ