০৫:০৬ পি.এম
গত ১০ বছরে পাকিস্তানের বৈদেশিক ঋণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ২০১৫ সালে দেশটির মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ৬৮ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালের মধ্যে এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে। এই তথ্যটি বিশ্বব্যাংকের ‘ইন্টারন্যাশনাল ডেট রিপোর্ট ২০২৬’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, পাকিস্তানের মোট বৈদেশিক ঋণের মধ্যে সরকারি ও সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত ঋণের পরিমাণ ১০৭ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার। এর পাশাপাশি বেসরকারি গ্যারান্টিবিহীন ঋণ ১৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ১০ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার।
সরকারি ও সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত ঋণের মধ্যে বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ৫৬ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার। দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতাদের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ৪২ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার। বেসরকারি ঋণদাতাদের কাছে ঋণের পরিমাণ ৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার।
আরও পড়ুন: আরব উপসাগরে তেলবাহী ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এক নাবিক নিহত
পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় একক ঋণদাতা দেশ চীন। পাকিস্তানের কাছে চীনের ঋণের পরিমাণ ২২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। এরপর রয়েছে বিশ্বব্যাংক, যার ঋণের পরিমাণ ১৯ দশমিক ২ বিলিয়ন এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ ১৬ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার।
প্রতিবেদনটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি ঋণদাতাদের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের গড় পরিশোধের সময়কাল ১৬ বছর। এর মধ্যে প্রথম চার বছর কিস্তি পরিশোধে ছাড় রয়েছে। এসব ঋণের গড় সুদের হার ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে, বেসরকারি ঋণের গড় সুদের হার ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। এসব ঋণের পরিশোধের গড় সময়কাল তিন বছর এবং কিস্তি পরিশোধ শুরু করার আগে এক বছরের ছাড়ের সময় রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান (মেনাপ) অঞ্চলে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং সুদ পরিশোধের অনুপাতের উন্নতি ঘটেছে। তবে এই অঞ্চলে জাতীয় মোট আয়ের (জিএনআই) তুলনায় বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে এই অনুপাত ছিল ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ২৯ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে।
বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এক বছরে বৈদেশিক ঋণের অনুপাত বৃদ্ধির হার মেনাপ অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি। এটি নির্দেশ করে যে, এই অঞ্চলের দেশগুলোর ওপর বৈদেশিক ঋণের চাপ ক্রমাগত বাড়ছে।
আরও পড়ুন: দোষী সাব্যস্ত রাসেল ব্র্যান্ড
২০২৫ সালে পাকিস্তানের ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বাড়িয়ে দেয় চীন। একই বছরে দেশটির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) দুটি কর্মসূচির আওতায় মোট ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা প্রদান করে।
কর্মসূচি দুটি হলো ‘এক্সটেন্ডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটি’ (ইএফএফ) এবং ‘রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটি’ (আরএসএফ)।
২০২৫ সালে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর বৈদেশিক ঋণ ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে রেকর্ড ৯ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। গত চার বছরের মধ্যে এক বছরে ঋণ বৃদ্ধির এটি সর্বোচ্চ হার। বন্ড ইস্যু বৃদ্ধি, মার্কিন ডলারের মূল্য কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগকারীদের ঋণ দেওয়ার আগ্রহ বাড়ায় এই ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে ঋণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পরিশোধের খরচও বেড়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলোকে কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ সুদে ঋণ নিতে হয়েছে। টানা পঞ্চম বছরের মতো ঋণ পরিশোধের পরিমাণও বেড়েছে।
আরও পড়ুন: বিজেপি সরকারের সমালোচনা করায় তিন কনটেন্ট ক্রিয়েটর গ্রেপ্তার
বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) আওতাভুক্ত দেশগুলোর বৈদেশিক ঋণ ৮ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ঋণ ৮ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ২৬২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২০ সালের পর সর্বোচ্চ।
এদিকে, ডলারের মূল্য কমে যাওয়ার ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধির হার ২৮ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। ফলে নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করলেও মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তনের কারণে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ অনেক দেশের মোট ঋণের পরিমাণ আরও বেড়েছে।
বেসরকারি ঋণদাতাদের ঋণ ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে
২০২৫ সালে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর বেসরকারি ঋণদাতাদের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ বছর এ ঋণ ৫ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালে এই বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ০ দশমিক ৬ শতাংশ।
আরও পড়ুন: বিজেপি এমপি নিশিকান্ত দুবে নোয়াখালী-চট্টগ্রাম-সিলেট দখলের উসকানি দিলেন
বন্ডহোল্ডার, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও অন্যান্য বেসরকারি ঋণদাতাদের কাছ থেকে ঋণ বৃদ্ধির কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালে বন্ডহোল্ডারদের কাছে ঋণ ৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ২ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক ও অন্যান্য বেসরকারি ঋণদাতাদের কাছে ঋণ ৪ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
এই সময়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মোট জাতীয় আয় ৫ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে এসব দেশের প্রতি ঋণদাতাদের আগ্রহ বেড়েছে। পাশাপাশি সুদের হার বেশি হলেও এসব দেশের সরকার ঋণ নিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে সবচেয়ে কম ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা যেসব দেশের, ঋণ পেতে তাদেরই সবচেয়ে বেশি সুদ গুনতে হচ্ছে।
দরিদ্র দেশগুলোর ঋণের সুদ আশির দশকের পর সর্বোচ্চ
বেসরকারি ঋণদাতাদের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া বাড়ানোর ফলে দরিদ্র দেশগুলোর ঋণের খরচও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ)-এর আওতাভুক্ত দেশগুলো ২০২৫ সালে নতুন ঋণের জন্য গড় ৮ দশমিক ২ শতাংশ সুদ দিয়েছে, যা আশির দশকের শেষভাগের পর সর্বোচ্চ।
আরও পড়ুন: মধ্যবর্তী নির্বাচনে মেধাবীদের প্রতিশোধ: বিজ্ঞানের জয়, মাহা নীতির হার
সরকারি ও বেসরকারি ঋণদাতাদের ঋণের সুদের ব্যবধানও বেড়েছে। ২০১৬ সালে এই ব্যবধান ছিল ৩ দশমিক ৪ শতাংশীয় পয়েন্ট, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৫ দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংকের (আইবিআরডি) ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর নতুন ঋণের গড় সুদের হার ৫ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়ছে।
২০২৫ সালে এসব দেশের আসল ও সুদসহ মোট ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে বন্ডের বিপরীতে অর্থ পরিশোধ বেড়েছে ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ৩৬৩ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এসব দেশ নতুন ঋণ হিসেবে যত অর্থ পেয়েছে, তার চেয়ে ৪৩৬ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার বেশি ব্যয় করেছে পুরোনো ঋণ পরিশোধে। তবে ২০২৫ সালে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের অর্থপ্রবাহে পরিবর্তন এসেছে। ২০২৪ সালে এসব দেশ থেকে ১১৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার নিট অর্থ বাইরে চলে গেলেও ২০২৫ সালে ৪৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার নিট অর্থ দেশে এসেছে।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর আল-সাইয়েদের খুতবার ভিডিও নিয়ে নতুন আলোচনা
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন