০৪:০৭ এম
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসের সঙ্গে তেলের উপস্থিতি পেট্রোবাংলা সনাক্ত করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে গ্যাসটিকে থার্মোজেনিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গ্যাসের উৎস ও মজুত সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ১৫ দিন পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এই সময় গ্যাসের প্রবাহ অব্যাহত থাকলে তা বন্ধ করার জন্য রিলিফ কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে আপাতত পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা আগুন নেভানোর বা গ্যাস বের হওয়ার পথ বন্ধ করার নির্দেশনা দিয়েছেন। তাদের মতে, জোর করে আগুন নেভানো বা গ্যাসের পথ বন্ধ করা হলে ভূগর্ভে গ্যাস জমে উচ্চচাপ তৈরি হতে পারে, যা বড় ধরনের বিস্ফোরণের আশঙ্কা সৃষ্টি করতে পারে।
আরও পড়ুন: জাতীয় যুব পুরস্কার-২০২৬ পেলেন নেছারাবাদের শিরিন খানম
শুক্রবার রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, "প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে নির্গত গ্যাসটি থার্মোজেনিক বলে মনে হচ্ছে। এর সঙ্গে কিছুটা তেলের মিশ্রণ বা উচ্চ হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতিও রয়েছে।" গ্যাসের উৎস ও পরিমাণ নিশ্চিত করতে ১৫ দিন নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা হবে। এই সময় আগুনের শিখার উচ্চতা ও গ্যাস নির্গমনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে।
মো. শোয়েব আরও জানান, পর্যবেক্ষণ শেষে যদি আগুনের শিখা একই রকম থাকে বা উচ্চতা বাড়ে, তাহলে গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ করতে রিলিফ কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এই ক্ষেত্রে সাইড ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হতে পারে। মূল কূপের পাশ দিয়ে বিকল্প কূপ খনন করে গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ করার চেষ্টা করা হবে। তবে গ্যাসের প্রবাহ কমে গেলে বা বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, "কোনোভাবেই জোর করে আগুন নেভানো যাবে না। গ্যাস বের হওয়ার পথও বন্ধ করা যাবে না। এতে ভূগর্ভে গ্যাস জমে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।" এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
আশপাশের স্তর থেকেও বের হচ্ছে গ্যাস
আরও পড়ুন: পিসিটির পর সিসিটির দিকে নজর দিচ্ছে সৌদি কোম্পানি
ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে আশপাশের কয়েকটি ভূতাত্ত্বিক স্তর থেকেও গ্যাস জ্বলতে দেখা গেছে বলে জানান পেট্রোবাংলার এই কর্মকর্তা। ভূগঠনের পরিবর্তনের কারণে এসব স্তর দিয়ে গ্যাস বের হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে পরবর্তী সময়ে বাপেক্স ওই এলাকায় ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) ভূকম্পন জরিপ পরিচালনা করবে। জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে ভূগর্ভে গ্যাসের মজুতের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক মজুত পাওয়া গেলে সেখানে নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুকতাদির বলেন, "এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাপেক্সের অভিজ্ঞতা ও কারিগরি সক্ষমতা রয়েছে। তবে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।"
২০০ মিটারে ১৪৪ ধারা, তবু মানুষের ভিড়
আরও পড়ুন: আলফাডাঙ্গায় যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে দ্বন্দ্ব, সংবাদ সম্মেলন
গত ২৭ অক্টোবর সকালে উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইনানী ছোট খাল ব্রিজসংলগ্ন একটি বাড়িতে নলকূপ বসানোর কাজ চলছিল। মাটির প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে পাইপ প্রবেশ করানোর পর গ্যাস বের হতে শুরু করে। একপর্যায়ে গ্যাসে আগুন ধরে যায়। শুক্রবার পর্যন্ত টানা চার দিন ধরে আগুন জ্বলছিল।
ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। পরে গ্যাসের উৎস ও প্রকৃতি জানতে বাপেক্সের কারিগরি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
এদিকে জননিরাপত্তার স্বার্থে ঘটনাস্থলের ২০০ মিটারের মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ করেছে উপজেলা প্রশাসন। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পান্না আক্তার স্বাক্ষরিত আদেশে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।
আদেশে ঘটনাস্থল ও আশপাশে আগুন জ্বালানো, ধূমপান, দিয়াশলাই বা লাইটার ব্যবহারসহ আগুনের স্ফুলিঙ্গ তৈরি হতে পারে এমন কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
আরও পড়ুন: জাতীয় যুব দিবসে শ্রেষ্ঠ আত্মকর্মীর সম্মাননা পেলেন জান্নাতুল নাঈমা!
এলাকায় মাইকিং করার পাশাপাশি কাঁটাতারের বেড়া ও লাল পতাকা টাঙানো হয়েছে। কিন্তু এরপরও প্রতিদিন ঘটনাস্থলে ভিড় করছেন উৎসুক মানুষ। বিশেষ করে বিকেলের দিকে মানুষের সমাগম বাড়ছে। অনেকে ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, "বাপেক্সের পক্ষ থেকে আগে ৭২ ঘণ্টার সময়সীমার কথা বলা হয়েছিল। তাঁদের আশা ছিল, এর মধ্যে আগুনের তীব্রতা কমবে। কিন্তু আগুন জ্বলতে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে।"
আরেক বাসিন্দা জসিম উদ্দিন বলেন, "আগুনের কারণে সড়কে চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। যানবাহন নিয়ে যাতায়াতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাতায়াতে কষ্ট হচ্ছে।"
স্থানীয় শহিদুল আলম বলেন, "প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অনেকে কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করে ঘটনাস্থলের কাছে যাচ্ছেন। এভাবে মানুষের ভিড় চলতে থাকলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।"
আরও পড়ুন: মধ্যপাড়া খনিতে পাথর উত্তোলনে জিটিসির নতুন রেকর্ড
গ্যাসের আগুনের কারণে একদিকে নিরাপত্তাঝুঁকি, অন্যদিকে স্থানীয়দের স্বাভাবিক চলাচলে ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঘটনাস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছেন স্থানীয়রা।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন