০৪:৩৯ পি.এম
আব্দুর রাজ্জাক
কুষ্টিয়া, ৮ নভেম্বর, ২০২৬ : দেশের তামাকপ্রবণ এলাকা, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলসহ (রংপুর, লালমনিরহাট) পার্বত্য বান্দরবান, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়ার তামাক চাষিদের সচেতন করার জন্য সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পরিবেশবান্ধব ফসল চাষে উৎসাহিত করতে কৃষকদের কৃষি ঋণ এবং মোবাইল সেচ সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। কিছু কিছু অঞ্চলে তামাক চাষ বাদ দিয়ে লাভজনক মৌচাষের সফল উদাহরণও তৈরি হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে, বিষাক্ত তামাকের মায়াজাল থেকে বেরিয়ে লাভজনক পেঁপে চাষে সোনালী জীবনের সন্ধান পেয়েছেন কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার চাষিরা।
আরও পড়ুন: কৃষক বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে: হুইপ দুলুর মন্তব্য
‘জীবন শেষ হয়ে যায় তামাক চাষ করতে গেলে’ জামিরুলের এই আফসোস এখন আর কুষ্টিয়ার কোনো চাষির মুখে শোনা যায় না। যশোর অঞ্চলের টেকসই কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্পের সহায়তায় তামাকের উর্বর ভূমি আজ বিকল্প ফসলের সবুজ সমারোহে সজ্জিত হয়ে উঠেছে।
প্রতি বছর বোরো মৌসুমে দেশের উদ্ধৃত্ত খাদ্যসশ্য উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উর্বর ৩ ফসলি জমির জেলা কুষ্টিয়ার ৬টি উপজেলায় প্রায় ৩০ হাজার হেক্টর কৃষি জমিকে গ্রাস করে বিষবৃক্ষ তামাক চাষ। ফলে এ মৌসুমে প্রায় ২ লাখ মে.টন খাদ্যসশ্য উৎপাদন ব্যহত হয়, পাশাপাশি পরিবেশ, মাটি ও জনস্বাস্থ্য দুষণের যে আর্থিক ক্ষতি হয়, তা এ খাত থেকে প্রাপ্ত সরকারের রাজস্বের তুলনায় শতগুণ বেশি।
বিএটি’সহ ৬টি তামাক কোম্পানি নানা কায়দা কানুন করে প্রলোভনের জালে আটকে জেলার প্রায় ২৫ হাজার চাষিকে তামাক চাষে বাধ্য করে থাকে। ৬ দশক ধরে কোম্পানিগুলো তামাক চাষকে নগদে অধিক লাভের প্রলোভন দেখিয়ে চাষিদের মজ্জায় ঢুকিয়ে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। অথচ তামাক চাষকে অলাভজনক, মাটি দুষণ ও স্বাস্থ্যহানির কারণ জেনেও চাষিরা আটকে আছে প্রলোভনের বৃত্তে। এই কারণে তামাক চাষের ঘূর্ণিপাক থেকে চাষিদের মুক্ত করে বিকল্প ও অধিক লাভের ফসল আবাদে সরকারের কৃষি বিভাগ নানা উদ্যোগের বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।
যশোর অঞ্চলের টেকসই কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্পের মাধ্যমে চাষিদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শসহ প্রয়োজনীয় আনুষাঙ্গিক প্রণোদনার মাধ্যমে উচ্চমূল্যের বিকল্প ফসল উৎপাদনে আগ্রহী করে তুলছে চাষিদের। এরই একটি সফল উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন মিরপুর উপজেলার পেপে চাষি জামিরুল ইসলাম।
আরও পড়ুন: তানোরে রোপা আমন ধান কাটা শুরু, দাম নিয়ে উদ্বিগ্ন কৃষকরা
কৃষি বিভাগের হিসেব অনুযায়ী, পেপে, আদা চাষ, ক্যাপসিকাম, গ্রীষ্মকালীন পিঁয়াজ, তরমুজ ও ড্রাগনসহ নানা জাতের উচ্চমূল্যের বিকল্প ফসল উৎপাদন করে চাষিরা এক বিঘা জমিতে তামাক চাষ থেকে যে টাকা আয় করবেন, তার চেয়ে নূন্যতম চারগুণ বেশি নগদে আর্থিক লাভের উদাহরণ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন চাষিরা।
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার মশান গ্রামের চাষি জামিরুল ইসলাম বাসসকে বলেন, ‘প্রায় ৬ মাস ধরে বাড়ির বউ ছাওয়াল পাল মিলে লাগাতার খাটাখাটনি কইরি, ৪০ তেকে ৫০ হাজার টাকা খরচ কইরি যে তামাক হয়, তা বেচি (বিক্রি) ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টেকা পাই। পরিবারের সবাই মিলে রাইত দিন তামাক পুড়াতি যাইয়ি ঘুম হয়না, তামাকের গ্যাসে রোগ বালাই লাগিই আছে, ওই সময় স্কুল কলেজে পড়া ছেলি মেয়েদের পড়ালেখা বাদ দিয়ে কাজ করতি হয়। জীবন শ্যাষ হয়ে যায় তামাক চাষ করতি গেলি।
তিনি আরও বলেন, কৃষি বিভাগের অফিসাররা আমাক বুল্লি টেলিং (ট্রেইনিং) লিতি। সেখান থেকি হাতে কলমে টেলিং লিয়ে উনাদের পরামর্শে পেপের বেছন (বীজ) লিয়ে এক বিঘি ভুঁইয়ে প্রায় সাড়ে ৪শ’ চারা লাগায়ছিলাম গত জানুয়ারি মাসে। এতে খরচ হয় ৬০ হাজার টাকা। নভেম্বরের ১ তারিখে (রোববার) প্রথম চালানে পেপে ভাঙিচি, প্রতি কেজি ১৫ টাকা কইরি এক লাখ ৭ হাজার টাকা বেচিছি। ব্যাপারীরা আমার বাগানে আইনি লিয়ে গেছে, আমার কোন খরচ নেই।
উপজেলার বলিদাপড়া গ্রামের অপর কৃষক মহিদুল ইসলাম জানান, ‘জীবন ভর আমরা চাষিরা যা করতি যায় তাতেই ঠকি, না জানার কারণে বুঝতে পারিনা কোনটা সঠিক। ক্ষতিকর, লোকসান এবং স্বাস্থ্যহানি জেনেও শুধুমাত্র একসাথে নগদ টাকা পাওয়া যায়, সে কারণে চাষিরা আটকে আছে তামাক চাষে। অথচ এই যে দ্যাখেন আমার ২৫ কাঠা জমিতে পেঁপে চাষ করেছি, ৬ মাসের মধ্যে আমার গাছের ফলনের দিকে তাকালে মন ভরি যায়। প্রতিটা গাছে এগুলি পেপে না, টাকা ধরে আছে। এখানে লুকোচুরির কিছু নেই ওপেন দেখতে পাচ্ছেন প্রতিটা গাছে কি পরিমাণ পেপে ধরেছে। এখন শুধু বলবো পেপে বেচার কথা।
আরও পড়ুন: লাউয়ের দাম তিন টাকা, কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন
তিনি বলেন, ব্যাপারীরা মাঠে এসে নিয়ে যাবে। অথচ গত বছর পর্যন্তও আমি নগদ টাকার জন্য তামাক চাষ করিছি যা একবারই টাকা পেয়েছি, কিন্তু আমার মাঠের এই পেপে বেচপো (বিক্রি) দুই বছর পর্যন্ত। এ সময় যে টাকার পেপে বেচপো তা তামাকের চেয়ে ৪ গুণ টাকা পাবো।
কুষ্টিয়া শহরের নিশান মোড়ের সবজি বিক্রেতা নিত্যরঞ্জন বলেন, ‘যত দিন যাচ্ছে মানুষের প্যাটের গ্যাষ্ট্রিকসহ নানা রোগ বেড়ে গেছে বলে পেপের চাহিদাও বেড়ে গেছে’। আমার দোকানেই প্রতিদিন প্রায় একমণ পেপে কেজি প্রতি ২৫ থেকে ৩০ টাকা বিক্রি করি।
মিরপুর উপজেলার মাঠকর্মী উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাহাবুল ইসলাম বাসসকে জানান, ‘উচ্চমূল্যের বিকল্প ফসল পেপে চাষের মধ্য দিয়ে অর্জিত অধিক মুনাফার সাফল্য দেখে ইতোমধ্যে অন্যান্য তামাক চাষিরাও আগ্রহী হয়ে উঠছেন পেপে চাষে। প্রশিক্ষণ ও নানাবিধ সরকারি প্রণোদনা এবং পরামর্শ দেয়ার পাশাপশি পেপেসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের ফসল আবাদে আগ্রহী করে তোলার মাধ্যমে বিষবৃক্ষ তামাক চাষ থেকে চাষিদের রক্ষা করা সম্ভব হবে’।
প্রকল্প পরিচালক রবিউল ইসলাম বাসসকে বলেন, কৃষিকে লাভজনক ও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গড়ে তুলতে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চাষিদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরকার নানা কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছে। সেগুলি মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নে যশোর অঞ্চলে টেকসই কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্প কাজ করে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন: ২০ টাকার আলু ১১ টাকায় বিক্রি, তবু ক্রেতার অভাব
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন