১০:২৭ পি.এম
চার বছর অপেক্ষার পর বিশ্বকাপ ফুটবলের মহাযজ্ঞ আবারও এসেছে। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের মতো বাংলাদেশেও ফুটবলপ্রেমীরা উন্মাদনায় মেতেছে। তবে যদি ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে যাওয়া হয়, তবে সেটি মনে হবে বিশ্বকাপ যেন টেলিভিশনের পর্দায় নয়, বরং নেমে এসেছে মানুষের ঘর এবং আঙিনায়। কবি গোলাম মোস্তফার বাড়ি কেন্দ্র করে পুরো গ্রাম এখন ফুটবলের রঙে সাজানো হয়ে গেছে। পতাকার দোল, রঙিন দেয়ালচিত্র, প্রিয় তারকাদের প্রতিকৃতি এবং উৎসবমুখর মানুষের পদচারণায় গ্রামটি এখন যেন এক টুকরো বিশ্বকাপ ফ্যান জোনে পরিণত হয়েছে। গ্রামে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে অন্যরকম এক দৃশ্য। চারপাশে শুধুই ফুটবল আর ফুটবল। রাস্তা দুপাশে উড়ছে বিভিন্ন দেশের পতাকা। আর্জেন্টিনার নীল-সাদা, ব্রাজিলের হলুদ-সবুজ সহ নানা দলের পতাকায় রঙিন হয়ে উঠেছে পুরো পরিবেশ।
কবি গোলাম মোস্তফার বাড়ির মূল ফটক থেকে শুরু করে আঙিনা, কাচারিঘর, বসতঘর এবং গাছপালা- সবখানেই ফুটে উঠেছে বিশ্বকাপের আবহ। দেয়াল, গাছ, বাঁশের খুঁটিতে টাঙানো হয়েছে লিওনেল মেসি, নেইমার জুনিয়র, কিলিয়ান এমবাপ্পে সহ বিশ্ব ফুটবলের জনপ্রিয় তারকাদের প্রতিকৃতি। কোথাও ফুটবল, কোথাও বিশ্বকাপ ট্রফির প্রতীক এবং আবার কোথাও ফুটবলপ্রেমীদের আবেগের নানা গল্প ফুটে উঠেছে। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এখানে শত শত দর্শনার্থী ভিড় করছেন। কেউ পরিবার নিয়ে এখানে ঘুরতে আসছেন, কেউ বন্ধুদের নিয়ে ছবি তুলছেন। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভ করছেন অথবা ভিডিও ধারণ করে মনোহরপুরের এই ব্যতিক্রমী আয়োজনের গল্প ছড়িয়ে দিচ্ছেন। শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাস যেন সবচেয়ে বেশি। প্রিয় তারকাদের ছবি দেখে তারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছে। কারো গায়ে আর্জেন্টিনার জার্সি, কেউ আবার ব্রাজিলের পতাকা কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফুটবলপ্রেমের এই উৎসব যেন বয়সের সব সীমারেখা মুছে দিয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, এই আয়োজন আর মাত্র একটি বাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি পুরো গ্রামের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। যদিও দলভেদে সমর্থন রয়েছে, তবুও সবাই একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করছেন। সন্ধ্যা নামলে চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বাড়ির উঠোন- সবখানে জমে উঠছে বিশ্বকাপ নিয়ে আলোচনা।
আরও পড়ুন: হেমন্তের শুরুতে ময়মনসিংহে শীতের আমেজ
গ্রামবাসীরা বলছেন, বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু এই আয়োজনের স্মৃতি দীর্ঘকাল বেঁচে থাকবে মানুষের মনে। কারণ এটি শুধুমাত্র ফুটবল নয়, বরং মানুষের ভালোবাসা, ঐক্য এবং উৎসবপ্রিয়তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।
স্থানীয় বাসিন্দা সিজার জিকরুল মন্তব্য করেন, 'বিশ্বকাপ এলেই আমাদের গ্রামে আলাদা আনন্দ শুরু হয়। তবে এবারের সাজসজ্জা আগের সব আয়োজনকে ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষ আসছে এবং গ্রামের পরিচিতিও বাড়ছে।' দর্শনার্থী ফরহাদ হোসেন বলেন, 'ফেসবুকে ছবি দেখে এসেছি। এখানে এসে মনে হচ্ছে আমি কোনো বিদেশি ফ্যান জোনে চলে এসেছি। গ্রামের মধ্যে এমন আয়োজন সত্যিই অসাধারণ।' স্থানীয় তরুণ শাওন শ্রাবন বলেন, 'আমরা চাই বিশ্বকাপের আনন্দ শুধুমাত্র টেলিভিশনের পর্দায় সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক। তাই আমরা সবাই মিলে এই আয়োজন করেছি। দর্শনার্থীদের ভালোবাসাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।' দর্শনার্থী শিহাব হোসেন বলেন, 'ফুটবল আমাদের আবেগের জায়গা। এই গ্রাম সকলের সঙ্গে বিশ্বকাপের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার লক্ষ্য থেকে এই আয়োজন করেছে। নিজেদের উদ্যোগে কয়েক সপ্তাহ ধরে বাড়ি ও আশপাশের এলাকা সাজিয়েছি। উদ্দেশ্য ছিল গ্রামে একটি উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করা এবং নতুন প্রজন্মকে খেলাধুলার প্রতি উৎসাহিত করা।' বিশ্বকাপের উত্তাপ যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে মনোহরপুরে মানুষের আনাগোনা। ফুটবলের ভাষায় যেন পুরো গ্রাম আজ একটাই বার্তা দিচ্ছে- বিশ্বকাপ শুধু স্টেডিয়ামে নয়, মানুষের হৃদয়ের ভেতরেও খেলা করে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন