০৭:১১ পি.এম
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। তবে এই সমঝোতার বিস্তারিত এখনও প্রকাশ করা হয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই চুক্তির বিস্তারিত বিবরণ ‘খুব শিগগিরই’ প্রকাশ করা হবে।
এদিকে, এক ব্লগ পোস্টে দাবি করা হয়েছে যে, ইসরাইলের অনুরোধ পর্যালোচনা করতে যুক্তরাষ্ট্র অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ফলে ইসরাইল পুরো বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেনি।
তবে কিছু সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে যে, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকের বিস্তারিত টেক্সট তারা পেয়েছে। ইসরাইলের টেলিভিশন নেটওয়ার্ক চ্যানেল ১২ গত মঙ্গলবার এই সমঝোতা স্মারকের ১২টি দফার বিবরণ প্রকাশ করেছে। এই দফাগুলোর মধ্যে রয়েছে লেবানন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালী, নিষেধাজ্ঞা এবং জব্দকৃত সম্পদের বিষয়।
আরও পড়ুন: সচিবালয়ে আইডি কার্ড দৃশ্যমান রাখা বাধ্যতামূলক করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সমঝোতা স্মারকের প্রধান দফাগুলো হলো- ১. ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা লেবাননসহ সংশ্লিষ্ট সব এলাকায় শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করবে।
২. সমঝোতার আওতায় ইরান ফের প্রতিশ্রুতি দেবে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জনের চেষ্টা করবে না। ৩. একইসঙ্গে, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ অপসারণের বিষয়টি সমাধানে দুই দেশ সহযোগিতা করবে।
৪. এতে আরো বলা হয়েছে, ইরানের পারমাণবিক জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম এবং দেশের বেসামরিক পারমাণবিক চাহিদা নিয়ে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে আলোচনা হবে। ৫. চূড়ান্ত সমঝোতা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ইরান তার বর্তমান পারমাণবিক কর্মসূচির অবস্থান অপরিবর্তিত রাখবে।
৬. চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না, নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সামরিক শক্তি মোতায়েন থেকেও বিরত থাকবে।
আরও পড়ুন: ঢাকায় তিন দিনের সফরে আসলেন চীনা মন্ত্রী লিউ হাইশিং
৭. হরমুজ প্রণালী সম্পর্কিত ধারায় বলা হয়েছে, সমঝোতা কার্যকর হলে ৬০ দিনের জন্য ইরান বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ এবং টোলমুক্ত চলাচল নিশ্চিত করবে। ৮. সমঝোতা কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ব্যবহারের সুযোগও দেবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
৯. চূড়ান্ত চুক্তি হলে, ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চল থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করবে এবং ইরানের বিপক্ষে আরোপিত সমস্ত নিষেধাজ্ঞা বাতিল করবে বলেও জানানো হয়েছে।
১০. সমঝোতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে ইরানের পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।
১১. আলোচনা চলাকালীন তেহরানকে তেল রফতানির সুযোগ দিতে ওয়াশিংটন অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা ছাড় প্রদান করবে বলেও উল্লেখ রয়েছে।
আরও পড়ুন: শ্রমমন্ত্রীর পদত্যাগ ও মজুরি বৃদ্ধির দাবি শ্রমিক শক্তির
১২. প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওমানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত থাকবে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর অংশগ্রহণে নৌপরিবহন ও সামুদ্রিক সেবাবিষয়ক নতুন ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হবে।
গত মঙ্গলবার সৌদি আরবের সংবাদ সংস্থা আল-আরাবিয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করেছে। এতে ১৪টি দফা রয়েছে। সেগুলো হলো-
১. ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র লেবাননসহ সকল রণাঙ্গনে যুদ্ধের অবিলম্বে এবং স্থায়ী সমাপ্তি ঘোষণা করছে এবং একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো বৈরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না এবং তারা একে অপরের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের হুমকি বা ব্যবহার থেকে বিরত থাকবে।
২. উভয় দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতাকে সম্মান করবে এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকবে। ৩. সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য আলোচনা চলবে, যা পারস্পরিক সম্মতিতে বাড়ানো যেতে পারে।
আরও পড়ুন: গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলনে আহত তৌফিক শেখের মৃত্যু
৪. এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সাথে সাথেই (যা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে), যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীর উপর থেকে তার অবরোধ তুলে নেবে এবং ইরানি জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করবে।
সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে যান চলাচল তার পূর্ণ সক্ষমতায় পুনরুদ্ধার হবে এবং তা এক্ষেত্রে ইরানের পক্ষ থেকে যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পরিমাণের সমানুপাতিক হবে। যুক্তরাষ্ট্রও ৩০ দিনের মধ্যে পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলো থেকে তাদের বাহিনী প্রত্যাহার করে নেবে।
৫. কারিগরি প্রতিবন্ধকতা অপসারণ এবং মাইন নিষ্ক্রিয়করণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় রেখে, ইরান অবিলম্বে পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগরে এবং এর বিপরীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ৩০ দিনের মধ্যে যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পরিমাণে পুনরায় চালু করবে।
৬. যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অংশীদারদের সাথে সেভাবে মিলিত হয়ে ইরানের পুনর্বাসন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করার জন্য একটি ব্যাপক পরিকল্পনা তৈরি করবে। যা অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নও নিশ্চিত করবে। চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ৬০ দিনের মধ্যে প্রণয়ন করা হবে।
আরও পড়ুন: ভারত বাংলাদেশে শ্রমিক বিক্ষোভের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে
৭. যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান ইরানের উপর আরোপিত সকল প্রকার নিষেধাজ্ঞা, যা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) বোর্ড অফ গভর্নরস-এর প্রস্তাবনা এবং সকল একতরফা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা (প্রাথমিক ও মাধ্যমিক উভয়ই) অন্তর্ভুক্ত, তা তুলে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হবে।
৮. ইরান পুনর্ব্যাক্ত করছে যে, তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন করবে না এবং সমৃদ্ধকৃত উপাদানের ভাগ্য ও ইরানের পারমাণবিক চাহিদাসহ পারস্পরিকভাবে সম্মত অন্যান্য সকল পারমাণবিক-সম্পর্কিত বিষয় একটি চূড়ান্ত চুক্তির মাধ্যমে সমাধান হবে।
৯. একটি চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত, তারা স্থিতাবস্থা বজায় রাখবে: ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে স্থিতাবস্থা বজায় রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপর নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না বা এই অঞ্চলে তার শক্তি বৃদ্ধি করবে না।
১০. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য ও এর উপজাত এবং ব্যাংকিং, বীমা, পরিবহনসহ সকল সংশ্লিষ্ট পরিষেবার রপ্তানির জন্য ছাড়পত্র জারি করবে।
আরও পড়ুন: সরকারের ব্যর্থতা আড়ালে বিরোধীদের চরিত্রহনন করছে: জামায়াত আমির
১১. ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের জব্দকৃত বা সীমাবদ্ধ তহবিল ও সম্পদ মুক্ত করে সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধ করা হবে। এই তহবিল, যা মূল অ্যাকাউন্টে রাখা হোক বা স্থানান্তর করা হোক, তা ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত যেকোনো চূড়ান্ত সুবিধাভোগীকে অর্থ প্রদানের জন্য ব্যবহৃত হবে এবং ব্যবহারের জন্য সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধ থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রও এর ভিত্তিতে সমস্ত প্রয়োজনীয় অনুমতি ও লাইসেন্স জারি করবে।
১২. চূড়ান্ত চুক্তির সফল বাস্তবায়ন এবং এর প্রতি ভবিষ্যৎ অঙ্গীকার তদারকির জন্য একটি কার্যপ্রণালী স্থাপন করা হবে।
১৩. ৪, ৫, ১০ এবং ১১ নং অনুচ্ছেদের বাস্তবায়ন শুরুর বিষয়ে আশ্বাস প্রাপ্তির পর, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র শুধুমাত্র অবশিষ্ট অনুচ্ছেদগুলোর বিষয়ে একটি চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনা শুরু করবে।
১৪. চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।
তবে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র বা ওমান আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও এই ইসরাইলি গণমাধ্যমের ১২ দফা কিংবা সৌদি গণমাধ্যমের ১৪ দফার দাবিগুলোর একটি নিশ্চিত করেনি।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন