০৬:০৭ পি.এম
দিনাজপুর, ৬ অক্টোবর, ২০২৬ : জেলার ১৩টি উপজেলায় কৃষকরা আগাম জাতের আলু চাষের মাধ্যমে স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছেন। দিনাজপুর জেলায় এ পর্যন্ত সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর বীজ রোপণ সম্পন্ন হয়েছে।
অগ্রহায়ণ মাসের প্রথমদিকে বাজারে নতুন আলু বিক্রির উদ্দেশ্যে আলুর বীজ রোপণ এবং ক্ষেতের পরিচর্যায় কৃষকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। দিনাজপুর কৃষি অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. আফজাল হোসেন গতকাল সোমবার বাসস’কে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, এবারে জেলায় ৪৮ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আগাম জাতের আলু চাষ হবে ১২ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে। গতকাল সোমবার (৫ অক্টোবর) পর্যন্ত জেলার ১৩টি উপজেলায় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে আগাম জাতের আলু বীজ রোপণ সম্পন্ন করেছেন কৃষকরা। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে আলুর বীজ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আরও পড়ুন: শীতের আগমনে গফরগাঁওয়ে প্রস্তুতির ধুম, বাজারে শীতকালীন পণ্য আসছে
তিনি আরও বলেন, ভালো দাম পাওয়ার আশায় কৃষকরা আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি সময়ে আগাম জাতের আমন ধান কেটে ওই জমিতে পুনরায় আলু চাষের জন্য জমি প্রস্তুত করেছেন। এবার কৃষকরা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আগাম জাতের আলু চাষের জন্য জমি প্রস্তুত শেষে আলুর বীজ রোপণ কার্যক্রম শুরু করেছেন।
উপ পরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানান, ইতোমধ্যে অনেক কৃষকের আলুর বীজ লাগানোর সময় প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন হয়ে গেছে। তাদের লাগানো আলুর বীজ থেকে গাছ ফুটতে শুরু করেছে। সারিবদ্ধভাবে গাছের গোড়া মাটি দিয়ে বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। বাংলা নবান্নের অগ্রহায়ণের প্রথমেই নতুন আলু দিয়ে নবান্ন উৎসব হবে বলে অনেক আলু চাষি আশা করছেন।
দিনাজপুর সদর উপজেলার মহব্বতপুর গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম বাসস’কে বলেন, এবারে আলুর বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরির দাম বেড়ে যাওয়ায় আগাম জাতের আলু চাষে ব্যয় বেড়ে গেছে। তবুও কৃষকরা আগাম জাতের আলু চাষে ভালো লাভের স্বপ্ন দেখছেন।
তিনি বলেন, চাষাবাদে ব্যয় বাড়লেও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় স্বল্পমেয়াদি আগাম আমন ধান কেটে ঘরে তোলার পর ওই জমিতে আলু রোপণের জন্য জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে। আলু লাগানোর জমি পরিচর্যা, সার প্রয়োগ, হিমাগার থেকে বীজ সংগ্রহ ও রোপণে কৃষকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন।
আরও পড়ুন: সৌরবিদ্যুতে সেচকাজে সাশ্রয়ের নতুন দিগন্ত দেখছেন চাষিরা
জেলার বীরগঞ্জ উপজেলার মাহানপুর গ্রামের কৃষক মো. আব্দুর রহিম বাসস’কে জানান, তিনিসহ অধিকাংশ কৃষক প্রস্তুতকৃত জমিতে আলুর বীজ রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তারা এবার অ্যাস্টেরিক ও কার্টিনাল জাতের বীজ আলু জমিতে রোপণ করছেন।
ফুলবাড়ী উপজেলার কৃষক মো. মাহামুদ আলী বলেন, এ বছর ক্ষেতে উৎপাদিত আগাম জাতের আলুর ভালো দাম পাওয়ার আশা করছেন।
তিনি এবার আলু চাষে বেশি মনোযোগী হয়েছেন। গত বছর তিনি সাড়ে ৮ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। এ বছর ১২ বিঘা জমিতে আলুর চাষ শুরু করেছেন। তবে বীজের দাম বেশি থাকায় এবং শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় গতবারের তুলনায় এবার আলু চাষের খরচ বেড়ে গেছে বলে তিনি জানান।
জেলার একাধিক চাষি জানান, প্রতি বছর অতিরিক্ত মুনাফার লক্ষ্যে তারা আগাম জাতের আলু চাষ করেন। তবে চলতি বছর আলুর বীজের দাম তুলনামূলকভাবে একটু বেশি। তারপরও কৃষকরা হিমাগার থেকে বীজ কিনে আলু চাষ শুরু করছেন।
আরও পড়ুন: গাংনীর একাঙ্গী চাষিরা পচন রোগে নিঃস্ব, ৫০ কৃষক দিশেহারা
বিরামপুর উপজেলার শ্রমিকরা জানান, এ উপজেলার বেপারীটোলা গ্রামের আদর্শ কৃষক মো. শহিদুর রহমানের ১০ বিঘা জমিতে অ্যাস্টেরিক জাতের আলু রোপণের কাজ করছেন। শ্রমিকরা এক বেলা খাবারসহ ৫শ’ টাকা করে মজুরি পাচ্ছেন। এ মুজরির ইনকাম দিয়ে তাদের সংসার চলে।
কৃষি বিভাগ জানায়, জেলার বিরল, চিরিরবন্দর ও বীরগঞ্জ উপজেলায় প্রতি বছর আলুর চাষ ও উৎপাদন বেশি হয়ে থাকে। চাষিরা তাদের আবাদের জমিগুলো ফেলে না রেখে আগেভাগেই আলু চাষ শুরু করেছেন। আগাম জাতের আলু উত্তোলন করে ওই জমিতে আবার বিভিন্ন ধরনের রবি মৌসুমের শাক-সবজি চাষ করবেন। কৃষি বিভাগের মাঠকর্মীদের পরামর্শে আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহারে উঁচু জমিতে বছরের ৩ থেকে ৪টি ফসল উৎপাদন করতে সক্ষম হচ্ছেন কৃষকরা। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সবজি জাতীয় ফসল চাষ করে এ অঞ্চলের কৃষকরা অধিক মুনাফা অর্জন করে সাবলম্বী হচ্ছেন।
কৃষি বিভাগ আরো জানায়, বর্তমানে বাজার থেকে কৃষকরা লাল পাকরি আলুর বীজ কিনছেন প্রতি কেজি ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়, আর কার্ডিনাল জাতের বীজ প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৫৫ টাকায়।
জেলার বিরল উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি কর্মকর্তা মিজ রুম্মান আক্তার বাসস’কে বলেন, উপজেলার বিভিন্ন এলাকার উঁচু জমিতে আগাম জাতের আলু চাষ শুরু হয়েছে। আগাম জাতের অ্যাস্টেরিক, কার্টিনাল, লাল পাকড়ি, রোমানা ও ডায়মন্ড আলু রোপণের ৫৫ থেকে ৬৫ দিনের মধ্যে তা বিক্রির উপযোগী হয়ে থাকে। অধিক পুষ্টিকর এ আলু চাষ করে তুলনামূলক কম সময়ের ব্যবধানে সহজেই লাভবান হওয়া যায়। যেসব চাষি সঠিকভাবে আলুর জমিতে যত্ন ও পরিচর্যা করতে পারবেন, তাদের ভালো ফলন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি হয়ে থাকে।
আরও পড়ুন: গোদাগাড়ীতে পদ্মার তীব্র ভাঙনে দুই শতাধিক বিঘা ফসলি জমি ও ডিপটিউবওয়েল ঘর নদীগর্ভে বিলীন
তিনি বলেন, গত বছরের মতো এবারও আগাম আলু চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা। আলু চাষের জন্য বেলে ও দোঁ-আশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী। আগের মতো এখন আর চাষিরা জমি ফেলে রাখেন না। মৌসুমের ভারসাম্য অনুযায়ী বিভিন্ন সবজি আবাদের পর তারা এবারও আগাম আলু চাষ করছেন। আগাম জাতের অ্যাস্টেরিক ও কার্টিনাল আলুতে অতিরিক্ত মুনাফা হওয়ায় চাষিরা বেশ আকৃষ্ট হয়েছেন।
বিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কমল কৃষ্ণ রায় বাসস’কে বলেন, শুকনো মাটির জমি আলু চাষের জন্য উপযোগী। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় তুলনামূলক উঁচু জমিতে আলু চাষ শুরু হয়েছে। অতিরিক্ত লাভের আশায় অনেকেই তাদের জমিতে আলু চাষ শুরু করেছেন। আমন ধান কাটার পর এসব জমিতে একযোগে আলুর আবাদ শুরু হয়েছে।
দিনাজপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন বাসস’কে বলেন, বৃহত্তর দিনাজপুর অঞ্চলে প্রতিবছর আলুর অধিক উৎপাদন হয়। এ অঞ্চলের উৎপাদিত আলু অর্ধেকেরও বেশি এখান থেকে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার চাহিদা পূরণে সরবরাহ করা হয়। চলতি বছর সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আলু চাষে কৃষকদের উৎসাহ দেয়া হচ্ছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে।
আরও পড়ুন: শিবগঞ্জে কৃষি বিভাগের অভিযানে ১৬৯ বস্তা রাসায়নিক সার জব্দ
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন