শুক্রবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০২৬ ইং
০৯:১১ এম
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন ইরানের তুলনায় বেশি তেল রপ্তানি করছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের চেয়ে বেশি। এই পরিস্থিতি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। কারণ, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার প্রচেষ্টা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার হুমকির মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প পথে তেল সরবরাহ বৃদ্ধি করছে।
জ্বালানি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে উপসাগরীয় দেশগুলো দৈনিক ২ কোটি ৪৬ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে। যুদ্ধ শুরুর পূর্বে রপ্তানির পরিমাণ ছিল দৈনিক ২ কোটি ৩৩ লাখ ব্যারেল।
তবে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালনা সংস্থার (ইউকেএমটিও) তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে সেখানে অন্তত ১২টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত সপ্তাহে একটি কনটেইনারবাহী জাহাজও প্রণালিটিতে ডুবে যায়, যা সম্ভবত কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য ধরনের অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
বিকল্প পথে তেল পরিবহন
হরমুজ প্রণালির ঝুঁকি এড়াতে, উপসাগরীয় দেশগুলো জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের পদ্ধতি গ্রহণ করছে। এই প্রক্রিয়ায় ছোট জাহাজে করে উপসাগর থেকে তেল নিয়ে প্রণালির বাইরে অপেক্ষমাণ বড় তেলবাহী জাহাজে স্থানান্তর করা হচ্ছে। বিমা ব্যয় ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক দেশ বেসরকারি জাহাজের পরিবর্তে নিজেদের জাহাজ ব্যবহার করছে।
সৌদি আরবও লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানি বৃদ্ধি করেছে। পূর্বে, বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে এশিয়ায় তেল পাঠাত দেশটি। তবে, হুথিদের সৌদি জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর বিকল্প পাইপলাইন ব্যবহার করে মিসর হয়ে ভূমধ্যসাগরীয় পথে তেল পরিবহনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন এখনো যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশের বেশি কম। প্রতিষ্ঠানটির হিসাব বলছে, সেপ্টেম্বরে উপসাগর থেকে রপ্তানি করা ইরান ছাড়া অন্যান্য দেশের অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৪০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে পরিবহন করা হয়েছে। যুদ্ধের আগে এ হার ছিল ১৭ শতাংশ।
পাইপলাইন নির্মাণে আগ্রহ বাড়ছে
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বিকল্প পথে তেল রপ্তানির ব্যবস্থা স্থায়ী করতে আগ্রহী। ওপেকের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদক ইরাক গত জুলাইয়ে সিরিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে। এই চুক্তির আওতায় ইরাকের উত্তরাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল পর্যন্ত পাইপলাইন পুনরায় চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
যদিও তেল রপ্তানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৯ ডলারে রয়েছে। বিশেষ করে ডিজেলের মতো পরিশোধিত জ্বালানির দাম বেড়েছে। হরমুজ এড়িয়ে দীর্ঘ পথে জাহাজ চলাচল করায় পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়াও এর একটি কারণ।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে নতুন করে হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছে। বুধবার ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সরকার উৎখাতের বিষয়ে তাঁর অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি দাবি করেন, ইরান আবারও পারমাণবিক কর্মসূচি চালু করছে।
এর আগে ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচনের প্রচারে নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান ‘শেষ করতে’ সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ফলে, তেল রপ্তানি বৃদ্ধি পেলেও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
এমএমআর
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে সেমিনার ও স্ক্রিনিং কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে। এই কর্মসূচিটি ১৪ অক্টোবর মাল্টিডিসিপ্লিনারি রিসার্চ সেন্টার মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলথ ক্লাবের উদ্যোগে পরিচালিত হয়।
প্রধান অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আবুল হোসেন। মূল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক ক্যান্সার হাসপাতালের প্রকল্প সমন্বয়কারী ও বাংলাদেশ স্তন ক্যান্সার সচেতনতা ফোরামের প্রধান সমন্বয়কারী অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন।
আলোচনার সময় ডা. রাসকিন স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি, বিস্তার, উপসর্গ, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে স্থানীয় পর্যায়ে সমাজভিত্তিক ক্যান্সার সেবা ও গবেষণা কার্যক্রম শুরু করার ঘোষণা দেন।
অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্য প্রদান করেন হেলথ ক্লাবের মেন্টর ও ফার্মেসি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তানিয়া আহমেদ। এ ছাড়া কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন নিলুফা সুলতানা, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. ফুয়াদ হোসেন এবং মাল্টিডিসিপ্লিনারি রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক ডা. তরিকুল ইসলামসহ অন্যান্য বক্তারা বক্তব্য রাখেন।
আলোচনা শেষে আগ্রহী নারীদের জন্য স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিং সেবা প্রদান করেন গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক ক্যান্সার হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
পতিত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে পাল্টাপাল্টি ব্লেম গেম শুরু হয়েছে। একে অপরের বিরুদ্ধে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির সঙ্গে গোপন সমঝোতা ও সখ্যের অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
সরকারি দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, বিরোধী দলই আওয়ামী লীগকে পেছন থেকে উসকানি দিচ্ছে, যার ফলে দেশ অস্থিতিশীল হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, শিল্পাঞ্চলগুলোতে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে, বিরোধী দলের অভিযোগ, আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করে তাদের রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখতে চাচ্ছে সরকারি দল। বিরোধী মত দমনে পরিকল্পিতভাবে ‘আওয়ামী জুজু’র ভয় দেখানো হচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো অকাট্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি, তবে সরকারপ্রধান জানিয়েছেন, তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।
দীর্ঘ দেড় দশক স্বৈরাচারী শাসনে নিষ্পেষিত রাজপথের দুই পুরোনো সহযাত্রী বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী বর্তমানে একে অপরকে ঘায়েল করতে আওয়ামী লীগ কার্ড ব্যবহার করছে। এতে প্রশ্ন উঠেছেÑ সত্যিই কি কেউ নিষিদ্ধ বা বিতাড়িত শক্তির সঙ্গে সমঝোতা করছে, নাকি প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে দেউলিয়া করতে নতুন এই অস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি সরকার ও বিরোধী দল একে অপরের বিরুদ্ধে দোষারোপের রাজনীতি অব্যাহত রাখে, তবে বিতাড়িত রাজনৈতিক দলই লাভবান হবে। তাই দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে উভয়পক্ষের উচিত পারস্পরিক দোষারোপের সংস্কৃতি পরিহার করে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা।
বিএনপি সরকার গঠনের পরপরই প্রধান বিরোধী দল জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য সরকারকে সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও জুলাই সনদ নিয়ে প্রথম থেকেই টানাপোড়েন শুরু হয়। জুলাই সনদের পাশাপাশি জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। সরকারের মেয়াদ সাত মাস না যেতেই বিরোধী দল লংমার্চ, বিভাগীয় সমাবেশসহ সরকারবিরোধী নানা কর্মসূচি পালন করছে। এসব কর্মসূচি থেকে সরকার পতনের হুমকি পর্যন্ত এসেছে।
সম্প্রতি বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সরকারকে আর সহযোগিতা করা হবে না বলেও ঘোষণা দিয়েছেন। বিরোধী দলের আন্দোলন-কর্মসূচির পাশাপাশি রাজধানী এবং এর আশপাশে শ্রমিক আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বকেয়া বেতন ও বেতন-ভাতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে তারা প্রায়ই রাজপথে নামছে। সরকারি দলের অভিযোগ, এসব কর্মসূচি পালিত হচ্ছে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে। এর পেছনে বিরোধী দলের ইন্ধন এবং সম্পৃক্ততার অভিযোগও তোলা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে। আন্দোলন চাঙা করতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিরোধী দল আঁতাত করছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
অপরদিকে বিরোধী দলের অভিযোগ, তাদের কোণঠাসা করতে সরকারি দলের লোকজনই আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করছে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ একজোট হয়ে বিরোধী দলকে দমনের চেষ্টা করছে।
তবে বিএনপি ও জামায়াতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ‘সম্পর্ক তৈরির’ অভিযোগ এর আগেও উঠেছিল। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে অভিযোগটি দুই দলের বিরুদ্ধেই ছিল। নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে উভয় দলই তখন আওয়ামী লীগকে ‘কাছে টানার’ চেষ্টা করেছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়। ওই সময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিভিন্নভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয়সহ তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা দেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাতে আটক দলটির নেতাকর্মীদের ছাড়াতে তদবির করার তথ্য পাওয়া যায়। প্রার্থীদের নির্বাচনি জনসভায়ও জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য দিতে দেখা যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানও শোনা গেছে।
নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের তুলনায় বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সখ্য বেশি দেখা গেছে। এর ফলস্বরূপ নির্বাচনের পরপরই দেশের কয়েকটি স্থানে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় খোলার খবর পাওয়া যায়। কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার ঘটনা ঘটে। যদিও পরে বিএনপির কিছু নেতাকর্মী ও জুলাই বিপ্লবীরা ওই সব কার্যালয় ভাঙচুর করে তালাবদ্ধ করে দেন। বিএনপি সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগের কারাবন্দি বেশকিছু নেতাকর্মী জামিনে মুক্তও হন। আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের কেউ কেউ এ সময়ে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করেন।
ভারতে পলাতক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার তথাকথিত দেশে ফেরার ঘোষণার পর দেশে আত্মগোপনে থাকা কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির নেতাকর্মীদের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল, কথিত লকডাউন পালন, অগ্নিসংযোগ, ককটেল বিস্ফোরণ এবং সাম্প্রতিক শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পরপরই সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সারা দেশে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের তৎপরতা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি গ্রেপ্তার অভিযান জোরদার করা হয়েছে। ডিসেম্বর পর্যন্ত এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
গত মঙ্গলবার রাজশাহীতে এক অনুষ্ঠানে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল জামায়াতকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, যে স্বৈরাচার পালিয়ে গেছে, তারা সেখানে অর্থ সরবরাহ করছে।...কাদের সাহায্যে করছে? এই যে কতটা দল আছে, যারা ভ্রান্তি ছড়ায় দেশের মধ্যে। তারা জনগণের কাছে বিভিন্ন টিকিট বিক্রি করার চেষ্টা করেছিল নির্বাচনের আগে। এই দুপক্ষ এক হয়েছে। একজন পয়সা দিচ্ছে সীমান্তের ওপার থেকে, আরেকজন এখানে বসে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।’
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে গত বুধবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। তিনি বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘তারা আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিচ্ছে।’ বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকরা যে আন্দোলন করছে, আলোচনার মাধ্যমে সরকারের তা মেনে নেওয়া উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সূর মিলিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিরোধী দলের সম্পর্কের প্রমাণ রয়েছে। জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ এবং একটি গুপ্ত দল অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে। পরাজিত শক্তি এবং ওই দলের আচরণ ও কথাবার্তায় মিল রয়েছে। অতীতের মতো এখনো তারা বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সাহাবুল হক বলেন, প্রধানমন্ত্রী দায়িত্বশীল জায়গা থেকে যে গোয়েন্দা তথ্যের কথা বলেছেন, উচিত হবে তার প্রমাণক তুলে ধরে বিষয়টি পরিষ্কার করা। অপরদিকে বিরোধী দলকেও পাল্টা অভিযোগের ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত। অন্যথায় বিষয়টিকে কাজে লাগিয়ে পতিত ও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নতুন করে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার পথ খুঁজবে। এতে সরকারের উন্নয়নকাজ বাধাগ্রস্ত হবে, দেশ ও সরকার লাভবান হবে না।
এই শিক্ষাবিদ আরো বলেন, বড় দুই দলের অনৈক্যের সুযোগে আওয়ামী লীগ ধীরে ধীরে সক্রিয় হলে তা কারো জন্য ভালো হবে না। দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে পারস্পরিক দোষারোপের সংস্কৃতি পরিহার করে উভয়পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা উচিত।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তারেক ফজল আমার দেশকে বলেন, এ বিষয়ে কতটা গভীর থেকে এবং সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে বলা হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে নির্দ্বিধায় বলা যায়, বিষয়টি রজননৈতিক। রাজনৈতিক সুবিধা নিতে দল দুটির পক্ষ থেকে এ ধরনের বক্তব্য আসছে।
পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের পরিণতির বিষয়ে সতর্ক করে এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, নিঃসন্দেহে বলা যায়, এভাবে দোষারোপের রাজনীতি চলমান থাকলে বিতাড়িত গোষ্ঠীই সুবিধা পাবে। এ বিষয়ে দুপক্ষকে এখনই সংযত হওয়া দরকার। না হলে পরিস্থিতি ভয়ংকর রূপ নিতে পারে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
এক সভা: দুই গল্প
জাতীয় সংসদের সরকারি দলের সভাকক্ষে ১১ অক্টোবর বিএনপির সংসদীয় দলের সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভা তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলেছিল এবং এতে ১৯৪ সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। সভায় অন্তত ২৫ জন মন্ত্রী ও এমপি বক্তব্য দেন। একই ঘরে দুটি ভিন্ন গল্প উঠে আসে।
প্রথম গল্পটি বাইরের শত্রুর। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে অচিরেই ‘স্বৈরাচার’ ও ‘গুপ্ত’রা একত্রিত হতে পারে এবং এজন্য তার দলের সংসদ সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে বলেন। দ্বিতীয় গল্পটি ভেতরের ব্যর্থতার। একই সভায় সংসদ সদস্যরা আইনশৃঙ্খলার অবনতি, মাদকের বিস্তার এবং সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম তুলে ধরেন। এমনকি ‘ফ্যাসিবাদের দোসরদের’ও ডিলারশিপ পাওয়ার অভিযোগ করেন।
দুটি গল্প আসলে একটি রাজনৈতিক ধাঁধার দুই প্রান্ত। যখন শাসক দল শত্রুর ছবি আঁকে, তখন তাদের নিজেদের কর্মীদের বণ্টন-রাজনীতি সেই ছবির নিচে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। এটি বুঝতে সংকটের দুটি স্তর আলাদা করে দেখতে হবে।
সংকট শুধু জোগানে নয়, প্রাপ্তিতেও
বাইরের ধাক্কা বাস্তব। দেশে ইউরিয়ার বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২৬ লাখ টন, যার মধ্যে ১৪ লাখ টনই লাগে ডিসেম্বর-মার্চের বোরো মৌসুমে। অথচ ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইউরিয়ার মজুত ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৭৬ লাখ টন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে হরমুজ প্রণালির পথে আমদানি অনিশ্চিত। তবে মজুত ও মাঠের তথ্যের মধ্যে ফাঁক রয়েছে। সংসদীয় কমিটিকে জানানো হয়েছে, তিন ধরনের সারের মজুত গত অর্থবছরের চেয়ে বেশি। তবু কমিটির অন্তত তিন সদস্য নিজ এলাকায় সংকটের অভিযোগ করেছেন। বিভিন্ন জাতীয় মিডিয়া সার-সংক্রান্ত মাঠের হিসাব দিয়েছে। ‘কৃষকরা সরকার-নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি ১৫০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দিচ্ছেন’। ‘বরগুনার তালতলীর এক ইউনিয়নে অক্টোবরে চাহিদা ৭০ টন হলেও বরাদ্দ মিলেছে ২০ টন।’ ‘টিএসপি ও ডিএপি অনেক কৃষক সংগ্রহই করতে পারেননি এবং আমনের ফলন নিয়ে আশঙ্কা করছেন।’
অমর্ত্য সেন Poverty and Famines (১৯৮১) গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন, দুর্ভিক্ষ বা সংকট কেবল মোট জোগান কমলে হয় না। মানুষের প্রাপ্তির অধিকার ও প্রবেশাধিকার ভেঙে পড়লেও হয়। দেশের সার ব্যবস্থাপনার জাতীয় মজুতের প্রশ্নের পাশাপাশি দেখতে হবে, কৃষক নির্ধারিত দামে ডিলারের কাছ থেকে সার পাচ্ছেন কি না। আর এখানেই ডিলার নেটওয়ার্কের রাজনীতি প্রাসঙ্গিক।
ডিলারশিপ: রেন্ট ও আনুগত্য মিলিত হয়
ভর্তুকিপ্রাপ্ত সারের সরকারি দাম বাজারদরের চেয়ে কম। এই ব্যবধানই অর্থনীতিবিদদের ভাষায় ‘রেন্ট’। অ্যান ক্রুগার ও গর্ডন টুলক দেখিয়েছেন, রাষ্ট্র কোনো সুবিধা সীমিত করে দিলে সমাজ সেই সুবিধা পাওয়ার প্রতিযোগিতায় সম্পদ খরচ করে। এতে উৎপাদন বাড়ে না, তদবির বাড়ে। ডিলারশিপ সেই রেন্ট ধরার লাইসেন্স। বস্তাপ্রতি ১৫০-৪০০ টাকার বাড়তি দাম আসলে এই রেন্টেরই মাঠপর্যায়ের প্রতিচ্ছবি।
আনুগত্যের বিনিময়: জেমস স্কট পৃষ্ঠপোষক-মক্কেল সম্পর্ককে সংজ্ঞায়িত করেছেন ক্ষমতাবানের সুবিধা আর অনুগতের সমর্থনের বিনিময় হিসেবে। কিটশেল্ট ও উইলকিনসন দেখিয়েছেন, দলগুলো প্রায়ই নীতির বদলে ব্যক্তিগত পুরস্কারের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক টিকিয়ে রাখে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টোকস ‘ব্রোকার’ ধারণা অনুযায়ী ইউনিয়ন-উপজেলার একজন সার ডিলার আদর্শ ব্রোকার, কারণ প্রতিটি কৃষক তার দোকানে নিয়মিত যান।
এই তাত্ত্বিক কাঠামো মাথায় রেখে বিভিন্ন জেলার অভিযোগগুলো পড়লে একটি ধরন চোখে পড়ে। যেমন : রাজশাহীতে নিয়োগ পাওয়া ৬৯ ডিলারের অধিকাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী বা তাদের পরিবারের সদস্য বলে অভিযোগ রয়েছে। মিডিয়ায় এসেছে, একজন সরকারি কর্মকর্তা বলেছেন, ‘তিন সংসদ সদস্যের তালিকা থেকেই নিয়োগ হয়েছে অথচ আবেদনকারীরা লটারি চেয়েছিলেন।’ মেহেরপুরে ২২ জন ডিলারের তালিকায় নেতাদের ছেলে, ভাই, ভাতিজা ও স্ত্রীর নাম থাকার অভিযোগ। বগুড়ায় বাদ পড়া প্রার্থীরা ‘এমপি কোটা’র অভিযোগ তুলেছেন। এক বিএনপি নেতার ভাষ্য, সংসদ সদস্যের সুপারিশ ছাড়া কোনো ফাইল এগোয় না। নাটোরে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনুসারী হিসেবে পরিচিত একজনের ডিলারশিপ বাতিলের দাবিতে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা মানববন্ধন করেছেন। এ রকম হাজারো উদাহরণ আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারছি।
ভেতরের দ্বন্দ্ব ও আমলাতন্ত্রের চাপ
মুশতাক খানের ‘পলিটিক্যাল সেটলমেন্ট’ তত্ত্ব (২০১০) বলে, ক্ষমতাসীন জোট টিকে থাকে প্রভাবশালী উপদলগুলোর মধ্যে রেন্ট ভাগ করে। কর্মীদের পুরস্কৃত করার চাপ তাই স্বাভাবিক। ক্ষমতাসীন দলের সংসদীয় দলের সভায় একজন সংসদ সদস্য অন্যের নির্বাচনি এলাকায় হস্তক্ষেপ না করার আহ্বান জানান। আর একজন প্রতিমন্ত্রী চাকরিসহ সরকারি নানা ক্ষেত্রে বিএনপি নেতাকর্মীদের সুযোগ দেওয়ার চেষ্টার আশ্বাস দেন। অর্থাৎ ব্রোকারদের এলাকা-সীমানা নিয়ে টানাপোড়েন এবং কর্মী-পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দুটোই প্রকাশ্যে এসেছে।
প্রকৃতপক্ষে, সমস্যা শুরু হয় বণ্টন অস্বচ্ছ হলে। তখন উপদলীয় ক্ষোভ জন্ম নেয়, যেমন নীলফামারী বা নাটোরে নিজ দলের নেতাদের প্রতিবাদে দেখা গেছে। মাইকেল লিপস্কির ‘স্ট্রিট-লেভেল ব্যুরোক্র্যাসি’র ধারণাও এখানে প্রযোজ্য। কৃষি কর্মকর্তা, ইউএনও ও জেলা প্রশাসকের হাতে মাঠপর্যায়ের বিবেচনা-ক্ষমতা আছে আর সেই ক্ষমতা স্থানীয় রাজনৈতিক চাপে বেঁকে যেতে পারে। কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি নিজেই স্বীকার করেছেন, ডিলার নিয়োগে কিছু অনিয়ম হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর ‘স্বৈরাচার-গুপ্ত’ তত্ত্ব
প্রধানমন্ত্রীর স্বৈরাচার, গুপ্ত-সংক্রান্ত মন্তব্যটি নতুন নয়। ফেনীর এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, গত নির্বাচনে গুপ্ত বাহিনীর সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া শক্তির তলে তলে যোগাযোগ হয়েছিল। রাজশাহীর জনসভায়ও তিনি একই কথা বলেছেন এবং গোয়েন্দা তথ্য থাকার দাবি করেছেন। বিরোধী দল জামায়াত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতি ইঙ্গিত তা সহজে বোঝা যায়।
কার্ল শ্মিটের মতে, রাজনীতির মূল ভিত্তি বন্ধু ও শত্রুর পার্থক্য। ‘স্বৈরাচার’ ও ‘গুপ্ত’ দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক ধারাকে এক শত্রু শিবিরে বসিয়ে দেয়। এতে প্রতিপক্ষ ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শের প্রতিদ্বন্দ্বী থাকে না, একটি অভিন্ন বিপদে পরিণত হয়।
এর্নেস্তো লাক্লাউ দেখিয়েছেন, জনতাবাদী রাজনীতি বিভিন্ন অসন্তোষকে ‘সমতুল্যতার শৃঙ্খলে’ গেঁথে একটি সাধারণ প্রতিপক্ষ তৈরি করে। কাস মুদ্দে জনতাবাদের মূলে দেখেছেন ‘বিশুদ্ধ জনগণ বনাম দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজাত’ দ্বিভাজন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে এই কাঠামো স্পষ্ট। একদিকে ‘রাজপথে থাকা’ ও কাজ করা জনগণ আর বিএনপি, অন্যদিকে ‘পালানো’ ও ‘গুপ্ত’ শক্তি। তার পূর্ববর্তী বক্তব্যে এই দ্বিভাজন আরো খোলামেলা ছিল; যেখানে তিনি প্রতিপক্ষের কোনো কর্মসূচি নেই বলে দাবি করে বিএনপিকে কাজ দিয়ে প্রমাণিত শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন।
বুজান, ওয়েভার ও ডি উইল্ডের কোপেনহেগেন স্কুল বলে, কোনো বিষয়কে ‘অস্তিত্বগত হুমকি’ হিসেবে উপস্থাপন করলে স্বাভাবিক রাজনীতির নিয়মের বাইরে গিয়ে কঠোর পদক্ষেপ ও শৃঙ্খলা দাবি করা সহজ হয়। ‘অস্থিতিশীলতা’, ‘মব সৃষ্টি’ ও ‘ষড়যন্ত্র’র ভাষা সেদিকেই ইঙ্গিত করে। তবে এখানে সীমাবদ্ধতা আছে। তিনি একই সভায় বলেছেন, বিএনপি হামলা-মামলা ও জেল-জুলুমের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। তাই এটি পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তায়ন নয়। বরং ‘আংশিক নিরাপত্তায়ন’। বয়ানে হুমকির ভাষা আছে, কিন্তু ঘোষিত নীতিতে দমনের প্রতিশ্রুতি নেই।
লুইস কোজারের তত্ত্বে বাইরের শত্রু অভ্যন্তরীণ সংহতি বাড়ায়। প্রধানমন্ত্রী যখন বাইরের সম্ভাব্য জোটের কথা তুলে নিজ দলে সংসদ সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ থেকে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখার নির্দেশ দেন, তখন এই সংহতির কাজটিই দেখা যায়। ডিলারশিপ নিয়ে সংসদ সদস্যদের পারস্পরিক অভিযোগের মুহূর্তে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য আরো বেড়ে যায়।
বক্তব্যটির অবস্থান মূলত শ্মিটীয় বন্ধু-শত্রু বিভাজন ও লাক্লাউ-ধাঁচের জনতাবাদী সীমারেখা টানার জায়গায়। এর সঙ্গে কাজ করছে আংশিক নিরাপত্তায়ন ও কোজারীয় সংহতি কৌশল। অর্থাৎ বক্তব্যটির দ্বৈততা লক্ষণীয়। বাইরের দিকে প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক সীমানা নির্ধারণ, ভেতরের দিকে দলীয় শৃঙ্খলা ও ঐক্য।
কোজারের তত্ত্ব অনুযায়ী বাইরের হুমকির বোধ উপদলীয় বিরোধ সাময়িক চেপে রাখে। প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দল ও সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা বলেছেন, তাই এই সংহতি-কৌশল সময়োপযোগী। কিন্তু ডিলারশিপের মতো বণ্টন-দ্বন্দ্ব বাইরের হুমকির ভাষায় মেটে না। ভেতরের ক্ষোভ চাপা পড়তে পারে, নিষ্পত্তি নাও হতে পারে।
রবার্ট মার্টনের ‘স্বয়ংসিদ্ধ ভবিষ্যদ্বাণী’ ধারণা এখানে সতর্কবার্তা থেকে বলা যায়, কোনো জোটকে আগেভাগে ‘অবশ্যম্ভাবী’ ঘোষণা করলে সেই জোটের যুক্তি জোরালো হতে পারে এবং প্রতিপক্ষ পরস্পরের কাছে আসার প্রণোদনা পায়। উল্টোদিকে, এই লেবেলিং আস্থাশীল ভোটারদের কাছে বিরোধীদের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করতেও পারে। কোন প্রভাবটি জোরালো হবে, তা আগামী মাসগুলোর রাজনৈতিক আচরণ ও স্থানীয় নির্বাচনের ফলেই বোঝা যাবে।
বৈধতার পরীক্ষা: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
ফ্রিৎস শার্ফ বৈধতাকে ‘ইনপুট’ যাকে আমরা নির্বাচন ও অংশগ্রহণ আর ‘আউটপুট’Ñযাকে সরকারের কার্যকর সেবা বলি এই দুই ভাগে দেখেছেন। বিএনপির বৈধতা নির্বাচনি ম্যান্ডেট থেকে আসে। কিন্তু সারের সরবরাহ, আইনশৃঙ্খলা বা মাদকের মতো বিষয়ে আউটপুট বা বৈধতা যাচাই হয় কৃষকের হাতে সার পৌঁছানো দিয়ে। শত্রুর বর্ণনা দিয়ে নয়। কেনেথ উইভারের ‘ব্লেম অ্যাভয়ডেন্স’ তত্ত্ব বলে, ক্ষমতাসীনরা প্রায়ই ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে চান। সংকটের সময় ‘অস্থিতিশীলতার ষড়যন্ত্র’ বয়ান সেই প্রবণতার সঙ্গে মিলে যেতে পারে। তবে প্রধানমন্ত্রী শুধু দায় বাইরে ঠেলেননি। একই দিনের আরেকটি মিডিয়ার শিরোনামে তার বরাতে বলা হয়েছে, অপকর্মে জড়ালে নেতা, এমপি বা মন্ত্রী কেউ ছাড় পাবেন না। অভ্যন্তরীণ জবাবদিহির এই বার্তা ইতিবাচক, তবে বাস্তবায়নের প্রমাণ এখনো বাকি।
বয়ানের বুমেরাং: ডিলারশিপে
সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক দিক হলো, ‘স্বৈরাচারের দোসর’ ও ‘গুপ্ত’ লেবেল এখন দলের ভেতরের বিতর্কেও ব্যবহৃত হচ্ছে। নাটোর ও সাতক্ষীরার ঘটনায় বিএনপি-নেতারা নিজ দলের নিয়োগকে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট বলে চ্যালেঞ্জ করছেন। এর ঝুঁকি দুটি। প্রথমত, এই লেবেল উপদলীয় লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে হটানোর অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে, ফলে প্রকৃত অনিয়ম ও রাজনৈতিক নামকরণের মধ্যে ফারাক ঘোলা হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, প্রতিপক্ষের হাতেও এটি অস্ত্র। মেহেরপুরে জামায়াতের স্থানীয় নেতা ডিলার নিয়োগকে শতভাগ দলীয়করণ বলেছেন। অর্থাৎ বণ্টন-রাজনীতির অস্বচ্ছতা ক্ষমতাসীনদের শত্রু-বর্ণনাকে উল্টো করে তাদের দিকেই ঘুরিয়ে দিতে পারে।
শত্রুর ছবি যথেষ্ট নয়
আজকের পরিস্থিতিতে সরকারের দুটি চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। একটি হলো বাইরের ধাক্কা, জ্বালানি ও আমদানি-সংকট। অন্যটি ভেতরের কাঠামো, যেখানে রেন্ট ও আনুগত্য বণ্টনের অস্বচ্ছতা কৃষকের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে। প্রধানমন্ত্রীর ‘স্বৈরাচার-গুপ্ত’ বয়ান প্রথমটির রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দিতে পারে এবং দলীয় ঐক্য ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু দ্বিতীয় সংকটের সমাধান এতে মেলে না। কৃষক শত্রুর ছবি দিয়ে ধান ফলান না, তিনি সার চান ন্যায্য দামে। প্রধানমন্ত্রীর সতর্ক বার্তার সত্যিকারের পরীক্ষা এই প্রশ্নে : যারা ডিলার হলেন, তারা কৃষকের জন্য কতটা সেবা দিলেন আর নিয়োগে ঘোষিত নীতিমালা কতটা মানা হলো।
লেখক: সাবেক সচিব, অধ্যাপক রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল, ইউনিভার্সিটি
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
মানবসভ্যতার ইতিহাসে বাণিজ্যপথ কখনোই শুধুমাত্র পণ্য পরিবহনের মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি সভ্যতার বিকাশ, সংস্কৃতির বিনিময় এবং ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। প্রাচীন সিল্ক রোড যেমন চীন, মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপকে যুক্ত করে কেবল পণ্য নয়, বরং জ্ঞান, প্রযুক্তি, ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির বিস্তার ঘটিয়েছে, তেমনি আধুনিক বিশ্বে করিডোর, বন্দর, মহাসড়ক ও রেলপথকে কেন্দ্র করে নতুন ভূ-অর্থনৈতিক বাস্তবতা গড়ে উঠছে। বর্তমান বিশ্বের একটি বাণিজ্যপথের গুরুত্ব শুধুমাত্র কত দ্রুত পণ্য একস্থান থেকে অন্যস্থানে পৌঁছায়, তার ওপর নির্ভর করে না; বরং সেই পথ কোন কোন উৎপাদনকেন্দ্র, বাজার, বন্দর ও ভোক্তা অঞ্চলের মধ্যে সংযোগ তৈরি করছে এবং তার মাধ্যমে কী ধরনের আঞ্চলিক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে, তার ওপরও নির্ভর করে। এই কারণেই আধুনিক করিডরগুলোকে অনেক সময় ‘অর্থনৈতিক ধমনি’ হিসেবে দেখা হয়, যার মাধ্যমে পণ্য, পুঁজি, প্রযুক্তি, মানুষ ও তথ্যের প্রবাহ একটি অঞ্চলের উৎপাদন কাঠামোকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করতে পারে।
একবিংশ শতাব্দীতে যে রাষ্ট্রগুলো সংযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করবে, তারা অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হওয়ার সুযোগ পাবে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অধ্যয়নে অবকাঠামোগত সংযোগকে পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন হিসেবে নয়, বরং বাজার সম্প্রসারণ, বাণিজ্য ব্যয় হ্রাস, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক মূল্যশৃঙ্খলে অন্তর্ভুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে স্থলবেষ্টিত বা তুলনামূলকভাবে দূরবর্তী উৎপাদন ও বাজারকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সমুদ্রবন্দরকে যুক্ত করতে পারলে একটি করিডর তার নিজস্ব ভূগোলের সীমাবদ্ধতাকে অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তর করতে পারে। ফলে আধুনিক বিশ্বে ‘কোথায় একটি দেশ অবস্থিত’—এই প্রশ্নের পাশাপাশি ‘কোন কোন অঞ্চলের সঙ্গে দেশটি কতটা কার্যকরভাবে সংযুক্ত’—এই প্রশ্নটিও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের জন্য মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে স্থলপথে সংযোগের বিষয়টি এই বৃহত্তর বাস্তবতার একটি অংশ। এটি কেবল একটি সড়ক বা রেলপথ নির্মাণের প্রশ্ন নয়; বরং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, আঞ্চলিক বাণিজ্য, শিল্পায়ন, সরবরাহব্যবস্থা এবং ভূ-রাজনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশেষ করে চীনের ইউনান প্রদেশ, মিয়ানমারের মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চল এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রামকেন্দ্রিক বন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মধ্যে কার্যকর স্থল ও বহুমাত্রিক সংযোগ গড়ে উঠতে পারলে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনকে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করার একটি নতুন অর্থনৈতিক অক্ষ তৈরি হতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশের জন্য কেবল চীনা বাজারে প্রবেশের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে না; বরং বাংলাদেশ নিজেও বৃহত্তর আঞ্চলিক উৎপাদন, বাণিজ্য ও লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনাকে সরল অবকাঠামোগত প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা সম্ভব হবে না। একটি কার্যকর করিডর তখনই অর্থনৈতিকভাবে অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তার সঙ্গে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, কাস্টমস, পণ্য পরিবহন, গুদাম ও লজিস্টিকস অবকাঠামো, ডিজিটাল বাণিজ্যব্যবস্থা, বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন এবং আঞ্চলিক বাজারের সমন্বয় ঘটে। অর্থাৎ সড়ক নির্মাণ করিডরের সূচনা হতে পারে, কিন্তু করিডর অর্থনীতি গড়ে ওঠে তার চারপাশে উৎপাদন, বাণিজ্য ও সেবার একটি সমন্বিত বাস্তুতন্ত্র তৈরি হলে। সুতরাং, মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থলসংযোগের প্রশ্নটি একই সঙ্গে একটি পরিবহন প্রকল্প, একটি বাণিজ্যিক সম্ভাবনা এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি ভূ-অর্থনৈতিক কৌশলের প্রশ্ন। এখানেই নিহিত রয়েছে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে হলে সুযোগের পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক, অবকাঠামোগত, নিরাপত্তাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ইউনান প্রদেশ বহুদিন ধরেই সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকারের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। চীনের পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলীয় অঞ্চলগুলো অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত উন্নত হলেও ইউনান ও আশপাশের অভ্যন্তরীণ প্রদেশগুলো তুলনামূলকভাবে সমুদ্রবন্দর থেকে দূরে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পরিবহন ও আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে তাদের অনেকাংশেই চীনের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় বন্দরগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয়। এই ভৌগোলিক বাস্তবতা চীনের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের উন্নয়ন, পরিবহন ব্যয় কমানো এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য বিকল্প সরবরাহপথ তৈরির প্রশ্নকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বিশেষ করে চীনের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নকে পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলের তুলনায় অধিক ভারসাম্যপূর্ণ করার যে দীর্ঘমেয়াদি নীতি, তার সঙ্গে দক্ষিণমুখী আঞ্চলিক সংযোগের বিষয়টিও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
ফলে চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো দক্ষিণমুখী সংযোগের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে আরো কার্যকর যোগাযোগ এবং বিদ্যমান বাণিজ্যপথের পাশাপাশি বিকল্প পথ তৈরি করা। এটি শুধু দূরত্ব কমানোর প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে সরবরাহশৃঙ্খলের বৈচিত্র্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশ এবং পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি। এই লক্ষ্য থেকেই চীন মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ বন্দর, তেল ও গ্যাস পাইপলাইন, অর্থনৈতিক করিডর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াভিত্তিক বিভিন্ন সংযোগ প্রকল্পে বিনিয়োগ করে আসছে। কিয়াউকফিউ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত এই বন্দর ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো চীনের ইউনানকে মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে একটি সরাসরি ভূ-অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বারের সম্ভাবনা তৈরি করে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের মাধ্যমে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ভারত মহাসাগরীয় বাজার ও পরিবহনব্যবস্থার সংযোগ বৃদ্ধির বৃহত্তর পরিকল্পনার সঙ্গেও এটি যুক্ত।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একটি স্বাভাবিক সম্ভাব্য অংশীদার। কারণ ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ দক্ষিণ-পশ্চিম চীন, মিয়ানমার, দক্ষিণ এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগরের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগবিন্দু। তবে বাংলাদেশের গুরুত্ব শুধু মানচিত্রে মধ্যবর্তী অবস্থানের কারণে নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চট্টগ্রাম ও অন্যান্য সমুদ্রবন্দর, ক্রমবর্ধমান শিল্পভিত্তি, বৃহৎ ভোক্তা বাজার এবং দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সম্ভাব্য বাণিজ্যিক সংযোগ। ফলে একটি কার্যকর স্থলপথ যদি চীনের ইউনানকে মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তাহলে এই সংযোগ কেবল দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহনের পথ হিসেবে কাজ করবে না; বরং তা বৃহত্তর আঞ্চলিক উৎপাদন ও বাণিজ্য নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
যদি কুনমিং থেকে মান্দালয়, সেখান থেকে মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চল ও রাখাইন হয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের সঙ্গে কার্যকর সড়ক ও রেল সংযোগ গড়ে ওঠে, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি সম্পূর্ণ নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করতে পারে। এমন একটি করিডর কার্যকর হলে চট্টগ্রামকে শুধু বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির বন্দর হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক ট্রানজিট ও লজিস্টিকস কেন্দ্রে রূপান্তরের সম্ভাবনা তৈরি হবে। এর মাধ্যমে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পণ্য বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে পারে; একইভাবে বাংলাদেশের শিল্পপণ্য, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য রপ্তানি পণ্যও স্থলপথে দ্রুততর আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই ধরনের সংযোগ বাংলাদেশের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নতুন শিল্প, গুদামজাতকরণ, পরিবহন, সীমান্তবাণিজ্য ও লজিস্টিকস সেবা বিকাশের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ করিডরটি যদি কেবল ‘পথ’ হিসেবে না থেকে উৎপাদন ও বাণিজ্যের একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অক্ষ হিসেবে গড়ে ওঠে, তবে এর প্রভাব বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-অর্থনৈতিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এই সংযোগের গুরুত্ব তাই বহুমাত্রিক।
প্রথমত, এটি বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে সহায়তা করতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রধানত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাকেন্দ্রিক। এই বাজারগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও অতিরিক্ত বাজার-নির্ভরতা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, বাণিজ্যনীতি পরিবর্তন, ভোক্তা চাহিদার ওঠানামা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা ভূ-রাজনৈতিক সংকটের সময় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বাজার বৈচিত্র্যকরণ তাই বাংলাদেশের রপ্তানি কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া প্রয়োজন। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ওষুধ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল পণ্য এবং ডিজিটাল ও পেশাগত সেবার মতো খাতও এই বাজার সম্প্রসারণের সুবিধা পেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সংযোগ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে রাজধানীকেন্দ্রিকতা থেকে বের করে আনতে পারে। বাংলাদেশের উন্নয়ন দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা ও চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। এর ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত থেকেছে। একটি কার্যকর আঞ্চলিক করিডর এই ভৌগোলিক কেন্দ্রীভবন কিছুটা পরিবর্তন করার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। যদি আঞ্চলিক করিডর বাস্তবায়িত হয় এবং এর সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সড়ক, রেল, নৌপথ ও বন্দর অবকাঠামোর কার্যকর সংযোগ তৈরি করা যায়, তাহলে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি এবং বৃহত্তর পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চল নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ একটি ট্রানজিট ও লজিস্টিকস হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ পেতে পারে। বিশ্বের বহু সফল অর্থনীতি প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নয়, বরং তাদের ভৌগোলিক অবস্থানকে দক্ষ অবকাঠামো, বন্দর, বাণিজ্যিক সেবা এবং লজিস্টিকস সক্ষমতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করে গড়ে উঠেছে। সিঙ্গাপুর, দুবাই কিংবা নেদারল্যান্ডসের উদাহরণ দেখলে বোঝা যায়, কৌশলগত অবস্থান নিজে কোনো অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; সেটিকে সম্পদে পরিণত করতে প্রয়োজন কার্যকর প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ, বাণিজ্যবান্ধব নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা।
বাংলাদেশকে নিশ্চিত করতে হবে, সংযোগের সুবিধা যাতে একমুখী না হয়ে পারস্পরিক হয়। অতীতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা গেছে, কিছু দেশ বৃহৎ করিডর প্রকল্পে অংশ নিয়েও প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করতে পারেনি। এর একটি কারণ হলো, তারা নিজেদের শিল্পভিত্তি, বন্দর সক্ষমতা, দক্ষ মানবসম্পদ, স্থানীয় সরবরাহশৃঙ্খল এবং নীতিগত প্রস্তুতিকে একই গতিতে এগিয়ে নিতে পারেনি। ফলে করিডর দিয়ে পণ্য চলে গেলেও তার বড় অংশের মূল্য সংযোজন অন্যত্র থেকে গেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই ঝুঁকি বিবেচনা করা জরুরি।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় স্মরণ রাখা প্রয়োজন—করিডর কোনো লক্ষ্য নয়; করিডর হলো একটি মাধ্যম। লক্ষ্য হলো জাতীয় সমৃদ্ধি। দেখতে হবে, সেই সংযোগ বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশ এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা কতটা বাড়াতে পারছে। এই কারণেই বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ উপস্থিত হয়েছে। তারা চাইলে দেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে কেবল মানচিত্রের একটি বাস্তবতা হিসেবে রেখে দিতে পারেন; আবার চাইলে অবকাঠামো, বাণিজ্য, শিল্প, মানবসম্পদ ও কূটনীতির সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে সেটিকে অর্থনৈতিক শক্তি ও কৌশলগত সম্পদে রূপান্তর করতে পারেন। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত অতি-আশাবাদী বা অতি-সন্দেহপ্রবণ কোনোটিই নয়; বরং সম্ভাবনা, ব্যয়, ঝুঁকি ও জাতীয় স্বার্থের একটি সুসংহত মূল্যায়নের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে এগোনো।
মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে স্থলপথে সংযোগের সম্ভাবনা তাই একই সঙ্গে আকর্ষণীয় এবং জটিল।
একদিকে চীনের ইউনান প্রদেশকে মিয়ানমার হয়ে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনা, অন্যদিকে মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, রাখাইন অঞ্চলের সংঘাত, রোহিঙ্গা সংকট এবং সীমান্ত নিরাপত্তার বাস্তবতা—সবকিছু মিলিয়ে এটি এমন একটি উদ্যোগ, যার অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন এমন একটি নীতি, যেখানে সম্ভাব্য করিডরকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে; কিন্তু তার বাস্তবায়ন নির্ভর করবে নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতার ওপর।
আমাদের মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গা সংকটও এই সমীকরণের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আশ্রয়দাতা হওয়ায় মিয়ানমারের সঙ্গে বৃহৎ আঞ্চলিক সংযোগ নিয়ে আলোচনায় মানবিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্ব পাবে। তাই বাংলাদেশ চাইলে সংযোগের প্রশ্নটিকে বৃহত্তর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। একটি স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় রাখাইন অঞ্চল শুধু মিয়ানমার বা বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং বৃহত্তর বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের জন্যও অর্থনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় স্মরণ রাখা প্রয়োজন—করিডর কোনো লক্ষ্য নয়; করিডর হলো একটি মাধ্যম, যার লক্ষ্য হলো জাতীয় সমৃদ্ধি। যদি কোনো সংযোগ প্রকল্প বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করে, তবে তা জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। আবার যদি কোনো প্রকল্পের ব্যয়, ঝুঁকি, নিরাপত্তাগত দায় বা অর্থনৈতিক নির্ভরতা সম্ভাব্য সুবিধাকে ছাড়িয়ে যায়, তাহলে শুধু ভূ-রাজনৈতিক আকর্ষণের কারণে সেটিকে গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত প্রকল্পকেন্দ্রিক নয়, ফলাফলকেন্দ্রিক। জাতীয় স্বার্থে কোন পথ নির্মিত হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই পথ বাংলাদেশের মানুষের জন্য কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করছে, সেটা বিবেচনায় নেওয়া।
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে তাই একটি ঐতিহাসিক সুযোগ উপস্থিত হয়েছে। দেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে কেবল মানচিত্রের বাস্তবতা হিসেবে রেখে দেওয়া যায়; আবার অবকাঠামো, বাণিজ্য, শিল্প, মানবসম্পদ, কূটনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে সেটিকে অর্থনৈতিক শক্তি ও কৌশলগত সম্পদে রূপান্তরও করা যায়। শেষ পর্যন্ত মিয়ানমার করিডর বাংলাদেশের জন্য শুধু চীনের সঙ্গে একটি নতুন স্থলপথের সম্ভাবনা নয়; এটি নিজের ভূগোলকে কীভাবে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা যায়, তার একটি বড় সুযোগ ও পরীক্ষা। বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি তাই কেবল ‘চীনের সঙ্গে সংযোগ হবে কি না’ এতটুকু নয়; বরং ‘সংযোগ তৈরি হলে বাংলাদেশ তার কতটা মূল্য নিজের অর্থনীতি, শিল্প ও মানুষের উন্নয়নে রূপান্তর করতে পারবে’ সেটিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। যদি জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সমন্বিত করে এগোনো যায়, তবে এই সংযোগ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। ভূগোল তখন আর শুধু অবস্থান থাকবে না; সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার মাধ্যমে সেটিই হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি।
লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ