০৫:২০ পি.এম
শ্রমিকবান্ধব করার আহ্বান জানিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন প্রক্রিয়া সংশোধনের দাবি উঠেছে।
শ্রম অধিকার বিশেষজ্ঞরা ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, সহজবোধ্য এবং আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, আবেদন গ্রহণে বিলম্ব এবং আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকা অতিরিক্ত প্রশাসনিক শর্ত শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার চর্চায় বাধা সৃষ্টি করছে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের দশম স্থলবাহিনী সংলাপ ঢাকা সেনানিবাসে সফলভাবে সম্পন্ন
রবিবার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে সলিডারিটি সেন্টার আয়োজিত ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর সাম্প্রতিক সংশোধনের পর ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন’ শীর্ষক অংশীজনদের অভিজ্ঞতা বিনিময় সভায় বক্তারা এসব বিষয় তুলে ধরেন।
সভায় সলিডারিটি সেন্টারের কান্ট্রি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর এ কে এম নাসিম মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের কয়েকটি আবেদন পর্যালোচনা করার পর দেখা গেছে, আবেদন জমা দেওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করতে অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় লাগছে।
প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের প্রতিটি আবেদনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানে মোট কতজন শ্রমিক কাজ করছেন, সে বিষয়ে নিয়োগকর্তার প্রত্যয়নপত্র চাওয়া হচ্ছে।
আরও পড়ুন: জামায়াতের মহিলা বিভাগের প্রতিবাদ: নারী উদ্যোক্তা সাথী আক্তার গ্রেপ্তার
যদিও শ্রম আইনের ১৭৮(৫) ধারায় ব্যবস্থাপনার কাছ থেকে এ তথ্য নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে, তবুও প্রতিটি আবেদনের সঙ্গে নিয়োগকর্তার প্রত্যয়নপত্র জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
শ্রম আইন ও শ্রম বিধিমালা অনুযায়ী নিয়োগকর্তাদের শ্রমিকদের নিবন্ধন সংরক্ষণ করতে হয়। নিবন্ধন দেখে প্রয়োজন হলে শ্রম অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানে মোট শ্রমিকের সংখ্যা যাচাই করতে পারে। তাই আবেদন গ্রহণের আগে নিয়োগকর্তার প্রত্যয়নপত্র বাধ্যতামূলক করা উচিত নয়, প্রবন্ধে এ বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: চীনে পাচারের চেষ্টা, ১২ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারী উদ্ধার
সভায় ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের সময়সীমা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। শ্রম আইনের ১৮২ ধারা অনুযায়ী, কোনো আবেদন ত্রুটিপূর্ণ হলে তা গ্রহণের ১২ দিনের মধ্যে লিখিতভাবে আপত্তি জানাতে হবে। একই ধারায় নিবন্ধন প্রক্রিয়া ৫৫ দিনের মধ্যে শেষ করার কথা বলা হয়েছে। তবে আবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণে বিলম্ব হলে আইনে নির্ধারিত সময়সীমা কার্যত পিছিয়ে যায়।
লিবাস নিটওয়্যার লিমিটেড শ্রমিক ইউনিয়নের উদাহরণ তুলে ধরা হয়। ইউনিয়নটি গত বছরের ২৫ নভেম্বর আবেদন জমা দেয়। কিন্তু শ্রমিকের সংখ্যা সংক্রান্ত নিয়োগকর্তার প্রত্যয়নপত্র না থাকায় আবেদনটি ফেরত দেওয়া হয়। পরে চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি আবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়। অর্থাৎ প্রথমবার আবেদন জমা দেওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করতে প্রায় ৯৫ দিন সময় লেগেছে।
আরেকটি উদাহরণ হিসেবে গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স সলিডারিটি ফেডারেশন–অধিভুক্ত টেক্সাস ড্রেসেস শ্রমিক সংহতি ইউনিয়নের কথা উল্লেখ করা হয়। ইউনিয়নটি ১৩ জানুয়ারি আবেদন জমা দেয়। ২১ এপ্রিল আবেদনটি প্রত্যাখ্যাত হয়। প্রবন্ধে বলা হয়, বিতর্কিত গ্রহণের তারিখ থেকে সিদ্ধান্ত নিতে ৫৯ দিন সময় লাগে, যা আইনে নির্ধারিত ৫৫ দিনের সময়সীমার চেয়ে বেশি।
অনলাইন নিবন্ধন ব্যবস্থার বিষয়েও সভায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। আবেদন জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারিখ ও সময় উল্লেখ করে প্রাপ্তিস্বীকারপত্র দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে প্রথমবার আবেদন জমা দেওয়ার তারিখকেই আবেদন গ্রহণের তারিখ হিসেবে গণ্য করার আহ্বান জানানো হয়।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের রাশিয়ায় পাচার, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ভয়ংকর তথ্য!
একে এম নাসিম বলেন, সংশোধিত শ্রম আইনের উদ্দেশ্য ছিল ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করা। কিন্তু বিভিন্ন পর্যায়ে ইউনিয়নগুলো এখনো নতুন নতুন প্রশাসনিক ও বাস্তব বাধার মুখোমুখি হচ্ছে। শ্রমিকদের সংগঠনের স্বাধীনতার অধিকার যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়ে আরো সহজ হয়, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত ও সমাধান করা প্রয়োজন।
সভায় বক্তারা ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের জন্য একটি স্পষ্ট ও অভিন্ন প্রক্রিয়া চালুর আহ্বান জানান। তারা আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক নথি এবং শুধু তথ্য যাচাইয়ের জন্য চাওয়া নথির মধ্যে পরিষ্কার পার্থক্য করার সুপারিশ করেন। একই সঙ্গে আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব আপত্তি ও সিদ্ধান্ত জানানো নিশ্চিত করার দাবি জানান।
বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক রাশাদুল আলম রাজু বলেন, ইউনিয়ন নিবন্ধন সহজ করতে অনলাইনে আবেদন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আবেদনগুলো মাসের পর মাস সার্ভারে পড়ে থাকে। এটি নতুন এক ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে।
সম্মিলিত শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুল হাসান নয়ন বলেন, অনলাইন ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন প্রক্রিয়া উন্নত করতে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে। এই সহায়তার ফলস্বরূপ একটি কার্যকর, স্বচ্ছ ও দক্ষ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে—এটাই প্রত্যাশা। আরেকটি ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা চালু হোক, তা তারা চান না।
আরও পড়ুন: কম্বোডিয়ার স্ক্যাম সেন্টারে মানবপাচার চক্রের ২ সদস্য গ্রেফতার
সম্মিলিত গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের সমস্যা শিল্প সম্পর্কের অবনতির সঙ্গেও জড়িত। এতে শুধু শ্রমিকেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, সুশাসনও ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতা ও সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন বাংলাদেশ বিপ্লবী গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি সালাহউদ্দিন স্বপন, বাংলাদেশ গার্মেন্ট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি বাবুল আক্তার, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব বুলবুল এবং বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আক্তার।
আরও পড়ুন: ইসরাইল নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, সরকার গঠনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অধরাই
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন