০৩:২০ এম
ক্যানসার প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয় অপরিহার্য। এ উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয়েছে। তারা হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি) টিকাদান, জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসারের স্ক্রিনিং এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
রবিবার (১৮ অক্টোবর) রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ডা. মিল্টন হলে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে এসব প্রস্তাব ও সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের ২১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘অ্যাডভান্সিং ক্যান্সার এডুকেশন, রিসার্চ অ্যান্ড কেয়ার: বিএমইউ’স ভিশন অ্যান্ড লিডারশিপ’ শীর্ষক এই বৈঠকের আয়োজন করে ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগ এবং বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএইচআরএফ)।
বৈঠকের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী। চিকিৎসক, গবেষক, শিক্ষক, ওষুধশিল্পের প্রতিনিধি, চিকিৎসাপ্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমকর্মীরা এই বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন।
আরও পড়ুন: দক্ষিণ আফ্রিকায় সাঁতার কাটতে গিয়ে হাঙরের আক্রমণে ৬৫ বছরের নারীর মৃত্যু
বক্তারা বৈঠকে উল্লেখ করেন, ক্যানসার চিকিৎসার উন্নয়নে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো বৃদ্ধির পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরি, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষায়িত বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়ও প্রয়োজন। বিএমইউতে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা হলে চিকিৎসা, উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি উদ্ভাবন এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতার ক্ষেত্রও বিস্তৃত হবে।
উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, "ক্যানসার শিক্ষা, গবেষণা ও চিকিৎসাসেবায় বিএমইউর নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী করতে হবে।" তিনি উচ্চতর চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা, দক্ষ জনবল তৈরি, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
তিনি ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে বলেন, "এর মাধ্যমে ক্যানসার-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগ ও বিশেষায়িত সেবার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা সম্ভব হবে।" এর ফলে উন্নত চিকিৎসা, স্নাতকোত্তর শিক্ষা, গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বক্তারা ক্যানসারের বোঝা কমাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তারা তামাক নিয়ন্ত্রণ, এইচপিভি টিকাদান, জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসারের স্ক্রিনিং এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন।
আরও পড়ুন: রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পৌঁছেছে ইউরেনিয়ামের দ্বিতীয় চালান
বক্তারা বলেন, "প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার শনাক্ত করা গেলে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ বৃদ্ধি পায়।" এজন্য রোগের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং স্ক্রিনিং সহজলভ্য করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। রোগ শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে চিকিৎসা পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন ধাপের মধ্যে কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশে ক্যানসারের প্রকৃত চিত্র জানতে জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন বক্তারা। এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হলে দেশে ক্যানসারে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা, রোগের ধরন ও বিস্তারের প্রবণতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যাবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন, গবেষণা এবং চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ সহজ হবে।
বৈঠকে বিএমইউর ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন বিভাগের অগ্রগতি, অর্জন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বৈজ্ঞানিক উপস্থাপনা দেন। তিনি বলেন, "ক্যানসার চিকিৎসায় ক্লিনিক্যাল অনকোলজি, মেডিক্যাল অনকোলজি, সার্জিক্যাল অনকোলজি, প্যাথলজি, রেডিওলজি, নিউক্লিয়ার মেডিসিন ও মেডিক্যাল ফিজিকসসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।" এতে রোগীর জন্য উপযুক্ত চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ধারণ এবং চিকিৎসার মান উন্নয়নে সহায়তা মিলবে।
উপস্থাপনায় মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিউমার বোর্ডের কার্যক্রম, গবেষণাভিত্তিক চিকিৎসা এবং রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি ও টার্গেটেড থেরাপির মতো আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: অস্ট্রেলিয়া আইনপ্রণেতার ওপর হামলার অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আদালতে হাজির
বক্তারা বলেন, "ক্যানসার চিকিৎসায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি এসব যন্ত্র পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।" এজন্য প্রশিক্ষিত ক্যানসার বিশেষজ্ঞ, মেডিক্যাল ফিজিসিস্ট, রেডিওথেরাপি টেকনোলজিস্ট, দক্ষ নার্সসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করা জরুরি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষায়িত ক্যানসার চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণে সরকারি বিনিয়োগ ও কার্যকর পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তারা।
ক্যানসার গবেষণা ও চিকিৎসাপ্রযুক্তির উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন আলোচকেরা। বৈঠকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও গবেষকেরা অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন ওষুধশিল্প এবং চিকিৎসাপ্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও।
আলোচনায় বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিক্যাল ফিজিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নতুন চিকিৎসাপ্রযুক্তি ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনা উঠে আসে। বক্তারা মনে করেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে দেশে ক্যানসার গবেষণা এবং আধুনিক চিকিৎসার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, বিএমইউ এবং অন্যান্য চিকিৎসা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যৌথ গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণে সহযোগিতা বৃদ্ধির আহ্বানও জানানো হয়।
আরও পড়ুন: রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নতুন তথ্য দিলেন জাতিসংঘের বিশেষ দূত জুলি বিশপ
বৈঠকে বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক এজাজ ও সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম শুভসহ সংগঠনটির নেতারা এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।
বক্তারা বলেন, "ক্যানসার নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করা, প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে মানুষকে জানানো এবং চিকিৎসা নিতে দেরি করার প্রবণতা কমাতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।" এজন্য ক্যানসার প্রতিরোধ, আধুনিক চিকিৎসা ও গবেষণার অগ্রগতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য এবং বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য প্রচার করা প্রয়োজন।
২০০৫ সালের ১৯ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত বিএমইউর ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগ গত ২১ বছরে ক্যানসার চিকিৎসা, স্নাতকোত্তর শিক্ষা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি ও গবেষণায় ভূমিকা রেখেছে। বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন।
বিভাগটিতে রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি ও টার্গেটেড থেরাপিসহ বিভিন্ন আধুনিক ক্যানসার চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্নাতকোত্তর শিক্ষা, মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিউমার বোর্ড, চিকিৎসা পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও আন্তর্জাতিক একাডেমিক সহযোগিতার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
আরও পড়ুন: ৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষে সাধারণ ছুটি ঘোষণা
বক্তারা বলেন, "ক্যানসার প্রতিরোধ, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষায়িত হাসপাতাল, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ওষুধশিল্প, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।" বিএমইউতে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা হলে শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও সমন্বিত চিকিৎসাসেবার পরিসর আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তারা।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন