বৃহস্পতিবার, ১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ইং
০১:৪১ পি.এম
নাইজেরিয়ার চলচ্চিত্র শিল্প ‘নলিউড’-এর অন্যতম পথিকৃৎ ও প্রখ্যাত অভিনেতা ওলু জ্যাকবস ৮৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন। এই গুণী অভিনেতা থিয়েটার, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তার অভিনয়ের মাধ্যমে আলো ছড়িয়েছেন। তার প্রয়াণে নাইজেরীয় বিনোদন জগতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তার স্ত্রী ও প্রবীণ অভিনেত্রী জোক সিলভা এক বিবৃতিতে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।
১৯৪২ সালে জন্ম নেওয়া ওলু জ্যাকবস অভিনয়ের তালিম নেন লন্ডনের সম্মানজনক ‘রয়্যাল একাডেমি অব ড্রামাটিক আর্ট’-এ। এরপর তিনি ব্রিটিশ টেলিভিশন ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তার কর্মজীবন শুরু করেন। দেশে ফিরে আসার পর তিনি নলিউডের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত হন। পর্দায় তার শক্তিশালী উপস্থিতি ও বহুমুখী অভিনয়ের জন্য তিনি আফ্রিকা মুভি একাডেমি অ্যাওয়ার্ডের ‘সেরা অভিনেতা' ও ‘আজীবন সম্মাননা’সহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০১১ সালে নাইজেরীয় চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদানের জন্য তাকে দেশটির জাতীয় সম্মাননা ‘এমএফআর’-এ ভূষিত করা হয়।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ‘লিউই বডি ডিমেনশিয়া’ নামক একটি জটিল মস্তিষ্কের রোগে ভুগছিলেন। এই কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি প্রচারমাধ্যমের আড়ালে ছিলেন। অসুস্থতার কারণে অতীতে বেশ কয়েকবার তার মৃত্যুর গুজব ছড়ালেও পরিবার তা খণ্ডন করেছিল। দীর্ঘ লড়াই শেষে এই কিংবদন্তির বিদায়ের পর তার স্ত্রী জোক সিলভা পরিবারকে নিভৃতে শোক পালনের সুযোগ দিতে সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদকর্মীদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
বাংলাদেশের তরুণ উইকেটরক্ষক-ব্যাটার আকবর আলী প্রথমবারের মতো বিদেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলার সুযোগ পাচ্ছেন। তিনি নেপাল প্রিমিয়ার লিগের (এনপিএল) আসন্ন তৃতীয় আসরে কর্ণালি ইয়াকসের জার্সিতে মাঠে নামবেন। আকবর আলী ২০২০ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিনায়ক।
ফ্র্যাঞ্চাইজিটি আকবরকে দলে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি একটি অভিনব উপায়ে প্রকাশ করেছে। তারা সরাসরি ঘোষণা না দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুব বিশ্বকাপের ট্রফির সঙ্গে ব্যাটিং ও উইকেটকিপিংয়ের সরঞ্জামের ছবি পোস্ট করে এই সাইনিংয়ের বার্তা দেয়।
আকবর ২০২০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে ভারতকে হারিয়ে বাংলাদেশকে ঐতিহাসিক অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জেতানোর অন্যতম কারিগর ছিলেন। ফাইনালে চাপের মুখে তার দায়িত্বশীল ব্যাটিং দলকে ট্রফি এনে দিয়েছিল। টি-টোয়েন্টি সংস্করণে এখন পর্যন্ত ৮৬ ম্যাচে ১৩০.৬৭ স্ট্রাইক রেটে ১ হাজার ১৮০ রান সংগ্রহ করা এই ক্রিকেটার এবারই প্রথম বিদেশের লিগে নিজের নাম লেখাতে যাচ্ছেন।
নেপাল প্রিমিয়ার লিগের এবারের আসরে আকবরের সঙ্গে মাঠ মাতাবেন বাংলাদেশের অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। পোখারা অ্যাভেঞ্জার্স তাকে দলে ভিড়িয়েছে।
এনপিএলের তৃতীয় আসর আগামী ১৭ নভেম্বর শুরু হবে, যা ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। কাঠমাণ্ডুর কীর্তিপুরে অবস্থিত ত্রিভুবন ইউনিভার্সিটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট গ্রাউন্ডে টুর্নামেন্টের সবকটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। আসরের বাকি দলগুলো হলো, বিরাটনগর কিংস, চিতওয়ান রাইনোস, জনকপুর বোল্টস, কাঠমাণ্ডু গোরখাস, লুম্বিনি লায়ন্স ও সুদূর পশ্চিম রয়্যালস।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, দেশের মানুষের সকল ভালো অর্জনকে সরকার স্বীকৃতি প্রদান করবে। তিনি উল্লেখ করেন, ‘দেশের সন্তানরা মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে যা কিছু ভালো অর্জন করবে, সরকার রাষ্ট্রের অবস্থান থেকে সেই অর্জনের স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করবে।’
আজ বৃহস্পতিবার সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পবিত্র কোরআন প্রতিযোগিতায় পুরস্কার বিজয়ী বাংলাদেশের হাফেজদের সংবর্ধনা প্রদানকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আপনারা যে পুরস্কারটা জিতে এসেছেন, এটা শুধু আপনাদেরই অর্জন নয়। আমি মনে করি, এটা বাংলাদেশের সব মুসলমানের অর্জন।’
তিনি জানান, ভবিষ্যতে এসব প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য সরকারের যদি কোনো সহযোগিতা প্রয়োজন হয়, তা করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই, আমাদের ছেলেমেয়েরা এরকম আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাতে অংশগ্রহণ করুক এবং অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে তাদের নিজেদের জন্য, দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য তারা সম্মান এবং গৌরব নিয়ে আসুক।’
তিনি জানান, সবার সহযোগিতায় দেশের জন্য ভালো কিছু পরিবর্তন করতে চায় সরকার। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। সবাইকে নিয়ে আমরা একসঙ্গে চলতে চাই।’
সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ১৩৩টি দেশের প্রতিযোগীদের মধ্যে বাংলাদেশের হাফেজ মোহাম্মদ জাকারিয়া ১৫ পারা হিফজ, তাজবিদ ও সুন্দর তিলাওয়াত বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেন। হাফেজ শেখ মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান আশরাফী ৩০ পারা হিফজ, তাজবিদ ও সুন্দর তিলাওয়াত বিভাগে তৃতীয় হন। এছাড়া, হাফেজা রাবেতা বিনতে রমজান ১৫ পারা এবং হাফেজা মুসফিরা বিনতে মাহমুদ ৩০ পারা হিফজ, তাজবিদ ও সুন্দর তিলাওয়াত বিভাগে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
ঢাকা, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ : আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, সরকার নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় যেকোনো পরিস্থিতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আজ ‘মানব পাচার এবং অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া শক্তিশালীকরণ বিষয়ক জাতীয় পরামর্শ সভা’য় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন। সভাটি আইন মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি) আয়োজিত হয়েছিল।
রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে অনুষ্ঠিত এ সভায় আইনমন্ত্রী বলেন, মানব পাচার হলো সবচেয়ে গুরুতর, অমানবিক এবং নিষ্ঠুর কাজগুলোর একটি। এই প্রক্রিয়ায় ঠগ, অপরাধী ও মাফিয়ারা অর্থ আদায় করে। তারা দেশের জীবনের বিনিময়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করে। সরকার এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
মন্ত্রী আরও জানান, মানব পাচার রোধে বেশ কিছু আইন সংশোধন করা হয়েছে। তিনি বলেন, "আমরা বেশ কিছু আইন সংশোধন করেছি। আমরা মানব পাচারের সংজ্ঞাকে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত করেছি, যা মানব পাচারের বিস্তৃত পরিসরে প্রয়োগ করা যেতে পারে।" ২০২৬ সালের মানব পাচার আইনের অধীনে এই ধরনের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ১৮৮৭ সালের জুয়া আইন সংশোধন করা হয়েছে। অনলাইন জুয়া, পাচার এবং এ জাতীয় অবৈধ কার্যক্রমকে আইনি কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়া আরও কিছু আইন প্রবর্তন করা হয়েছে, যা মানব পাচারের দিকটিও কভার করতে পারে।
আইনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে মানব পাচার বিষয়ক প্রোটোকল অনুসমর্থন করেছে এবং তখন থেকেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
তিনি কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করেন। আইনমন্ত্রী বলেন, "আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশ সতর্ক। কিন্তু তাদের জনবলের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, অভিযোগকারীদের কাছ থেকে যথাযথ সহায়তার সীমাবদ্ধতা রয়েছে, উপযুক্ত প্রমাণ ও অন্যান্য বিষয়াদি পাওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।"
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, মানব পাচার আগের মতো ব্যাপক নেই। তিনি বলেন, "এটা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, মানব পাচার এখন আর আগের মতো এতটা ব্যাপক নেই।" তিনি উল্লেখ করেন, দেশে বেকারত্বের সংকট রয়েছে এবং মানুষকে জীবিকার সন্ধানে বিদেশে যাওয়া থেকে আটকানো সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ট্যুরিস্ট ভিসা ব্যবহার করে বিদেশে গিয়ে অনেকেই সেখানে অবৈধ অভিবাসী হয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে তিনি বলেন, "আমরা আপনাদের সহায়তাও চাইছি, কীভাবে আমরা বিদেশে যাওয়া অভিবাসী মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে পারি।"
আইনমন্ত্রী নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় সরকারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, "আমরা যেকোনো পরিস্থিতিতে আমাদের নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।" তিনি বলেন, "আমাদের কিছু ঘাটতি থাকতে পারে, তবে আমরা আপনাদের যেকোনো ভালো সুপারিশকে স্বাগত জানাই।"
আইন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. খাদেম উল কায়েসের সভাপতিত্বে আজকের অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ইউএনওডিসির দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক প্রতিনিধি ক্রিস্টিয়ান হোলগে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তনের সাথে সাথে একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দ্বারা শুরু হওয়া যুদ্ধ কার্যত শেষ হয়ে গেছে। লড়াইটি শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে এক ধরনের স্থবিরতায় পরিণত হয়েছে। তবে বর্তমানে যা প্রকাশিত হচ্ছে তা একেবারেই নতুন, এবং এই পরিস্থিতি আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে- তা একটি বড় অজানা প্রশ্ন।
আমাদের পশ্চিমে একটি বিশাল শক্তির উত্থান ঘটছে। বহু দশক ধরে নিষেধাজ্ঞায় বন্দি থাকা এবং ক্রমাগত যুদ্ধের হুমকিতে থাকা ইরান ১৯৭৯ সালের পর থেকে বৈশ্বিক ব্যবস্থার বাইরে চলে গিয়েছিল। কিন্তু ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে আমেরিকা তার সামরিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়ে যখন নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করেছে, তখন নিষেধাজ্ঞার দেয়ালের পেছনে বন্দী থাকা সেই দেশটি এখন এই অঞ্চলের একটি উদীয়মান পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
এই দিক থেকে চিন্তা করলে, ইরানের বর্তমান অবস্থা মার্কিন-চীন শীতল যুদ্ধকালীন উত্তেজনা শিথিলের পর (ডিটাঁত) চীনের সাথে যা ঘটেছিল তার মতো। ১৯৪৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে চীনকেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এভাবে কোণঠাসা ও বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। 'ডিটাঁত' ছিল বিশ্ব রাজনীতিতে তাদের সমঝোতামূলক পুনর্বাসনের সূচনা, এবং এর পর থেকে নেওয়া অভ্যন্তরীণ সংস্কারগুলোই চীনকে আজকের বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত করেছে।
তবে দুটি প্রধান জায়গায় ইরানের গল্পটি চীনের চেয়ে আলাদা। প্রথমত, ইরান কোনো বৈশ্বিক পরাশক্তি হতে যাচ্ছে না; তবে বিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলে সে নিশ্চিতভাবেই আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে চলেছে। দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক সম্প্রদায়ে ইরানের পুনঃপ্রবেশ চীনের চেয়ে অনেক বেশি বিশৃঙ্খল হবে, কারণ ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর যে নির্বাসনে তাকে পাঠানো হয়েছিল, সেখান থেকে তাকে লড়াই করেই বেরিয়ে আসতে হয়েছে।
অবকাঠামো ধ্বংসের মতো মারাত্মক কোনো চেষ্টা ছাড়া অঞ্চলে পরাশক্তি হিসেবে ইরানের এই উত্থান ঠেকানো এখন অসম্ভব।
তবে এই উত্থান প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে, যা একটি অত্যন্ত বিশৃঙ্খল এবং সম্ভবত সহিংস রূপ নিতে পারে। এখন অনেক কিছুই নির্ভর করছে ইরানের ভেতরের কোন গোষ্ঠীটি ক্ষমতার শীর্ষে ওঠে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের রাশ টেনে ধরে তার ওপর। চীনের ক্ষেত্রে, ডেন জিয়াওপিংয়ের মতো সংস্কারমুখী গোষ্ঠী নেতৃত্ব হাতে নেওয়ার আগেই কমিউনিস্ট পার্টির ভেতরে এক বড় ধরনের বোঝাপড়া ও রাজনৈতিক লড়াই ঘটেছিল। ১৯৬৬ সালে সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও ডেন জিয়াওপিংয়ের বহিষ্কার, ১৯৭১ সালে লিন বিয়াওর ব্যর্থ অভ্যুত্থান ও মঙ্গোলিয়ায় বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু, চৌ এনলাইয়ের উত্থান এবং তার বিপক্ষে 'গ্যাং অব ফোর'-এর অবস্থান, চৌ এনলাইয়ের মৃত্যুর পর ডেনের দ্বিতীয়বার বহিষ্কার এবং পরিশেষে ১৯৭৬ সালে মাও সেতুংয়ের মৃত্যুর পর ডেনের চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তন—এসব মিলিয়ে চীনের সেই পথটি ছিল চরম সংকটময়।
ঠিক তখনই চীন দৃঢ়তার সাথে সংস্কারের পথে হেঁটে মাওয়ের মতাদর্শের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসে। এরপর তারা ধীরে ধীরে এবং সতর্কতার সাথে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিজেদের অর্থনীতিকে বহির্বিশ্বের জন্য উন্মুক্ত করার পদক্ষেপ নেয়। সেই পথ ধরেই কয়েক দশক পর চীন বৈশ্বিক পরাশক্তি হয়ে ওঠে।
ইরান এখন তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের ঠিক একই রকম একটি মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। সুপ্রিম লিডার আলী খামেনির মৃত্যু এবং জিয়োনিস্ট মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের বিরুদ্ধে জয়ের পর ইরানকে এখন অভ্যন্তরীণ উপদলীয় কোন্দলের মুখোমুখি হতে হবে। তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে- তারা কি অতীতে আঁকড়ে থাকবে নাকি নতুন কোনো ভবিষ্যতের দিকে যাবে? এই প্রক্রিয়াটি উন্মোচিত হতে বহু বছর সময় লাগবে। তবে চীনের সাথে ইরানের মূল পার্থক্য হলো—ইরানের এই রূপান্তর প্রক্রিয়াটি ঘটছে একটি যুদ্ধকালীন প্রেক্ষাপটে।
এটা স্পষ্ট যে ইরানের ভেতরে একটি প্রাগমেটিক বা বাস্তববাদী গোষ্ঠী রয়েছে, যারা চায় যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটুক এবং দেশ পুনর্গঠনের কাজ শুরু হোক। কিন্তু অন্যদিকে আরেকটি শক্তিশালী গোষ্ঠী রয়েছে, যারা যুদ্ধ চালিয়ে গিয়ে আক্রমণকারীদের এক অপমানজনক পরাজয় উপহার দিতে চায়। তারা আফগানিস্তানে তালেবানরা যেভাবে মার্কিনিদের তাড়িয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যেও সেভাবে মার্কিন বাহিনীকে তড়িঘড়ি ও বিশৃঙ্খলভাবে পালানোর পথ নিশ্চিত করতে চায়।
প্রকৃত খেলা শুরু হবে ঠিক এর পর। মার্কিনিরা এ অঞ্চল ছেড়ে চলে গেলে ইরানি সামরিক মেশিন তাদের নজর ঘোরাবে উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর দিকে। সেখানে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয় আসবে। যুদ্ধের বিল তো ইতিমধ্যেই পেশ করা হয়ে গেছে! ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি 'ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস'-কে বলেছিলেন, জুন মাসের যুদ্ধে ইরানের যে ক্ষতি হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ না পাওয়া পর্যন্ত পারমাণবিক আলোচনায় ফেরার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। আমেরিকা তখন সেই দাবিকে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। এরপর ২০২৬ সালের মার্চে আমেরিকার কাছে দেওয়া নিজেদের পাল্টা প্রস্তাবে ইরান আবারও একই দাবি তোলে। এপ্রিলে তারা ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করে ২৭০ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৬ সালের জুনের মার্কিন-ইরান সমঝোতা স্মারকে বেড়ে ৩০০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।
এখন আর কারো এই দাবিকে হেসে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। হরমুজের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পাশাপাশি ইরান আগামী দিনগুলোতে এই দাবি আরও জোরদার করবে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন দেখবে এই সংঘাত তাদের কোনো স্বার্থ পূরণ করছে না, তখন তারা সরে যাবে এবং এই বিপুল বিল পরিশোধের ভার এসে পড়বে উপসাগরীয় রাজাদের কাঁধেই। আর তারা যখন এই অঙ্ক মিটিয়ে দেবে, তখন আবার নতুন দাবি আসবে, তারপর আরও একটি।
জিয়োনিস্ট জোট যদি পুরো দেশের অবকাঠামো ধূলিসাৎ করে দেওয়ার মতো কোনো ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ না চালায়, তবে আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে ইরানের উত্থান এখন ঠেকানো অসম্ভব। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ধরণের ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপের সম্ভাবনা কম হলেও একে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পরাশক্তি হওয়ার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই চলমান। হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করার পর, তারা এবার উপসাগরীয় রাজাদের অপরিসীম ধন-সম্পদের দিকে নজর দেবে-যে সম্পদ এখন চরম ঝুঁকিতে।
চীনের গল্পটি এখানে শিক্ষণীয়, কারণ এটি আমাদের দেখায় কীভাবে একটি বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্র বিশ্ববাণিজ্য, অর্থায়ন এবং কূটনীতিতে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করতে পারে। ইরান কি এই মুহূর্তটিকে একইভাবে কাজে লাগাবে, নাকি নিজেদের সামরিক সুবিধাকে শেষ সীমা পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার চেয়ে অতীত প্রতিশোধেই মগ্ন থাকবে- সেটিই এখনকার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
নিবন্ধের লেখক খুররাম হুসেইন, অর্থনীতি বিষয়ক সাংবাদিক।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ