০৪:৫৯ পি.এম
মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের কৌশলগত, অর্থনৈতিক, জ্বালানি ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ থাকায় এবং ইসরাইল–মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ নতুন এক অনিশ্চয়তার জন্ম দেওয়ায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ইরানের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত মিত্র চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া এবং অন্যান্য মিত্র রাষ্ট্র কি সম্ভাব্য মার্কিন মোকাবিলার জন্য নিজেদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছে? মধ্যপ্রাচ্যে তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা, রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক করিডোর ও কূটনৈতিক অবস্থান রক্ষার পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের একক আধিপত্য ভেঙে দিতে প্রয়োজনে কি তারা ইরানের পাশে আরও দৃঢ় অবস্থান নেবে? এমন পরিস্থিতিতে কি চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মত মিত্র পরাশক্তিগুলো কি তাদের মিত্রশক্তি ইরানকে ও নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় পরমাণু অস্ত্রের ট্রিগারে আঙ্গুল রেখেছে?
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সালে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আইন পরিপন্থী অবৈধ সামরিক আগ্রাসনের পর থেকে আজ পর্যন্ত যে বাস্তবতা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছে, তা বহু পুরোনো ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ব্যাপক সামরিক হামলা, অব্যাহত ধ্বংসযজ্ঞ এবং সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ইরান যে মাত্রার প্রতিরোধ সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে, তা এই সংঘাতকে কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের সীমায় আটকে রাখেনি; বরং তা বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রশ্নকে সামনে এনে দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়; এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি ভাণ্ডার। এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বা অস্থিতিশীলতা সরাসরি প্রভাব ফেলে বৈশ্বিক অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর। ফলে চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মতো রাষ্ট্রগুলোর জন্য মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতা কেবল কূটনৈতিক উদ্বেগের বিষয় নয়; এটি তাদের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
চীনের শিল্প অর্থনীতি বিপুল জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে বিকল্প কৌশলগত জোটকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। উত্তর কোরিয়া আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও মার্কিন প্রভাববলয়ের বিরুদ্ধে অবস্থানকে নিজেদের নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক চাপ অব্যাহত থাকলে এই তিন রাষ্ট্রের কৌশলগত হিসাব-নিকাশও নতুন মাত্রা পেতে পারে—এমন আলোচনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
ইরানের প্রতিরোধ যত দীর্ঘায়িত হয়েছে, ততই একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—শুধু সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা নিয়ন্ত্রণ করা আগের মতো সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল কর্তৃক নিজেদের শুরু করা ইরানের বিরুদ্ধে অবৈধ হামলাব কারণে ইরানের পালটা হামলায় বিপর্যস্ত হয়ে নিজেরাই যুদ্ধ বিরতি করে। আবার সেই যুদ্ধ বিরতি নিজেরাই লংঘন করে ইরানে হামলার মাধ্যমে ইরানকে যেভাবে খেপিয়ে তুলেছে তার বিরুদ্ধে ইরানের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির পাল্টা মরণঘাতি ভয়াবহ ও বিধ্বংসী হামলার সক্ষমতা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ যুদ্ধ পরিচালনার সামর্থ্য নতুন করে মূল্যায়নের দাবি সৃষ্টি করেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, যদি এই সংঘাত আরও বিস্তৃত হয় কিংবা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ অথবা পরমাণু যুদ্ধের মত পরিণতির দিকে চলে যায়, তবে চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া কি শুধু কূটনৈতিক সমর্থনেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি নিজেদের বৃহত্তর কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় মধ্যপ্রাচ্যের সিংহ খ্যাত ইরানের পক্ষে আরও প্রত্যক্ষ অবস্থান গ্রহণ করবে?
এই প্রশ্নের সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও যুক্ত। মধ্যপ্রাচ্যে যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও একক প্রভাব অক্ষুণ্ন থাকে, তবে তা এই তিন রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্যকে কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে? আবার বিপরীতভাবে, যদি ইরান এই সংঘাতে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়, তবে তা কি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আগামী দিনের আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আজকের বিশ্বে যুদ্ধ শুধু ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা যুদ্ধবিমানের লড়াই নয়; এটি জ্বালানি, বাণিজ্যপথ, নিষেধাজ্ঞা, কূটনীতি, প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারেরও লড়াই। তাই ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতকে বিচ্ছিন্ন কোনো সামরিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর প্রতিটি ধাপ বিশ্ব অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিতর্কের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন থেকেই যায়—মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের কৌশলগত, অর্থনৈতিক, জ্বালানি ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যের অবসান ঘটানোর বৃহত্তর লক্ষ্য সামনে রেখে চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী মিত্র রাষ্ট্রগুলো সম্ভাব্য ৩য় বিশ্বযুদ্ধের পক্ষ শক্তি হতে কি ইতোমধ্যেই সব সর্বাধুনিক প্রযুক্তি এবং পরমাণু অস্ত্র সহ সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলেছে? পরিস্থিতি যদি আরও জটিল হয়ে ওঠে, তবে তারা কি ইরানের পাশে আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর অবস্থানে যাবে, নাকি বর্তমানের মতো কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থনের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখবে?
এই প্রশ্নগুলোর চূড়ান্ত উত্তর সময়ই দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
বিশ্ব এখন আর একক আধিপত্যবাদী শক্তির নিয়ন্ত্রণে নেই - এটা মোটামুটি স্পষ্ট এবং বৈশ্বিক শক্তির কেন্দ্র এখন এক মেরুতে না থেকে বরং বহু মেরু বিশিষ্ট হয়ে পড়েছে। প্রশ্ন এখন একটাই মধ্যপ্রাচ্যে যে মরণঘাতি যুদ্ধ শুরু হয়েছে সেই অধ্যায়ের শেষ কোথায়? তা কি পারমাণবিক যুদ্ধে গিয়ে ঠেকবে নাকি তার আগেই উভয়পক্ষ একটি যৌক্তিক সমাধানের পথ বেছে নেবে, নাকি যুদ্ধের মাধ্যমেই জয় পরাজয়ের ভিত্তিতে তার চূড়ান্ত সমাধান হবে, তা এখনো অনিশ্চিত; কিন্তু এর প্রতিটি মুহূর্ত বিশ্ব রাজনীতির নতুন সমীকরণ লিখে চলেছে এমন কথা আজকের দিনে বলা মনে হয় অমূলক নয়।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন