১১:৪৮ এম
সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের পুঞ্জীভূত ঋণ ১১ লাখ ৯৫ হাজার ১২৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। গত বছরের একই সময়ে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ২৭ হাজার ২৩২ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক বছরের মধ্যে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা। উল্লেখযোগ্য যে, সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যাংক খাত থেকে নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবছর সরকার বাজেট ঘোষণা করে, যেখানে বড় অঙ্কের ঘাটতি থাকে। এই ঘাটতি মেটাতে মূলত দুটি উৎস—অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক খাতের ওপর নির্ভর করা হয়। বৈদেশিক উৎস থেকে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন না পাওয়া গেলে অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংকব্যবস্থা, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানি এবং সঞ্চয়পত্র খাত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্যাংক খাত সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। চলতি অর্থবছরে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। অর্থবছরের জুলাই থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে নিট ২৭ হাজার ৭১০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ২৫ শতাংশ ঋণ নেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: ঋণ গ্রহণের ব্যয় বৃদ্ধিতে সীমিত পরিসরের বাজেটের পথে যুক্তরাজ্য
বর্তমানে ব্যাংক খাতে সরকারের ঋণের স্থিতি ৭ লাখ ১৩ হাজার ১৮৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ১৪ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে ৯৮ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকার যে বাজেট ঘোষণা করছে, তাতে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও সেই অনুপাতে রাজস্ব আয় হচ্ছে না। ফলে প্রতি বছরই ঘাটতি বাজেট দিতে হচ্ছে। এই ঘাটতি মেটাতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে সরকারকে। এর ফলে সরকারের দেশি-বিদেশি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। ঋণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সুদের বোঝাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারের বড় ব্যয়ের খাত হয়ে উঠেছে ঋণের সুদ পরিশোধ। এমনকি পুরোনো ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য নতুন করে ঋণ নিতে হচ্ছে সরকারকে।
দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য চলতি অর্থবছরে এক লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ১৩.৬ শতাংশ। গত অর্থবছরের মূল বাজেটে সুদ ব্যয় ধরা হয়েছিল এক লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। পরে সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা করা হয়।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সরকারের রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। গত জুলাই ও আগস্টে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৫৫ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায় কম হয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। এই সময়ে লক্ষ্যমাত্রার ৬৮.৫৫ শতাংশ রাজস্ব আদায় করতে পেরেছে এনবিআর।
আরও পড়ুন: ঘোষণা দিয়েও নিরাপত্তার কারণে ঢাকা-রিয়াদ সরাসরি ফ্লাইট চালু করতে পারল না সৌদি এয়ারলাইন্স
বাংলাদেশ ব্যাংকের অপর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতে সরকারের ঋণের স্থিতি ৪ লাখ ৮১ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সঞ্চয়পত্র খাতে ঋণের স্থিতি ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মন্তব্য করেছেন, সরকারের ব্যয়ের বোঝা বিভিন্ন কারণে ক্রমেই বাড়ছে। অন্যদিকে, অদূর ভবিষ্যতে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা নেই। এমনকি আগের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ধরে রাখাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে সরকারি অর্থের অপচয় রোধ এবং ব্যয়ে সাশ্রয়ী হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। তাহলে ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন